টাইকোতে, আজ থেকে ষাট বছর আগে, তুমি বৃহস্পতির দিকে চিৎকার করে তোমার স্রষ্টাদের জানিয়েছিলে, আমরা উন্নত, আমরা ফুল ফুটিয়েছি মরুর বুকে।
আর দেখ, একযুগ পরে বৃহস্পতির দিকে যখন গেলাম, সেটার কী হাল করলে এই তুমিই!
এখন, ঠিক এখন, তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে, সুপ্ত রাতে?
৬. স্বর্গ
ষষ্ঠ পর্ব – স্বর্গ
৪৩. ডোবা জাহাজের সম্পদ উদ্ধার
ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাসের গোছানোর বিষয়ের মধ্যে প্রথমেই চলে আসে ক্রুদের গুছিয়ে নেয়ার কথা। তার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল এলোপাথাড়ি পড়ছে পুরো শিপের উপর। কোথায় যেন সুর কেটে যাচ্ছে বারবার। গ্যালাক্সির সবকিছুই ভুল পথে চলছিল।
স্পেসশিপ দুভাবে চালানোর জন্য ডিজাইন করা হয়। হয় একেবারে ওজনশূন্যতায়, নয়তো ইঞ্জিন ব্রাস্টিংয়ের সময়। অক্ষের উপর-নিচে ব্যাপারটা সাজানো থাকার কথা। কিন্তু এখন শিপ পুরোপুরি উলম্ব হয়ে আছে। কাজেই ফ্লোরগুলো পরিণত হল দেয়ালে। ব্যাপারটা এমন, কোনো শুয়েপড়া বাতিঘরে যেন বসবাস করার চেষ্টা করছে কর্মচারীরা। শোয়া লাইটহাউস যেমন বেমানান, তেম্নি খাড়া গ্যালাক্সিও মানায় না। প্রতিটি আসবাব সরাতে হয়েছে, যন্ত্রপাতির অর্ধেকই কোনো কাজে আসছে না।
তারপরও, এ যেন ছদ্মবেশী আশীর্বাদ। আশীর্বাদটা যেন যোগাড় করেছে ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস নিজে। গ্যালাক্সির ভেতরটা ঠিক করতে করতেই জুরা গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছিল। কাজের চাপে জান বেরিয়ে যাবার দশা, আত্মবিশ্বাসের মতো বায়বীয় কোনো ব্যাপারে ভাবার ফুরসতই মিলছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত তরীর গা অক্ষত আছে, মিওন ড্রাইভ শক্তির যোগান দিয়ে যাচ্ছে অবিরত, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো তাৎক্ষণিক বিপদের ভয় নেই। আর মাত্র দিন বিশেক গুনে গুনে কাটিয়ে দিতে হবে, ব্যস। তারপর ভাগ্য-শশী রূপে আকাশে আবির্ভূত হবে ইউনিভার্স।
কেউ কথাটা তুলল না। যে অদৃশ্য শক্তি ইউরোপাকে রক্ষা করছে সে এখানে দ্বিতীয় কোনো অবতরণে বাধা দিতে পারে। তারা বোধহয় শেষপর্যন্ত নাক গলাবে না। একটা ক্ষমার মিশনে তাদের নাক গলিয়ে মানুষের নাকে আবারও খত দেয়ানোতে লাভটা কী…।
ইউরোপা নিজে খুব একটা সন্তুষ্ট নয় অবতরণের ঘটনায়।
সাগরের বুকে ভাসার সময় গ্যালাক্সিতে তার অসন্তুষ্টির নমুনা দেখিয়েছে ঝড় তুলে। আর এখন মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে বসার পর ভূমিকম্প সমস্যা করছে সারাক্ষণ। ফলে আত্মবিশ্বাসের উচ্চতাকে খাটো করে ফেলছে এই গাঠনিক চিরায়ত ভূকম্পন। কাপ ধরিয়ে দিচ্ছে কারো কারো অন্তরাত্মায়।
মাটির ঝাঁকাঝাঁকিটা যতনা ক্ষতিকর তারচে ঢের বেশি ভয় পাইয়ে দেয়। বিশেষ করে যারা টোকিও ৩৩ বা লসএঞ্জেলস ৪৫ আর্থ কোয়েকের শিকার তাদের কথাতো বলাই বাহুল্য।
এখন তারা জানে আইও এ উপগ্রহের ভিতরের দিকের অর্বিটে এলে কাঁপুনিটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়, তারপর আবার কমে, ঠিক ঢেউয়ের মতো-কিন্তু জানাটা ভয় কমাতে পারছে না। এই জানাটাও স্বস্তি দেয় না যে ইউরোপার নিজস্ব আকর্ষণ ক্ষেত্র আইওতেও সমান ক্ষতি করতে পারে।
ছদিনের মাথা খারাপ করা কাজের পর ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস মোটামুটি সন্তুষ্ট হল; শিপকে একটা গড়পড়তা নিরাপদ আকৃতি দেয়া গেছে। গ্যানিমিডের লোকজন যে রাডার ম্যাপ পাঠিয়েছে সে অনুযায়ী দ্বীপটা লম্বায় পনের কিলোমিটার, প্রস্থে পাঁচ; এর গাঠনিক বিবর্তন বড়জোর একশ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এরচে ভিতরে চলে গেলেই নিরাপদ। কিন্তু খুব একটা উঁচু নয় দ্বীপটা। যে কেউ হঠাৎ আসা সুনামির ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে পারে।
এ জায়গাটা একেতো নিষিদ্ধ অঞ্চলে জেগে উঠেছে, তার উপর ন্যাড়া দ্বীপের অর্ধেকই আগ্নেয় শিলায় গঠিত। লাভার স্রোত এখনো পথ এঁকে রেখেছে পাথরের বুকে। এক কথায় নামকরণের কথা কারো মাথায় আসেনি অর্ধশত বছরেও; কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। এখন এটাই তাদের বাড়ি; আর বাড়িটা যেমনই হোক কেন-সুন্দর একটা নাম চাই-ই চাই।
মনমরা নামগুলো সরাসরি ভেটো দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে ক্যাপ্টেন- পাতালপুরী, নরক, কবর টাইপের নাম চলবে না। উৎসাহব্যঞ্জক কিছু চাই।
কিন্তু আর সহ্য হচ্ছে না ক্রুদের। বত্রিশটা নাম ফিরিয়ে দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাসও।
ক্যাপ্টেন, আপনি নিশ্চই আশা করেন না স্বর্গের বুকে কোনো গোলাপ-বাগানে হাঁটাহাঁটি করছেন? নামটা নিশ্চই গোলাপ-বাগান রাখবেন না? কেউ একজন খোঁচা দিল, না পেরে।
গোলাপ বাগান বানানো যায় কিনা তা পরের কথা, তারচে বড় কথা, রোজ শব্দটার কথা মনে পড়ে যায় এমন কোনো নাম রাখা সম্ভবই না! বরং “স্বর্গ টাই ভাল। গোলাপ নাহয় পরেই ফুটল।
৪৪. ধৈর্য
ইতিহাস কখনো নিজের পুনরাবৃত্তি করে না-কিন্তু ঐতিহাসিক অবস্থা বারবার o ফিরে আসতে পারে।
গ্যানিমিডে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় কথাটা নিয়ে ভাবছে ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস। ইউনিভার্স থেকে কোট করে বলেছিল ম্যাগি মবালা। এখন প্রতি সেকেন্ডে হাজার কিলোমিটারের চেয়েও বেশি গতিতে তাদের কাছে আসছে ইউনিভার্স, তাদের জন্যই।
“মিস ম্যাগিকে বলবেন, তার ছোট্ট ইতিহাস-শিক্ষাটা মনোবলের জন্য দারুণ ওষুধের কাজ দিয়েছে। এরচে সুন্দর কোনো কথা তিনি আমাদের জন্য পাঠাতে পারতেন না…
