আর এখানে এমন এক রহস্য লুকিয়ে আছে যেটার সুরাহা কেউ করতে পারেনি। তুমি ভাবতে পার উন্নত করে তোলা হার্বিভোররা, যেমন শিম্পাঞ্জি আর গরিলা- এসব কাজে খুব দক্ষ হবে। আদতে তা মোটেও সত্যি নয়। তাদের ধৈর্যের খুব অভাব।
কিন্তু মাংসাশীরা খুব কাজের। এখানে আমার যে বন্ধুকে দেখলে তার কথাও বলতে পার। খুব সহজেই ট্রেইন্ড করে নেয়া যায়। আরো বড় কথা হল- এখানে একটা প্যারাডক্স আছে। তাদের মডিফাই করে নেয়ার পর আচার আচরণে খুব সভ্য হয়ে যায়। অবশ্যই, তাদের পিছনে কাজ করছে হাজার বছরের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। আর দেখ, এককালের গুহাবাসী মানব হিংস্র নেকড়ের কী দশা করেছে সামান্য ট্রায়াল এ্যান্ড এরর পদ্ধতি অনুসরণ করে।
হাসল ইন্দ্রা মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়া সুরে, তুমি হয়ত ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারবে না, ফ্র্যাঙ্ক, কিন্তু সেই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়াররা ভাল ভাল বেবিসিটারও তৈরি করে যাদের অনেক পছন্দ করে বাচ্চারা। এ নিয়ে পাঁচশ বছরের পুরনো একটা রসিকতা চালু আছে, ‘তোমার বাচ্চার দেখভালের জন্য যদি কোনো ডাইনোসরকে বিশ্বাস কর তো ভাল, বিশ্বাস করেই দেখ, দেখ পস্তাতে হয় কিনা?”
হাসিতে যোগ দিল পোলও, নিজের ভয়ের ব্যাপারটায় এখনো ধাতস্থ হয়ে নিতে পারছে না। প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য সে অবশেষে ইন্দ্রার কাছে সেই প্রশ্নটা তুলল। যেটার জন্য মন খচখচ করছে।
‘এই এতকিছু নিয়ে কষ্টের প্রয়োজন কী, যখন টাওয়ারের যে কেই একটু চেষ্টা করলেই আসল ভূমিতে গিয়ে দেখে আসতে পারে?
চিন্তান্বিত চোখে চেয়ে থাকে ইন্দ্রা। মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নেয়।
কথাটা আসলে পুরোপুরি ঠিক নয়। ঝুঁকি আছে। আছে বিপদের সম্ভাবনা। ঝক্কি-ঝামেলারও কোনো অভাব নেই। ছত্রিশ হাজার কিলোমিটার এলাকার প্রায় সবটাই হাফ জির কম। আর সেখান থেকে পৃথিবীর বুকে পুরো এক জিসহ নেমে যাওয়াটা কষ্টকর, এমনকি কোনো হোভারচেয়ার থাকলেও সে ঝুঁকি কেউ নিতে চায় না।
‘আমার ক্ষেত্রে কথাটা খাটবে না। আমার জন্মই এক জিতে। বেড়ে ওঠা পৃথিবীর পৃষ্ঠে। সেই হিসাব ঠিক রাখার জন্য ডিসকভারির বুকে এক্সারসাইজ করার কাজে কখনো হেলাফেলা করিনি।’
কথাগুলো বলতে হবে প্রফেসর এ্যান্ডারসনের সাথে। বলার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু তোমার শরীরটা এখনো মানিয়ে নিতে পারেনি, সেটার জৈবঘড়ি এখনো শক্তি পায়নি পুরোপুরি। সেটা কখনো থামেনি এবং তার ধারণা তোমার বয়স পঞ্চাশ থেকে সতুরের মধ্যে। যদিও তোমার শরীর ভালই আছে, তবু এক হাজার বছর হিমশীতলে থাকার পর পুরো শক্তি ফিরে পাবার আশা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
আচ্ছা, একটু একটু বুঝতে পারছি এখন, তিক্তকণ্ঠে নিজেকে শোনায় পোল। এতক্ষণে বোঝা গেল কেন এ্যান্ডারসন তার শরীরের শক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেন পেশিশক্তি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে অষ্টপ্রহর।
আমি বৃহস্পতির এলাকা থেকে পৃথিবীর মাত্র দু হাজার কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছি। কিন্তু কী কপাল, আমার সেই হামল্যান্ডের উপরে ভেসে থাকতে পারব সারা জীবন, কখনো তার কোমল ভূমিতে পা ফেলে চলতে পারব না যেমনটী চলেছিলাম একেবারে বাচ্চা একটা ছেলে হিসাবে।
জানি না কী করে ব্যাপারটায় নিজেকে মানিয়ে নিব, জানি না…
১০. ইকারুসের বসতবাড়ি
তার হতাশা কেটে যায় দ্রুত : অনেক অনেক কাজ পড়ে আছে সামনে। দেখার আছে অনেক কিছু। মানবজাতি বিস্ময়ের মেলা বসিয়ে দিয়েছে। হাজারটা পূর্ণ জীবনেও তা দেখে কুলানো যাবে না। যাবে না স্বাদ-গন্ধ নেয়া। এখন ঠিক করার পালা এই বিস্ময় ভুবনের কোন কোন জাদুকে উপভোগ করতে হবে, কোনটাকে যেতে হবে পাশ কাটিয়ে। অযথা বিনোদনগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায় সে। চিনতে চায় নতুন যুগের বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে, জানতে চায় সমাজ সভ্যতা আর জ্ঞানের নতুন নতুন দুয়ারের চাবিকাঠির ঠিকানা।
ব্রেইনক্যাপ আর সেই সাথে সেই বই আকারের প্লেয়ারগুলোর (নাম ব্রেইনবক্স) সহায়তা নেয়া চলে দেদার। দ্রুত সে ইন্সট্যান্ট নলেজ ট্যাবলেটের একটা লাইব্রেরি গড়ে ফেলল। প্রতিটায় একটা কলেজ ডিগ্রিতে যা কিছু দরকার তার চেয়ে বেশি জ্ঞান আছে নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট বিষয়ে, সব ধরনের ইন্টার্যাক্টিভ সুবিধা সহ। ব্রেইনক্যাপের আসল মজা সে প্রথমে জানতে পারেনি। এখন পারছে। এটাকে তীব্র গতিতে মাথার সাথে তাক করে নেয়া যায়। মানুষ যে গতিতে পড়ে বা লেখে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত এটা ব্যবহারকারীকে আনন্দ বা তথ্য দেয়। শোয়ার আগে ঘন্টাখানেকের জন্য সহনীয় গতিতে সেট করে নাও। যখন খুলবে, তখন দেখতে পাবে জ্ঞানের নতুন নতুন অভাবনীয় দ্বার খুলে গেছে হাট হয়ে। এ যেন কোনো বইপোকা লাইব্রেরিয়ানের মতো যে হঠাৎ দেখতে পায় তার মালিকানায় আরো একটা অজানা বিষয়ের তাক জোড়া বইপত্র আছে।
বড় হিসাবে ধরতে গেলে, তার সময়ের তুলনায় সে ছিল অনেক অগ্রসর আর জ্ঞানী এক লোক। আর সে এখন বেছে বেছে মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়। যখনি কোনো সায়েন্টিস্ট, ইতিহাসবেত্তা, লেখক বা শিল্পী আসে যারা মিডিয়ার এমন সব ক্ষেত্রে কাজ করছে যেগুলো এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি বা কুঁড়ি মেলেনি স্বাগত জানায় সে তাদের। চার টাওয়ার থেকে হাজারটা অনুষ্ঠানের দাওয়াত, দেখা করার অনুরোধ উপরোধ আসে অজস্র; প্রতিদিন। খোঁড়াই পরোয়া করে এসবের।
