‘অথবা যুদ্ধ।‘
‘একই কথা; কে জানে, কোনোদিন জানতে পারব কিনা! কিন্তু যেহেতু আমাদের সভ্যতাও একই ধরনের শক্তির উৎস ব্যবহার করে, আপনি বুঝতেই পারছেন কেন এন স্কৰ্প মাঝে মাঝে আমাদের দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফেলে দেয়।‘
‘আর আমাদের শুধু গলতে থাকা নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর আছে যা নিয়ে আমরা ভাবিত হতে পারি, তাই না?’
‘এখন আর না, থ্যাঙ্ক ডিউস। কিন্তু আমি আপনাকে টি এম এ জিরোর আবিষ্কারের ব্যাপারে আরো বলতে চেয়েছিলাম, কারণ এটা মানব ইতিহাসের সবচে বড় মোড়ের মধ্যে একটা।
‘টি এম এ এক পাবার পর মানুষ যথেষ্ট ঝাঁকি খেয়েছে। কিন্তু পাঁচশ বছর পর সেটা আরো প্রকট হয়ে দেখা দেয় টি এম এ জিরো আবিষ্কারের সাথে সাথে। এটা বাসার অনেক কাছে। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, এইতো, নিচে, আফ্রিকার বুকে। রীতিমত আতঙ্কের ব্যাপার, তাই না?
৮. ওলডুভাইয়ে ফিরে দেখা
এই লিকিরা, নিজেকেই শুনিয়ে বলে ডক্টর স্টিফেন ডেল মার্কো মাঝে মাঝে, হয়ত কখনোই এ জায়গাটা চিনতে পারত না, যদিও পাঁচ শতাব্দি আগে লুইস আর মেরি আমাদের প্রথম পূর্বপুরুষকে খুঁড়ে তুলে এনেছিল এখান থেকে মাত্র বারো কিলোমিটার দূরে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং আর ছোট্ট আইস এজটা বদলে দেয় ভূ-চিত্র। যদিও অসম্ভব অগ্রসর টেকনোলজির সহায়তায় সরিয়ে দেয়া হয়েছিল বরফ যুগকে, তবু তার প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে চারপাশের দৃশ্যপট। ওক আর পাইন গাছেরা এখনো যুঝছে; জানে না প্রতিকূল পরিবেশে কে টিকে যাবে শেষ পর্যন্ত।
ব্যাপারটা বিশ্বাস করা কষ্টকর যে এই ২৫১৩ সালেও অতি উৎসাহী এ্যানথ্রোপোলজিস্টদের খোঁড়াখুঁড়ির হাত থেকে ওলডুভাইয়ে কিছু বেঁচে আছে। যাই হোক, সাম্প্রতিক ঝড়ো বন্যায়, যা হবার কথা ছিল না, তার কবলে পড়েই, উপরের দিকের কয়েক মিটার মাটি ক্ষয়ে যায়। ডেল মার্কো এ সুযোগটাই নেয়। তারপর, সেখানে সামান্য ডিপ স্ক্যান করে যা দেখতে পায় তা ঠিক বিশ্বাস্য নয়।
এক বছরের চেয়েও বেশি সময় ধরে গহিন খনন চলল, চলল সাবধান পর্যবেক্ষণ, তিলতিল করে। কখনো কল্পনা করতেও যা বাধে তার চেয়ে বেশি অদ্ভুত এই বাস্তবতা, ভেবে হয়রান হয় সে। রোবট ডিগিঙ মেশিনগুলো খুব দ্রুত প্রথম কয়েক মিটার খুঁড়ে ফেলল। এবার ট্র্যাডিশনাল গ্র্যাজুয়েশন ছাত্রদের দাস-দল ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের সাথে কাজ করেছিল চারটা কঙ। দানবীয় কঙ। ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখেনি ডেল মার্কো। কিন্তু ছাত্রেরা জেনেটিক্যালি মডিফাইড গরিলাগুলোকে মনে করে নিজেদের দস্যি ছেলে। এমনকি গুজব উঠেছিল যে তাদের এই ভালবাসার খেলাটা পুরোপুরি তুলসী পাতায় বোয়া না।
প্রথম কয়েক মিটারের কথা। পুরো কাজটাই মানুষের হাতের। সামান্য টুথব্রাশ ব্যবহার করেই তাদের মাটি খুঁড়তে হয়। খুঁড়তে হয় বললে ভুল বলা হবে, মাটিকে তোয়াজ করে করে ধুলা উড়াতে হয়। একটু একটু করে। অনেক অনেক সময় নিয়ে। এবার কাজটা শেষ হল; যেন হাওয়ার্ড কার্টার তুতেনখামেনের সমাধিমন্দিরের ভিতরে থাকা স্বর্ণসম্ভারের ঝলক দেখতে পাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই নিশ্চিত হয়ে গেল ডেল মার্কো, মানবেতিহাসের পাতায় পাতায়, মূল্যবোধ আর দর্শনের পথে পথে নতুন মোড় সৃষ্টি হবে। বদলে দিতে হবে অনেক কিছুই।
পাঁচ শতাব্দি আগে চাঁদের বুকে আবিস্কৃত মনোলিথ টি এম এ একের সাথে এর অনেক অনেক মিল। হুবহু একই রকম। কাজেও একই। আলল শুষে নিচ্ছে। বুভুক্ষুর মতো শুষে নিচ্ছে সর্বক্ষণ। লুসিফারের ক্ষীণ আলো কি সূর্যের খরতাপ, কোনোটাই তার গা থেকে বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নিয়ে আসতে পারে না।
সে, তার কলিগেরা, পৃথিবীর সবচে বিখ্যাত আধ ডজন জাদুঘরের ডিরেক্টর, উজ্জ্বলতম তিন এ্যানথ্রোপোলজিস্ট, সবচে বড় মিডিয়া সাম্রাজ্যের দুই কর্ণধার সেই গর্তের ভিতরে, একেবারে নিশ্চুপ হয়ে আছে। ডেল মার্কো জানে না এত বেশি দামি মানুষ এতক্ষণ একসাথে চুপ করে কখনো ছিল কিনা।
এখানে, চারপাশে যেখানে মানুষ, আদিম মানুষ, মানুষের পূর্বপুরুষ, নানা আদিম জন্তু জানোয়ার ফসিল হয়ে আছে সেখানে, সেসবের নিচে যাকে পাওয়া গেল তার কথা ভাবা সম্ভব হয় কীভাবে?
এখানেই- সময় এবং স্থানের হিসাবে ঠিক এখানেই- মানব সম্প্রদায়ের পথচলা শুরু হয়েছিল।
আর এই মানবজাতির শত সহস্র ঈশ্বরের মধ্যে এই মনোলিথই প্রথম।
৯. স্কাইল্যান্ড
‘কাল রাতে আমার বেডরুমে ছুঁচো দৌড়াদৌড়ি করেছে,’ মৃদু স্বরে অভিযোগ করল পোল, ‘একটা বিড়াল যোগাড় করা যায় নাকি কোনোমতে?’
ডক্টর ওয়ালেসের চোখেমুখে বিভ্রান্তি। তারপর হঠাৎ হাসির দমকে ভেঙে পড়ল সে।
‘তুমি নিশ্চয়ই কোনো ক্লিনিং মাইক্রোটের আওয়াজ পেয়েছ- আমি প্রোগ্রামিং চেক করে রাখব যেন সেগুলো তোমাকে না জ্বালায়। সাবধান, কোনোটাকে ধরে ফেললে আবার পা দিয়ে চেপে ধরো না। তাহলেই কর্ম সারা। সে সহায়তার জন্য খবর পাঠাবে আর সব বন্ধু চলে আসবে চটজলদি।’
অনেক শিখতে হবে অনেক কম সময়ে। না, ভাবনাটা ঠিক নয়, ধমকায় পোল নিজেকে। সামনে হয়ত আরো একটা শতাব্দি পড়ে আছে- এ যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানকে ধন্যবাদ। দীর্ঘজীবী হয় মানুষ। চিন্তাটা তাকে আনন্দের বদলে বিমর্ষ করে তোলে।
