কমার্শিয়াল ফ্লাইটগুলোয় এ কথা কতবার শুনতে পেয়েছে সে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল, আধঘন্টাও হয়নি যাত্রার। তার মানে গড় গতি ঘন্টায় বিশ হাজার কিলোমিটারের চেয়েও বেশি! গত দশ মিনিট ধরে তারা এত তীব্র গতিতে মন্দনের শিকার হয়েছে যে সেটা বাস্তবে অনুভব করলে পা ঠেকে থাকত ছাদে আর মাথা হয়ে যেত পৃথিবীমুখো।
নিরবে খুলে গেল দরজা। বাইরে পা রেখে পোল সেই ঢোকার মূহুর্তের মতো একটু এলোমেলো অনুভব করল। এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারে সে, ট্রানজিশন জোন দিয়ে পার হয়েছে যেখানে ইনার্শিয়াল ফিডের উপর প্রভাব ফেলছে গ্র্যাভিটি। এখানে সেটা চাঁদের বুকের মতো।
পা দিয়েই থমকে গেল পোল। সামনের বিশাল অঞ্চলটা প্রাকৃতিক। কোনো দেয়াল নেই ভিতরে। পাঁচ কিলোমিটার দূরে আছে অপর প্রান্তের দেয়াল। কোনো মহাকাশবিদের কাছেও এটা বিস্ময় নিয়ে আসবে নিঃসন্দেহে। চাঁদের বুকে, মঙ্গলের বুকে নিশ্চয়ই এর চেয়ে বড় ঘের দেয়া এলাকা আছে, কিন্তু এটুকু বুকে হাত দিয়ে বলা যায়, মানুষের তৈরি মহাকাশের কৃত্রিম এলাকাগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম বৃহত্তম।
আউটার ওয়ালের কাছে পঞ্চাশ মিটার ভিউয়িং প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে তারা। দেখা যাচ্ছে বিচিত্র কিছু গাছ। বিশাল। প্রথমে চেনা যায় না। পরে বোঝা গেল, ওক। কিন্তু এত বড় কেন? চাঁদের মতো অভিকর্ষে খুব দ্রুত বেড়েছে সেগুলো। তাহলে তালগাছের কী দশা হত। আর জায়ান্ট রিডের কথা ভাবতে গেলে…।
মাঝামাঝি একটা হ্রদ দেখা যাচ্ছে। ছোটখাট। ঘাসে মোড়া সমভূমি থেকে কুলকুল করে ক্ষীণ স্রোতস্বিনী নেমে আসছে সেটার বুকে। একটা ব্যাপার চোখ কেড়ে নেয়। বিশাল দানবীয় গাছ ঝাঁকড়া। নিশ্চয়ই বট! কিন্তু পানির উৎস কোথায়? মৃদু ড্রামের আওয়াজ ভেসে আসছে পোলের কানে। বাকানো গোল হয়ে যাওয়া দেয়াল ধরে সামনে তাকাতেই রহস্য ধরা দিল। ছোটখাট নায়াগ্রা থেকে পানি ছিটকে পড়ছে। তার উপরে জলকণা নাচানাচি করে অহর্নিশি। একেবারে নিখুঁত রামধনু ঝিকমিক করছে।
ঘন্টার পর ঘন্টা প্রশংসার দৃষ্টিতে এ দৃশ্যগুলো দেখা যায়। নিচের পৃথিবী ছেড়ে আসার পরও মানুষ যে এ বিশাল কৃত্রিম কফিনে পৃথিবীরই ছোট মডেল গড়ে নিবে তাতে আর অবাক হবার কী হল। মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে উকার বেগে। এগিয়ে যাচ্ছে দূর দূরান্তে। তারপরও, নিজের উৎসটাকে কে ভুলতে চায়? অবশ্যই, তার আমলেওতো প্রতিটা মহানগরীতে ছিমছাম উদ্যান ছিল- কৃত্রিমতার দোষে দুষ্ট তার পরও, মানুষ সেখানে গিয়ে হাপ ছেড়ে বাঁচত। সেই কল্পনাই এখানে পবিত হচ্ছে। এখানে, সেন্ট্রাল পার্ক, আফ্রিকা টাওয়ারে।
‘আর কত দেখবে দূর থেকে। কপট রাগ ইন্দ্রার চোখেমুখে, হাসির ভাজে ভাজে, চটজলদি নেমে পড় দেখি। এখানে তো আর চাইলেই আমি এসে পড়তে পারি না।’
এ কম মধ্যাকর্ষণের জায়গায় হাঁটা কোনো সমস্যাই নয়। টের পাওয়া যায় না। তবু সময় সময় তারা মনোরেলের সুবিধা উপভোগ করে। একটু ঝরঝরে হয়ে নিতে থামে কোনো এক ক্যাফের সামনে। কমপক্ষে পোয়া কিলোমিটার লম্বা রেডউডে বানানো জায়গাটা।
আশপাশে মানুষ নেই। শুনশান প্রকৃতি। সহযাত্রিরা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে সুদর্শন এলাকার আড়ালে। এখন যেন এ পুরো স্বপ্নরাজ্য শুধু তাদের। সবকিছু ঠিকঠিক নিয়ন্ত্রণ করা হয় কীভাবে কে জানে! সম্ভবত রোবটদের কোনো সেনাদল আছে সেসব কাজের জন্য। ডিজনি ওয়ার্ল্ডে সেই ছেলেবেলায় যাবার কথা এখনো মনের পর্দায় ভাসে। কিন্তু এ তো তার চেয়ে অনেক অনেক ভাল। লোকজনের ভীড়বাট্টা নেই। নেই কলরোল। সবচে বড় কথা, মানবজাতি আর তাদের বানানো কৃত্রিমতার প্রায় কোনো ছোঁয়াই দেখা যাবে না।
সামনে অর্কিডের চমৎকার এক কালেকশন। কিছু কিছু আকার আকৃতিতে রীতিমত দানবীয়। এসব দেখতে দেখতেই পোল জীবনের সবচে বড় ধাক্কাগুলোর একটা খেল। ছোটখাট চিরাচরিত এক বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তারা। খুলে গেল দরজা- বেরিয়ে এল মালি।
আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্র্যাঙ্ক পোলের অহঙ্কারের শেষ নেই, কিন্তু একেবারে পুরোদস্তুর বয়েসি হয়ে যাবার পরও আতঙ্কে সে গলা চিরে চিৎকার দিবে সেটা কল্পনাতেও ছিল না। তার সময়কার আর সবার মতো সেও জুরাসিক মুভিগুলো পটাপট গিলেছিল, তাই র্যাপ্টর চিনে নেয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এমন জিনিস যে স্বচক্ষে দেখা যাবে তা ভাবাটা অবশ্যই কঠিন।
‘ও, আই এ্যাম টেরিবলি স্যরি,’ থই পাচ্ছে না ইন্দ্রা, তোমাকে সাবধান করে দেয়ার কথাটা আমার মনেই আসেনি।
পোলের উত্তেজিত স্নায়ুগুলো আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে। অবশ্যই, এ সুন্দর ও গোছানো পৃথিবীতে কোনো রকম ঝুঁকি যে নেই তাতো নিশ্চিত; তবু…
কিন্তু ডাইনোসরের কোনো উৎসাহ নেই তাদের ব্যাপারে। চোখ ফিরিয়ে নিল সে। তারপর সোজা চলে গেল, বাগানের জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে এল আবার। কাঁধের পিছনে একটা ঝোলা ঝোলানো। পাখির মতো ডানা ঝাঁপটানোর ভাব করে চলে গেল সে দূরে। তারপর একবারো পিছনে না ফিরে হাপিস হয়ে গেল দশ মিটার উঁচু সব সূর্যমুখীর পিছনে।
‘আমার একটু ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে, খেই ধরল ইন্দ্রা, যখন সম্ভব, আমরা বায়ো অর্গানিজম ব্যবহার করতে পছন্দ করি। রোবট আর পছন্দ নয়, বুঝতেই পারছ, যত্তসব কলকজার কারবার। আমাদের বিশ্বাস কার্বনের উপর, ধাতুর উপর নয়। কাজে লাগতে পারে এমন মাত্র কয়েকটা প্রাণি আছে আর আমরা তাদের কখনো না কখনো লাগিয়ে বসে আছি।
