“আমরা দেয়াল আর মেঝেগুলোকে ঘুরিয়ে টুরিয়ে নিয়ে এমন হাল করেছি যে এখন দেখে যে কেউ থাকাটাকে বিলাস বলতে পারে। ঠিক যেন মেরুদেশে শখের অভিযানে বেরুনো পুরনোদিনের মানুষজন। আমাদের কেউ কেউ আর্নেস্ট শ্যাকলটনের নাম শুনে থাকলেও তার ধৈর্য মহাকাব্যের নাম জানে না। বরফ প্রবাহে এক বছরেরও বেশি সময় আটকে থেকে মেরুতে একটা হাড় জমানো শীত কোনোমতে বরফ-গুহায় আটকে থেকে কাটিয়ে দেয়া; তারপর খোলা নৌকায় করে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অচিহ্নিত পর্বত চিনে নিয়ে সবচে কাছের লোকালয়ে ফিরে যাওয়া!
“কিন্তু এতো মাত্র শুরু। সবচে অবিশ্বাস্য এবং উৎসাহজনক কথা হল, শ্যাকলটন সেই বিরানে ফিরে গেলেন চার-চারবার এবং স-ব লোকজনকে উদ্ধার করলেন নির্দ্বিধায়। বুঝতেই পারছেন বইটা আমাদের মনে কী প্রভাব ফেলে! আশা করি পরের ট্রান্সমিশনে ফ্যাক্স করে দিবেন; আমরা সবাই পড়ার আশায় মরে যাচ্ছি।
“তারপর তার কপালে কী হল! চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। আমরাতো এখন তাদের চেয়ে অনেক অনেক ভাল আছি। পুরনোদিনেরর অভিযাত্রীরা কী কষ্টই না করতো! গত শতাব্দী পর্যন্ত, তারা একবার পাহাড়ের আড়ালে গেলেই হল, যোগাযোগের উর্ধ্বে; কী অবিশ্বাস্য কষ্ট! আর, আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত যে সারক্ষণ হা-পিত্যেশ করে মরছি-কেন আলোর গতি আরেকটু বেশি হল না! কেন আমরা বন্ধু-বান্ধবের সাথে রিয়েল টাইমে কথা বলতে পারি না! যত্তোসব! আর তাদের মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছরও মনুষ্য-পৃথিবীর সাথে বিন্দুমাত্র যোগাযোগ থাকত না। আর আমরা পৃথিবী থেকে জবাব পেতে দু ঘণ্টা দেরি হচ্ছে বলে গলা শুকিয়ে মরে যাই। আবারও, মিস মবালা আর বিজ্ঞানীদলকে অশেষ ধন্যবাদ।
“অবশ্যই, পৃথিবীর সব অভিযাত্রী আমাদের চেয়ে একদিক দিয়ে বেশি সুবিধা পেতেন-অন্তত শ্বাস নেয়া যেত খোলা বাতাসে। বিজ্ঞানীদল একেবারে হন্যে হয়ে বাইরে যাবার উপায় খুঁজছে; আর স্পেসস্যুটগুলোও ছঘণ্টা বাইরে থাকার উপযোগী করে ফেলেছি।
আর, এই হল দুদিনের আবহাওয়া বার্তা। প্রেশার আড়াইশো বার, তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রিতে স্থায়ী, বাতাস পশ্চিম থেকে বেশ জোরেই বয়, মুক্ত-প্রান্তের রিখটার স্কেলে এক থেকে তিন মাত্রার কম্পন হয় সাধারণত…
“জানেন, আমি ঠিক মুক্ত-প্রান্তের কথাটাকে পছন্দ করি না-বিশেষত যখন আইও আবার এগিয়ে আসছে তখন…
৪৫. মিশন
ঘণ্টার পর ঘণ্টা তরুণ ফ্লয়েড আর সেকেন্ড অফিসার চ্যাঙ গুজগুজ করে ভ্যান ডার বার্গের সাথে। কী এতো কথা কে জানে! ভাবল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস; কিন্তু কী নিয়ে এতো কথা তা সে জানে।
মাউন্ট জিউসে যেতে চাও তোমরা! কীভাবে-একটা ভোলা নৌকায় করে? শ্যাকলটন বইগুলো কি তোমাদের মাথা খেয়ে বসল?
একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল ফ্লয়েড। ক্যাপ্টেনের কথাই সত্যি, আর সব দিকেরচে দক্ষিণ বেশি উৎসাহ দেয়। কিন্তু দমবার পাত্র নয় ক্রিস।
যদি কোনো নৌকা বানিয়েও বসি, স্যার, তবু অনেক সময় লেগে যাবে… বিশেষত এমন সময়ে। আর দিন দশেকের মধ্যে ইউনিভার্স চলে আসবে না?
তার উপর আমি নিশ্চিত নই,যোগ করল ভ্যান ডার বার্গ, এখনো নিশ্চিত নই যে এই গ্যালিলির সমুদ্রে নৌভ্রমণ করা কলজেয় কুলাবে কিনা, আমি ঠিক চাই কিনা তাও জানি না। সম্ভবত এর সব বাসিন্দা খবরটা পায়নি যে আমরা একেবারে অখাদ্য।
একটা মাত্র পথই খোলা, তাই না? তার মানে কথাটা শক্তিমান, এবং আমি প্রভাবিত হতে যাচ্ছি। বলে যান, বলে যান।
এ নিয়ে মি. চ্যাঙের সাথে বিস্তর কথা হল; বললেন, তিনি পারবেন কাজটা করতে। জিউস পর্বত মাত্র তিনশো কিলোমিটার দূরে। শাটলটা একটানে চলে যেতে পারবে, ঘণ্টাখানেক সময়ও লাগবে না।
তারপর একটা ল্যান্ড করার জায়গা খুঁজবেন? মনে আছে তো, মি, চ্যাঙ এ কাজে তেমন দক্ষতা দেখাতে পারেননি কদিন আগেই।
অসুবিধা নেই, স্যার। উইলিয়াম সুং আমাদের পুরো ওজনের এক শতাংশ মাত্র। এমনকি সেই বরফগুলোতেও নামা সহজ। তাছাড়া আরো ডজনখানেক ল্যান্ডিং সাইট দেখে রেখেছি।
কীভাবে? প্রশ্ন তুলল ক্যাপ্টেন।
ভিডিও দেখে।
তাছাড়া, যেন গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ে গেল ভ্যান ডার বার্গের, পাইলটের মাথায় কোনো পিস্তল ধরা থাকবে না। এই চিন্তাটাও ঠিকমতো ল্যান্ডিংয়ে সহায়তা করবে।
শিওর, কেন নয়? কিন্তু আসল সমস্যা অন্য কোথাও। শাটল বের করবেন কীভাবে গ্যারেজ থেকে? একটা ক্রেন যোগাড় করতে পারবেন? এই গ্র্যাভিটিতেও লোডটা খুব বেশি হয়ে যাবে না?
প্রয়োজনই পড়বে না, স্যার। চ্যাঙ সহজেই উড়িয়ে বের করতে পারবে।
নিরবতা প্রলম্বিত হচ্ছিল; ক্যাপ্টেন জানে, উইলিয়াম সুংকে ডিজাইন করা হয়েছিল শুধু কক্ষপথে ব্যবহারের জন্য। ছোট্ট শাটলটার জনপ্রিয় নাম বিল টি। সাধারণত এটাকে গ্যারেজ থেকে ঠেলে বের করা হয়, তারপর মাদারশিপ থেকে অনেকটা দূরে না গেলে জেট চালানোর কথা মাথায় আনাই হয় না।
“বোঝাই যাচ্ছে, আপনারা অনেক খেটেখুটে সব ঠিক করে রেখেছেন প্রস্তাব দেয়ার আগেই। ভাল লাগছে কথাটা ভেবে। কিন্তু একটু ভাবুন, টেক অফ এ্যাঙ্গেল কী হবে? বিল টি কে ওড়ানোর জন্য দাঁড় করাতে হবে, এ আবার বলে বসবেন না যেন, এজন্য গ্যালাক্সিকে গড়িয়ে নিব। গ্যারেজের একপাশ মাটির দিকে, ভাগ্য ভাল-ঐদিকটা নিচে রেখে আমরা ল্যান্ড করিনি।
