‘আমি এ ঝুঁকিটুকু নিচ্ছি। এর চেয়ে উপরে ওঠার অভিজ্ঞতা আছে আমার।
দু সেট এয়ারলকের ভিতর দিয়ে গিয়ে টাওয়ারের এক্সটেরিয়র ওয়ালে যাবার পর যেখানে গেল তারা সেটাকে খুব ছোট কোনো থিয়েটারের অডিটরিয়াম বলে চালানো যায়। ভিতরে থরে বিথরে সাজানো সিট। বসে আছে অনেকে। পোলের মনে কেন যে লক্ষ কোটি টন বাতাসের চাপের কথা উঠল যেগুলো স্পেসের গায়ে হারিয়ে যাবার জন্য পাগল হয়ে আছে।
জনা বারো প্যাসেঞ্জারকে একেবারে সুস্থ স্বাভাবিক লাগল। তাদের মনের জগতেই যেন সেসব চিন্তা নেই। সবাই চিনতে পারছে তাকে। একটা দ্ৰ হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে ঠোঁটে। একটু নড করেই ঘুরিয়ে নিয়েছে মাথা বাইরের দিকে।
‘ওয়েলকাম টু স্কাইলাউঞ্জ,’ বলল সেই অপ্রতিরোধ্য অটোভয়েস, ‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে আরোহন শুরু হচ্ছে। নিচতলায় রিফ্রেশমেন্ট আর টয়লেট পাবেন আপনারা।
কিন্তু এ ভ্রমণে ঠিক কতটা সময় লাগবে? ভেবে পায় না পোল। আমরা উঠতে আর নামতে গিয়ে বিশ হাজারে বেশি কিলোমিটার পেরিয়ে যাব। আমার পৃথিবীতে এসব কথা ভাবাও পাপ ছিল…
উপরে ওঠা শুরু হবে, অপেক্ষা করছে সে। দু হাজার কিলোমিটার নিচের বিবশ করা চিত্রটার দিকে তাকিয়ে আছে সে। উত্তর গোলার্ধে এখন শীত। কিয় পরিবেশ যে অনেকটা বদলে গেছে তার প্রমাণ, বিষুব রেখার নিচে বরফের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
ইউরোপের আকাশে কোনো মেঘ নেই। এত বিস্তৃত দেখা যাচ্ছে সবকিছু যে চোখ আর সহ্য করতে পারে না। একের পর এক বিশাল মহানগরীর চিহ্ন চোখে পড়ে যেগুলো শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেছিল। শহরগুলো ছোট হতে শুরু করে তার সময় থেকেই যখন কম্যুনিকেশন টেকনোলজি পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিতে শুরু করে। আরো বিচিত্র সব ব্যাপার চোখে পড়ে। সাহারার বুকে লেক সালাদিন এখন আর কোনো হ্রদ নয়, পুরোমাত্রায় সাগরের মতো বলা চলে।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পোল ভুলে গেল সময়ের কথা। হঠাৎ খেয়াল হয়, পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে কিন্তু এলিভেটরের নড়ার নামগন্ধও নেই।
কোনো সমস্যা নাকি? নাকি অন্য কিছুর জন্য অপেক্ষা চলছে।
এরপর সে এমন অদ্ভুত কিছু চোখে দেখতে পেল যা অস্বীকার করার তীব্র ইচ্ছা জাগে প্রথমে। পৃথিবীর ফ্রেমটা উঠে আসছে আস্তে আস্তে। নিচের দৃশ্যগুলো এখন অনেক বেশি বিস্তৃত। তাহলে কি তারা নিচে নামছে।
হেসে ফেলল পোল। স্বাভাবিক ব্যাখ্যাটা মনে পড়ে গেছে চট করে।
“আর একটু হলেই বোকা বানিয়ে ছেড়েছিলে, ইন্দ্রা। মনে করেছিলাম এটা বাস্ত ব, কোনো ভিডিও প্রজেকশন নয়।
চাপা হাসি মুখে নিয়ে তার দিকে চোখ তুলল ইন্দ্রা।
‘আবার ভেবে দেখ, ফ্র্যাঙ্ক। মিনিট দশেক হয়ে গেছে আমাদের চলার। এতক্ষণে আমাদের গতি ঘন্টায় হাজারখানেক কিলোমিটার। যদিও এ এলিভেটরগুলোয় একশ জি’র বেশি উঠে যায় তৃরণ, আমাদেরটা দশের বেশি হবে। না। এত ছোট দূরত্বে এর চেয়ে বেশি ওঠার সুযোগ নেই।
‘অ-অসম্ভব। সেন্ট্রিফিউজে তারা আমাকে বড়জোর ছ জি দিয়েছিল। চিন্তা কর, ওজন বেড়ে গেল দু গুণ! আধ টন ওজন নিয়ে আমার খুব একটা যুত হয়েছিল তা কি বলতে পারি না। ভিতরে ঢোকার পর থেকে যে আমরা নড়িনি এটুকু হলপ করে বলতে পারি।’
পোলের কণ্ঠ একটু উঁচু মাত্রায় চড়ে আবার সরসর করে নিচে নেমে এল। আশপাশের যাত্রিরা কথা না শোনার ভাণ করছে।
‘আমি ঠিক বুঝি না কী করে ব্যাপারটা করল তারা, ফ্র্যাঙ্ক। নাম দিয়েছিল ইনাটিয়াল ফিল্ড। সম্ভবত শার্প নামে ডাকে- এস অক্ষরটা বিখ্যাত রাশিয়ান বিজ্ঞানী শাখাররে প্রতিনিধিত্ব করে- বাকিগুলো যে কী কে জানে।
আস্তে আস্তে ধাতস্থ হয়ে এল পোল। এখানে নিশ্চয়ই জাদু থেকে ভিন্ন করা যাবে না এমন এক টেকনোলজি ব্যবহার করেছে তারা।
‘আমার কয়েকজন বন্ধুর মনে ‘স্পেস ড্রাইভ’ এর স্বপ্ন ছিল- এমন এনার্জি ফিল্ড যেগুলোকে রকেটের বদলে কাজ করবে, এমনভাবে নড়বে যেন গতিবৃদ্ধি টের পাওয়া না যায়। আমরা প্রায় সবাই তাদের পাগলাটে ভাবতাম। কিন্তু তাদের কথাই যে ঠিক তা আমাকে দেখে যেতে হল। এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না… আর, যদি ভুল না হয়ে থাকে তো, আমরা আসলে আস্তে আস্তে ওজন হারাচ্ছি।’
হ্যাঁ- চান্দ্র ভ্যালুর সাথে মানিয়ে নিচ্ছে। বাইরে বেরুনোর পর তোমার মনে হবে আমরা চাঁদের বুকে আছি। কিন্তু কল্যানের কসম, ফ্র্যাঙ্ক- তোমার ইঞ্জিনিয়ার হবার কথাটা ভুলে গিয়ে চিত্রটা উপভোগ কর।
উপদেশটা ভাল। আফ্রিকা আর ইউরোপের পুরোটা এবং এশিয়ার অনেকখানি দেখা যাচ্ছে। মন বিবশ হয়ে যেতে চায়। পোল প্রস্তুত ছিল অনেকটাই। ছত্রিশ হাজার কিলোমিটার লম্বা ও কয়েক কিলোমিটার চওড়া গগনচুম্বী অট্টালিকার কথা ভুলতে পারছে না কিছুতেই।
রকেটের যুগ নিশ্চয়ই কয়েক শতাব্দি আগে হারিয়ে গেছে। প্রোপ্যাল্যান্ট সিস্টেম আর কমবাশন চেম্বার বিষয়ক তার সমস্ত জ্ঞান- আয়ন প্রাস্টার আর ফিউশন রিএ্যাক্টরের সমস্ত অভিজ্ঞতা আজ অন্তসারশূন্য। এসবের দিন আর নেই কিন্তু মাস্তুলে বসে থাকা নাবিক যখন বাতাস পড়ে যেতে দেখে, তখন যেমন আহত হয় তেমনি আহত বোধ করে সে।
আস্তে আস্তে মুড বদলে যায়, নিরব হাসিতে ভরে ওঠে মুখটা। অটোভয়েস বলছে, যাত্রা শেষ হতে আর দু মিনিট বাকি। লক্ষ্য রাখুন, আপনার কোনো জিনিস যেন এখানে না থেকে যায়।
