পোল প্রথমে উইংমাস্টারের কথায় কান দেয়নি। আপনি চাইলে যে কোনো দৃশ্য দেখতে পারেন। কে-ই বা বিশ্বাস করে। পঞ্চাশ মিটার উপর থেকে নিচে তেমন কিছু দেখা গেল না। শুধু ফিচারলেস তারের গোলকধাঁধা। ফ্লেক্সিবল ক্যাবল। পুরো মেঝেটাই যেন পেল্লায় ট্রাম্পোলিন। না উড়েও মানুষ অনেক মজা লুটে নিতে পারবে। এখান থেকে সরাসরি শক্ত কিছুর উপর পড়ে গেলে খারাপ ব্যাপার হবে তাতে সন্দেহ নেই, পৃথিবীর বুকে পাঁচ মিটার উপর থেকে পড়ে কি মানুষ ঘাড় ভাঙেনি।
দু ডানার আলতো ঝাঁপটায় বাতাসে ভেসে এল পোল। একটু পরই দেখতে পেল, উড়ছে সে। উড়ছে। শত মিটার উপরে চলে এসেছে। আসছে আরো আরো উপরে।
‘এবার একটু ধীরে!’ বলল উইংমাস্টার, আমিতো আপনার সাথে পাল্লা দিয়ে পারছি না।
একটু ঢিল দিল পোল। আলতো করে গড়িয়ে দিল শরীরটাকে। বাতাসের উপরে। ডিগবাজি খেল গিরিবাজের মতো। অনেক হাল্কা লাগছে, শরীরের ওজন তো দশ কেজিও নয়। কে জানে, অক্সিজেনের ঘনত্ব বেড়ে গেল কিনা।
ব্যাপারটা অসাধারণ। শুন্য গ্যাভিটির চেয়ে অনেক বেশি ব্যতিক্রমী, একটু শারীরিক চ্যালেঞ্জ আছে। স্কুবা ডাইভিণ্ডের সাথে এর এক আধটু তুলনা করা যেতে পারে।
আহ, যদি পাখি থাকত এখানে যেমন স্কুবা ডাইভিভের সময় রিফগুলোয় দেখা দিয়ে যায় রঙ বেরঙের কোরাল মাছের দল, তেমন।
উইংমাস্টার একে একে ওড়ার বাহারি জাদু শিখিয়ে দিচ্ছে রোলিং, লুপ তৈরি করা, মাথা নিচে রেখে উড়ে যাওয়া, শুধু ডানায় ভর করে ভেসে থাকা… সবশেষে বলল, আর কিছু শিখাতে পারব না। আমার বিদ্যার ঝোলা খালি হয়ে এসেছে। এবার ভিউ উপভোগ করা যাক।
এক মুহূর্তের জন্য যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল পোল, এমনটাই হবে, আশা করেছিল, কারণ, মূহুর্তের ব্যবধানে চারপাশে মাথা তুলে ধরেছে শুভ্র কিরিটি পরা পর্বতগুলো। উন্নতশির। এবড়োথেবড়ো পাথর দাঁত খিঁচিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। উড়ে যাচ্ছে সে দুইটা শিখরের কাছ দিয়ে। খুব কাছ দিয়ে। এগিয়ে যেতে যেতে দেখল একটা ঈগলের বাসা। বাসায় পড়ে আছে ডিম। একটু হলেই ছুঁয়ে দেখতে পারত সেটাকে। কিন্তু সামনে যেতে হবে। আর একটু ফ্রি স্পেস দরকার।
হারিয়ে গেল পর্বতমালা। নেমে এল নিকষ কালো রাত। আকাশে ফুটকি তুলে তুলে জেগে উঠল তারার ফুলেরা। আকাশের খুব বেশি নক্ষত্র তো আর দেখা যায় না! আস্তে আস্তে আরো বেশি কিছু দেখা দিল। দেখা দিল নিহারিকাগুলো, গ্লোবুলার ক্লাস্টার।
এসব বাস্তব হবার কোনো উপায় নেই। যদি জাদুমন্ত্রে কোনো ভিন্ন পৃথিবীতে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তবু বিশ্বাস্য নয়। কারণ চোখের সামনে জন্ম নিচ্ছে নক্ষত্ররাজি। তিমির অমানিশা থেকে নক্ষত্রবীথি যেমন ফুটে উঠছে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে, হয়ে যাচ্ছে উধাও। প্রতি পল-অনুপলে লাখ-কোটি বছর যে কেটে যাচ্ছে তা বোঝা যায় বেশ…
মন বিবশ করা দৃশ্যগুলো হারিয়ে গেল, যেমন করে এসেছিল একেবার শূন্য থেকে… এবার খালি এক আকাশের বুকে আবিষ্কার করল পোল নিজেকে। সে আর তার সাথে উইংমাস্টার। সেই পরিচিত সিলিন্ডার, সেই এ্যাভিয়ারি।
‘একদিনের পক্ষে এটুকুই যথেষ্ট, কী বলেন? প্রশ্ন তোলে উইংমাস্টার, ‘পরেরবার এলে কোন ধরনের দৃশ্য চান দেখতে?’
একটুও দ্বিধা নেই পোলের মনে। এক ঝলক হাসি দিয়ে জানিয়ে দিল কী দেখতে চায়।
১১. ড্রাগনের নিঃশ্বাস
এমনধারা কাজ যে সম্ভব তা বিশ্বাস করা কোন মানুষের কম্ম। এ যুগের উন্নতি দিয়েও ঠিক হজম করা যাচ্ছে না। এত বড় একটা ভুবনে কত কত টেরাবাইট… পেরাবাইট কাজে লাগানো হয়েছে? প্রযুক্তির উন্নয়নের ধারা ধরে স্টোরেজ মিডিয়াম এখন কোন পর্যায়ে? এ নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ করার মানে হয় না। বরং ইন্দ্রার কথা মেনে চলাই শ্রেয়, তুমি যে একজন ইঞ্জিনিয়ার সেসব কথা মাথা থেকে স্রেফ হাপিস করে দিয়ে উপভোগ করা
এখন সে উপভোগ করছে, আকণ্ঠ পান করছে প্রযুক্তির আশীর্বাদ-অমিয়। সেই সাথে ধেয়ে আসছে নস্টালজিক সব ভাবনা। একেবারে মনমরা করে দিচ্ছে তাকে। সে উড়ছিল প্রায় হাজার দুয়েক কিলোমিটার উচ্চতায়, তার যৌবনের মন মাতাল করা ভূমির উপর। অবশ্যই, অনুভূতিটা কৃত্রিম, এভিয়ারি মাত্র আধ কিলোমিটার উঁচু, তাতে কী, অনুভূতি তো।
উল্কাপাতে তৈরি হওয়া জ্বালামুখের উপর দিয়ে উড়ে গেছে সে মনে পড়ে গেছে এ্যাস্ট্রোনট ট্রেনিঙের সময় কীভাবে এগুলোর আশপাশে যেত সেসব কথা।
পোল নিশ্চিত তার আরামে উড়ে যাবার গতি শ দুয়েক কিলোমিটার নয়, বড়জোর টেনেটুনে বিশ কিলোমিটার হবে। কিন্তু ফ্ল্যাগস্টাফের কাছে পনের মিনিটেরও কম সময়ে যাবার অনুমতি আছে। এইতো, লোয়েল অবজার্ভেটরির ঝকঝকে গম্বুজগুলো! একেবারে কিশোর, দুরন্ত পোল এ জায়গায় কতবার এসেছে তার কোনো লেখাজোকা নেই। এ থেকেই তো এমন একটা কাজ বেছে নেয়ার চিন্তা মাথায় এসেছিল। এখানকার স্টাফরা কি মুখে মধু নিয়ে জন্মেছিল? এ্যারিজোনায়, মঙ্গলিয় ফ্যান্টাসিগুলোর যেখানে জন্ম, সেখানে সেও না জন্মালে এ জন্মে আর এ্যাস্ট্রোনট হওয়াটা কপালে জুটত না। হয়ত স্রেফ কল্পনা, মনে হচ্ছে লোয়েলের সেই বিখ্যাত সমাধি নিচেই কোথাও; কল্পনার লাগাম ছুটিয়ে দেয়া বিশাল সেই টেলিস্কোপটার কাছেই।
