কিন্তু যাদের প্রতিরোধ করা কঠিন এবং যাদের অবহেলাও করা যায় না তারা হল- নিচের মোহময়ী নীলচে গ্রহের মাটির কাছে বাস করা মানুষেরা।
‘অবশ্যই,’ বোঝয় প্রফেসর এ্যান্ডারসন, তুমি নিচে নেমে গেলে, সঠিক লাইফ। সাপোর্ট সিস্টেম নিয়ে গেলে, বাঁচবে, ভালভাবেই বাঁচবে, কিন্তু ব্যাপারটাকে মোটেও উপভোগ করতে পারবে না। সবচে ভয়ের কথা, এটা তোমার নিউরোমাস্কুলার সিস্টেমকে ক্ষত্মিস্থ করতে পারে। হাজার বছরের ঘুম থেকে জেগে উঠে সেটা আগের মতো কার্যকর হবে তা আশা করা ঠিক নয়।’
তার আরেক অভিভাবক ইন্দ্রা ওয়ালেস জানিয়ে দেয় কোন কোন অনুরোধ রাখতে হবে আর কোনটা ভদ্রভাবে করতে হবে প্রত্যাখ্যান। জানিয়ে দেয় অপ্রস্তুত অবস্থা থেকে সরে আসার পথ সম্পর্কে। নিজে নিজে এ অকল্পনীয় জটিল সভ্যতার সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি সম্পর্কে থোড়াই জানা সম্ভব। সহায়তা করছে ইন্দ্রা, সহায়তা করছে অগ্রসর প্রযুক্তি।
মানুষের মাঝে আগের মতো আর শ্ৰেণীভেদ নেই, তাতে সহজ কথা, হাজার বছরের পুরনো কথা, তার পরও, কয়েক হাজার সুপার সিটিজেন আছে এ সভ্যতায়। জর্জ অরওয়েলের কথাই বোধহয় সত্যি, কিছু মানুষ বাকিদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে এবং নিয়ন্ত্রণ করবে সব সময়। ভদ্রভাবে তিনি যা বলেছিলেন, কেউ কেউ বাকিদের চেয়ে বেশি ‘সম’ থাকবে।
মাঝে মাঝে একটা দার্শনিক চিন্তা চলে আসে মাথায়। এই এতসব নিয়ন্ত্রণ করে কে? কে এসবের খরচ যোগায়? কোনোদিন কি পোলের সামনে খুব ভদ্রভাবে হোটেলের বিশাল একটা বিল ধরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু আশ্বস্ত করে ইন্দ্রা, সে আসলে একটা অমূল্য বস্তু। যাদুঘরের এমন বস্তুকে কখনো অবহেলা করা হবে না। যা চায় তার সবই হাজির করা হবে চোখের সামনে, একেবারে অকারণে না চাইলেই হল। পোল ভেবে পায় না এ নিয়ন্ত্রণ সীমাটা কোথায়, কিন্তু কোনো একদিন সেটার মুখোমুখি হতে হবে তা জানে না।
.
জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো অযাচিতভাবে হঠাৎ করে ঘটে যায়- এমনি করে একটা ব্যাপার চলে এল পোলের সামনেও। ওয়াল ডিসপ্লে ব্রাউজারকে র্যান্ডম রেখে সে দেখে যাচ্ছিল সামনের নিরব ফ্রেমগুলো। একটা ব্যাপার নজর কাড়ে তখনি।
‘স্টপ স্ক্যান সাউন্ড আপ!’ সে চেঁচিয়ে ওঠে অনেকটা অকারণেই। আস্তে বললেও চলত।
প্রথমেই বাজনাটা পরিচিত মনে হয়। তারপর মনে পড়ে যায় বাকি সবটুকু। সামনের দেয়ালে ফুটে ওঠা মানুষগুলো একে অন্যকে ঘিরে পাক খাচ্ছে অবিরত। তাদের পিঠজোড়া মস্ত ডানা। কিন্তু শেইকোভস্কি সোয়ান লেকের মঞ্চায়ন দেখে অবাক না হয়ে পারতেন না, কারণ চরিত্রগুলো আসলেই একে অন্যকে ঘিরে পাক খাচ্ছে উড়তে উড়তে…
কয়েক মিনিট ধরে তাকিয়ে থাকে পোল, নিশ্চিত হয়ে নেয় এটা কোনো সিমুলেশন নয়। এমনকি তার দিনগুলোতেও মানুষ হলপ করে বলতে পারত না কোনটা সিমুলেশন আর কোনটা বাস্তব। অভিনয়টা নিশ্চয়ই কোনো লো গ্র্যাভিটির পরিবেশে হয়েছে, হয়ত আফ্রিকা টাওয়ারের উঁচুতে থাকা কোনো বিশাল হলরুমে।
এবার একটা সুযোগ নিবেই সে। কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবে না স্পেস এজেন্সির সেই কথা। তার প্যারাস্যুট জাম্পিং আর গ্লাইডিং বন্ধ করে দিয়েছিল তারা। হ্যাঁঙ-গ্লাইডিং নিয়ে সেই দূর্ঘটনা… কপাল ভাল ছিল, কমবয়েসি হাড়গুলো সেরে ওঠে খুব দ্রুত।
‘আসলে,’ বলে মনে মনে, ‘আমাকে থামানোর কেউ নেই, যদি প্রফেসর এ্যান্ডারসন বাগড়া দিয়ে বসে তো…’।
বাধা দেয়া তো পরের কথা, লাফিয়ে উঠল প্রফেসর। এক দশমাংশ জি’র লেভেলগুলোয় প্রত্যেক নাগরিকের এভিয়ারি আছে। কিন্তু সোয়ান লেকের মতো পালকওয়ালা ডানা দেয়া হল না পোলকে। দেয়া হল ঝিল্লির মতো ডানা। সেগুলো লাগিয়ে নিয়ে নিজের দিকে তাকাতেই কলজে লাফিয়ে ওঠে। সাক্ষাৎ বাদুড়।
‘চল, ড্রাকুলা!’
কিন্তু এ কথার ঘোড়াই পরোয়া করে ইনস্ট্রাক্টর। সে ভ্যাম্পায়ের নাম-গোষ্ঠিরও হদিস জানে না।
প্রথম দিকে তাকে বেধে রাখা হয় হালকা এক ফিতা দিয়ে, যেন উড়তে যাবার প্রাথমিক শিক্ষাগুলোয় কোনো গলদ থেকে না যায়, উড়তে গিয়ে বেসিক স্ট্রোকগুলোয় কোনো হেরফের না হয়ে যায়। সবচে বড় কথা, স্থিতাবস্থা শিখতে হবে তো! আর সব দক্ষতার মতো এটাও দেখতে যতটা সহজ কাজে তার ধারে কাছেও নয়।
বেধে রাখার ব্যাপারটা বিদঘুঁটে লাগে, সন্দেহ নেই, সেই সাথে এ চিন্তাও মাথায় ঘুরপাক খায়, এক দশমাংশ মধ্যাকর্ষণে মানুষ নিজেকে আর কতটা আঘাত দিতে পারবে পড়ে গিয়ে উইংমাস্টার গর্বের সাথে বলে, আর কাউকে এত সহজে শেখানো যায়নি। কথাটা হয়ত সত্যি; হাজার হলেও, ফ্র্যাঙ্ক পোল একজন সাবেক এ্যাস্ট্রোনট। কিন্তু মিথ্যাও হতে পারে, হয়ত সে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই গৎ বাধা কথাটা বলে ইন্সপায়ারড করে। কে জানে!
চল্লিশ মিটার লম্বা চেম্বারে ডজনখানেক ফ্রি ফ্লাইট দিয়ে, আশপাশে উড়তে থাকা ও উঁচু নিচু হয়ে থাকা জিনিসপত্রকে সাবধানে এড়িয়ে প্রথম সলো ফ্লাইটের সার্টিফিকেট পেয়ে গেল পোল। ফ্ল্যাগস্টাফ এরো ক্লাবের এ্যান্টিক সেসনায় উনিশ বছরের টগবগে মন নিয়ে উড়ল সে।
প্রথম উড্ডয়নের জন্য ‘দ্য এভিয়ারি’ নামটা খুব একটা সহায়ক হয়নি। চান্দ্র সীমার ঐ বিশাল অঞ্চলটার মতোই এটাও। গোলাকার। আধ কিলোমিটার উঁচু, চার কিলোমিটার ব্যাস। কোথাও চোখ আটকে যায় না। খটকা লাগে না কোথাও। দেয়ালের রঙ ফিকে নীল, ঠিক যেন দিগন্তের আকাশ। এলাকাটা যেন অসীম।
