হালের ইন্সট্রাকশনে একটা বড় ধরনের প্রোগ্রামিং ক্রটি ছিল। মিশনের এমন সব ব্যাপার তার জানা ছিল যা আপনি বা ডেভ বোম্যান কেউ জানতেন না। রেকর্ডিংয়ে সব পাবেন…
যাই হোক, সে একই সাথে তিনজন হাইবারনটের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমও কাট অফ করে দেয়। তারাই ছিল আলফা ক্রু। বোম্যান তাদের দেহেরও সদগতি করে।
(ওরে বাবা! তাহলে আমি আর ডেভ বেটা কু? দ্বিতীয় স্তরের? আরো একটা ব্যাপার যা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই…)
‘তাদের কী হল? প্রশ্ন তুলল পোল, আমার মতো করে উদ্ধারের কোনো আশা ছিল না?
‘আই এ্যাম এ্যফ্রেইড, না। চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি। হালের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কয়েক ঘন্টা পর বোম্যান তাদের ইজেক্ট করে। আপনার অর্বিট থেকে তাদেরটা সামান্য এদিক সেদিক হয়ে গিয়েছিল। বৃহস্পতির গায়ে পড়তে পড়তে ভস্ম হয়ে যাবার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট। অথচ আপনার কক্ষপথ কী করল জানেন? বৃহস্পতির অভিকর্ষকে কাজে লাগিয়ে আপনাকে অসম্ভব দ্রুতিতে পাঠিয়ে দিল বাইরের দিকে। আর মাত্র কয়েক হাজার বছর পরই চলে যেতেন ওরিয়ন নেবুলার দিকে…
‘তারপর কী করে যে সব ঠিক ঠিক চালাল বোম্যান তা ভাবতেও অবাক লাগে। সময় মতো বৃহস্পতির অর্বিটে নিয়ে গেল ডিসকভারিকে। দেখা পেল দেখা পেল এমন একটা কিছুর দ্বিতীয় অভিযানে যাকে নাম দেয়া হয়েছিল বিগ ব্রাদার। টাইকো মনোলিথের যমজ। শত শত গুণ বড়।
‘এবং ঠিক সেখানেই আমরা হারিয়ে ফেলি তাকে। বাকি স্পেস পোডটায় চড়ে বেরিয়ে গেল ডিসকভারি থেকে। নেমে গেল বিগ ব্রাদারের দিকে। হাজার বছর ধরে আমরা তার সেই শেষ বাক্যের প্রহেলিকায় আটকে আছি, ‘বাই ডিউস- এ তো তারায় তারায় জা!”
(এইতো, পথে এসেছ! পোল বলল নিজেকেই। ডেভ কখনো এমন কথা বলবে না। সে নিশ্চয়ই বলেছিল, মাই গড- এ তো তারায় তারায় ভরা!)
‘বোঝাই যাচ্ছে, পোডটাকে মনোলিথের ভিতরে কোনো অসম্ভব শক্তিশালী বল টেনে নিয়েছিল। কারণ এটা সম্ভবত বোম্যান- এই প্রচন্ড ত্বরণের হাত থেকেও বেঁচে যায় যদিও তার একেবার চূর্ণ হয়ে যাবার কথা। এবং এটুকুই জানা ছিল আমাদের। দশটা বছর ধরে। পরে এল আমেরিকা আর রাশিয়ার যুক্ত অভিযান লিওনভ মিশন।
ফলে সেটা ডিসকভারির সাথে একটা সংযোগ তৈরি করে আর ডক্টর চন্দ্র হালের সাথে মোলাকাত করে। হ্যাঁ, এটুকু আমার জানা আছে।
ডক্টর কিমকে সামান্য অপ্রতিভ দেখায় এবার।
‘স্যরি- আমি ঠিক জানি না কতটা জানানো হয়েছে আপনাকে এর মধ্যেই। আর ঠিক তখন থেকেই অদ্ভুত সব ব্যাপার ঘটতে শুরু করে।
‘বোঝা গেল, লিওনরে আসার সাথে সাথে বিগ ব্রাদারের ভিতরে কিছু গড়বড় হয়ে যায়। বলা ভাল, সেখানে কোনো ব্যাপার ঘটে। আমাদের কাছে রেকর্ড না থাকলে কেউ কস্মিন কালেও বিশ্বাস করত না ব্যাপারগুলো। আসুন, দেখানো যাক… এখানে আছে ডক্টর হেউড ফ্লয়েড, ডিসকভারিতে রাতের উপর চোখ রাখছে। আগেই পাওয়ার রিস্টোর করা হয়েছিল। অবশ্যই, সবকিছু চিনতে পারবেন আপনি।
(অবশ্যই পারছি, আর অনেক আগে মরে ভূত হয়ে যাওয়া হেউড ফ্লয়েডকে আমারই সিটে বসে থাকতে দেখতে কী অদ্ভুতই না লাগছে! হালের অপলক লাল চোখটা সর্বক্ষণ চেয়ে নেই।)।
একটা মেসেজ দেখা যায় মনিটরে। অলসভাবে প্রশ্ন তোলে ফ্লয়েড, আচ্ছা, হাল, কে কল করছে?
নো আইডেন্টিফিকেশন।
একটু যেন বিরক্ত হল ফ্লয়েড।
‘ভাল। খুব ভাল। মেসেজটা দাও দেখি।’
এখানে থাকা নিরাপদ নয়। পনের দিনের মধ্যে তোমাদের পাততাড়ি গোটাতে হবে।
‘একেবারে অসম্ভব। এখন থেকে ছাব্বিশ দিনের মধ্যে আমাদের লঞ্চ উইন্ডো খুলবেই না। আগেভাগে ডিপারচার নেয়ার মতো যথেষ্ট প্রোপ্যালান্ট নেই।
এসব ব্যাপারে আমি সচেতন। তবু। পনের দিনের মধ্যে তোমাদের চলে যেতে হবে।
‘প্রেরক সম্পর্কে জানার আগে আমি এ মেসেজের কোনো গুরুত্বই দিতে পারব না… কার সাথে কথা বলছি?
আমি ছিলাম ডেভ বোম্যান। আমার কথায় বিশ্বাস করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পিছনে তাকাও।
খুব ধীরে হেউড ফ্লয়েড তার সুইভেল চেয়ারটাকে ঘোরায়। কম্পিউটার মনিটর সুইচ অফ করে দিয়েছে আগেই। পিছনের ভেলক্রো মোড়া ক্যাটওয়াকে তার দৃষ্টি।
(এবার গুরুত্ব দিয়ে দেখুন।বলল ডক্টর কিম।
আহা, এই কথাটাও যেন আমাকে বলা দরকার, ভাবে পোল…)
যতটা মনে পড়ে পোলের, ডিসকভারির অবজার্ভেশন ডেকের শূন্য অভিকর্ষের এলাকাটায় আগে এত ধূলাবালি গিজগিজ করত না। এয়ার ফিট্রেশন প্লান্ট তখনো মনে হয় ঠিক করা হয়নি। ব্রাউনিয় গতির মোক্ষম নিদর্শন দেখানোর জন্যই যেন দূরের সূর্য থেকে আসা আলোর রেখায় বালিকণাগুলো নেচে বেড়াচ্ছে চঞ্চল হয়ে।
আর এবার, এই কণাগুলোর কী যেন হয়ে গেল। খুব অদ্ভুত একটা কিছু। কোনো শক্তি যেন আধিপত্য বিস্তার করেছে তাদের উপর। সবগুলো কণাকে জড়ো করছে একটা জায়গায়। আস্তে আস্তে ফাঁপা একটা গোলকে পরিণত হল সেগুলো। মিটারখানেক প্রস্থের বুদবুদটা কিছুক্ষণ ভেসে থাকে। আস্তে আস্তে যখন সেটার আকার পরিবর্তন হতে থাকে, বদলাতে থাকে আকৃতি, পোল স্তম্ভিত হয়ে যায়। একটু পর মানুষের আদল নেয়ায় আর খুব বেশি বিস্মিত হয় না সে।
কাঁচের বাইরে এমন সব ফিগার সে আগেও দেখেছে। নানা প্রদর্শনী আর বিজ্ঞান জাদুঘরে। কিন্তু এটা একেবারে নিখুঁত কোনো আকৃতি নিল না। অনেকটা যেন ফিনিশিং টাচ দেয়ার আগের এবড়ো থেবড়ো ভাস্কর্য। প্রস্তর যুগে এমন সব গড়ন তৈরি হত। শুধু মাথাটাকে খুব যত্নে গড়ে তোলা হয়েছে। আর সেই মুখাবয়ব, কোনো সন্দেহ নেই, কমান্ডার ডেভিড বোম্যানের।
