ফ্লয়েড জবাব দেয়ার আগেই শুনে নাও, পুরোটা শুনে নাও ধ্বনি উঠল আশপাশ থেকে।
আমিও একই পথ ধরে হাঁটছি। আমি এরই মধ্যে গ্যালাক্সিকে বলেছি-যেকোনো, যেকোন-অস্বাভাবিক ব্যাপারের দিকে নজর রাখ। যদি সে যোগাযোগের চেষ্টা করে।
অবশ্যই, বলল ইভা, সে এরিমধ্যে মরে গেছে যদি ভুতেরা আদৌ মরে।
এমনকি মাইকেলোভিচও এ কথার যুতসই জবাব পেল না। কিন্তু যথারীতি আর সবার চেয়ে আগে পাগলাটে কথাটা বলে বসেছে অভিযাত্রী।
কিন্তু তার যেন আজ জোয়ার এসেছে।
উডি, ডিয়ার, সে বলল স্বাভাবিক কণ্ঠে, তুমি কেন তাকে রেডিওতে একটা কল করছ না? এ কাজের জন্যই রেডিওটা বানানো হয়েছে, তাই নয় কি?
আইডিয়াটা ফ্লয়েডের কাছে ভাল লাগল। রেডিও দিয়ে সৌরজগৎ এফোড় ওফোড় করে ফেলা সম্ভব। তাতে, সত্যি যদি সাবেক কমান্ডার, বৃহস্পতি জগতে পা রাখা প্রথম জীবিত মানব ডেভিড বোম্যানের অস্তিত্ব এ জগতের কোথাও থাকে, সে বুঝতে পারবে, ঠিকই বুঝবে। কিন্তু ইভার খোঁচাটাকে তেমন গুরুত্ব দিল না সে।
ডাকব। আশা করি তাতে কোনো বিশেষ ক্ষতি হয়ে যাবে না।
৪২. ঘুমঘোরে এলে মনোহর
এবার ফ্লয়েড একেবারে নিশ্চিত; সে স্বপ্ন দেখছিল…
সে এই জীবনে কখনো ভালভাবে ঘুমাতে পারেনি জিরো গ্র্যাভিটির শিকার থাকা অবস্থায়। এখন, ইউনিভার্স সর্বোচ্চ গতিতে চলছে, কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ। তাই মাধ্যাকর্ষণও অনুপস্থিত। এই গতির কারণে অনেক সময় লাগবে থেমে যেতে। সপ্তাহখানেক সময় নিয়ে থামবে স্পেসশিপটা, তারপর মিলিত হবে ইউরোপার সাথে ।
জীবনভর সে বাঁধার বেল্ট এটে নিয়েছে শরীরের সাথে, এবং জীবনভর সেগুলো হয় অতি শক্ত নয় অতি নরম হয়ে এটে গেছে-কখনো ঠিকঠাক থাকেনি। হয় শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মরার যোগাড় হয় নয়তো জেগে দেখে নিজের শরীর ভাসছে বাঙ্ক জুড়ে।
একবার দেখে ভাসছে কোথায় যেন, দেখেও বোঝা যায়নি। পরে দেখা গেল ভেন্টিলেটরের কাছাকাছি। কারণ সেখানে একটু হলেও বল কাজ করে। জেগে প্রতিবারই নিখাদ আতঙ্ক ছাড়া আর কোনো অনুভূতি হয়নি সেসব বিরক্তিকর সময়ে। একজন সত্যিকার অনিয়মিত মহাকাশযাত্রী হিসেবে সব সময় তার এসব ভেজাল পোয়াতে হয়।
কিন্তু আজ রাতে তার সবই ঠিকঠাক ছিল-অম্ভত দেখেশুনে তেমনি মনে হয়। বরং ওজন ফিরে এলে সে ওজনে অভ্যস্ত হতে সময় নেবে। ডিনারের আলাপ আলোচনার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেল কখন, সে বলতেও পারবে না।
স্বপ্নে সে টেবিলের কথা চালিয়ে গেল। যথারীতি অবাক করা কিছু উপাদান ছিল স্বপ্নটায়, উইলিস নিজের দাড়ি ফিরে পেয়েছে টাইপের, তাও আবার মুখের একপাশে। স্বপ্নে মানুষের যে ক্ষমতাটা কেড়ে নেয়া হয়, তার নাম অবাক হওয়া। সে মোটেও অবাক হয়নি কারবার দেখে। যেন উইলিস নিত্যদিন আধমুখ দাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ফ্লয়েডের মনে হল কোনো এক রিসার্চের কাজে তাকে এমন মুখ করতে হয়েছে-কিন্তু কেন আল্লা মালুম। সম্ভবত হেলমেটের ব্যবহার মনে পড়ে গেছে, অবচেতন মন সেটাকেই অর্ধেক করে দেখাচ্ছে।
কিন্তু তার সেই পুরনো ব্যথাগুলো ফিরে এসেছে। সে স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মিলসনের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে জারজার হচ্ছে। কীভাবে যেন লোকটা এখানে এসে এই ছোট্ট পার্টিকে কলঙ্কিত করল। মিলসন চল্লিশ বছরেরও আগে মারা গেছে, তথ্যটার যেন কোনো গুরুত্বই নেই।
হেউড, তার পুরনো শত্রু খুশিমনে বলছে, হোয়াইট হাউস তোমার উপর মোটেও খুশি নয়। মহা নারাজ।
আমি ভেবে পাই না কেন তারা আমার উপর নারাজ হতে যাবে।
যে রেডিও মেসেজটা তুমি এইমাত্র ইউরোপার দিকে পাঠালে সেটার কারণে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়েছ?
প্রয়োজন বোধ করিনি। সহজে আমি মাটি থেকে আদেশ কুড়াই না।
ও! কিন্তু সেটাই তোমাকে এখন কুড়াতে হচ্ছে। কাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলে তাহলে? আমরা কি একটুও বুঝতে পারছি না যে সরকার প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন বর্তমানে? কী জানি, এতো সবকিছু অগোছালো থাকলে…
মিলসন ভদ্র ভাষায় গালাগালি করতে করতে হারিয়ে গেল… আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া, স্বপ্ন দেখছি। এখন কী দেখব আবার?
ভাল। হয়ত আমি এটাই আশা করছিলাম। হ্যালো, ওল্ড ফ্রেন্ড! তুমি সব আকৃতি নিয়েই এসেছ, আসনি কি? আমি নিশ্চিত, টি এম এ-১ ও আমার কেবিনে গা গলাতে পারবে না। আর তার বড় ভাইতো উল্টো পুরো ইউনিভার্সকেই এক লহমায় গিলে নিতে পারবে, আমার কেবিনে আসবে কী?
তার বাঙ্ক থেকে মাত্র দু মিটার দূরে কালো মনোলিথটা দাঁড়িয়ে আছে, অথবা আছে ভেসে। হঠাৎ, আহত হয়ে ফ্লয়েড দেখল, শুধু আকৃতিতে নয়-আকারেও জিনিসটা অতি সাধারণ কবরফলকের মতো। এ মিলের কথা তার কাছে অনেকেই বলেছিল এককালে; কিন্তু চোখের সামনে দেখে ব্যাপারটাকে অন্যরকম লাগছে-বাস্তব বাস্তব। এই প্রথমবারের মতো সে দেখল, মিলটা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং ভয় ধরানো।
আমি জানি, এ এক ড্রিম, কিন্তু এ বয়সে আর নতুন করে সাবধানবাণী শুনতে চাই না…
যাই হোক, কী চাই তোমার এখানে? তুমি কি ডেভ বোম্যানের কাছ থেকে কোনো খবর নিয়ে এসেছ? তুমিই কি ডেভ বোম্যান?
যাক, আমি কিন্তু আসলে কোনো জবাব চাই না। অতীতে তুমি খুব একটা বাঁচাল ছিলে না-নাকি মিথ্যা বললাম?
কিন্তু তোমার দেখা পেলেই সব ভজঘট হয়ে যেত।
