“হ্যাঁ, আমরা হ্যাঁড্রিয়ন আর আলেকজান্ডারের কথা জানি ঠিকই; কিন্তু অবশ্যই রিচার্ড দ্য লায়ন হার্ট আর সালাদিনের গল্পটা ভুলে যাবার চেষ্টা করি এবং হারিয়ে ফেলি। ভুলে যাই জুলিয়াস সিজারের কথা-অবশ্য অ্যান্টনি আর ক্লিও সে কথা ভুলতে দেয় না। অথবা ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেটের কাহিনীগুলো…
যখন জেরিকে বললাম যে অন্তত নেপোলিয়ন একজন ব্যতিক্রমী মানুষ তখন তার বলা সেই উক্তির কথাও মনে করিয়ে দিই। আমি বাজি ধরতে রাজি যে যোসেফাইন আসলে একটা ছেলে ছিল। ব্যাপারটা ইভার উপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করো।
“তুমি আমাদের মনোবল গুঁড়িয়ে দিলে! হতভাগা। আমাদের অবহেলা করে খুশি রাখাই উচিত ছিল তোমার…
এবং, এতোকিছু সত্ত্বেও আমি সেবাস্টিয়ানের মতো ভালবাসা পাঠালাম। যে কোনো ইউরোপানের সাথে দেখা হলেই শুভেচ্ছা জানিও। গ্যালাক্সির পাঠানো রিপোর্ট দেখে মনে হল তারা মিসেস উলকিন্সের সাথে বেশ খাপ খাবে।
৪১. অশীতিপরের জীবনকথা
এম্নিতে ড. ফ্লয়েড বৃহস্পতির প্রথম মিশনটার কথা বলতে চায় না সব সময়। এবং দশ বছর পরে, লুসিফার অভিযানের কথাও তার পেট থেকে বেরোয় না।
কারণও আছে, কংগ্রেশনাল কমিটি, স্পেস কাউন্সিল বোর্ডগুলো আর ভিক্টর উইলিসের মতো মিডিয়ার লোকের কাছে সে প্রতিটি পল অনুপলের কথা নানা সুরে নানা সময়ে কমপক্ষে একশোবার করে বলেছে।
তারপরও তার সাথীদের প্রতি একটু দায়িত্ব আছে তার, সেটা এড়ানো কঠিন। নতুন এক নক্ষত্র আর সৌর জগতের সৃষ্টিকালে নিজের চোখে যে কজন ব্যাপারটা দেখেছে তাদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ব্যক্তিটিকে তারা সে সময়ের কথা শোনার জন্য চাপাচাপি করতেই পারে; বিশেষত যখন তারা সেই লক্ষ্যটার দিকে অনির্বচনীয় গতিতে এগুচ্ছে।
এই গ্যালিলীয় জগতের গ্রহ-উপগ্রহের নাড়ী-নক্ষত্রের খবর সে সেখানে কাজ করা ইঞ্জিনিয়ার আর বিজ্ঞানীদের চেয়ে অনেক কমই বলতে পারবে। যখন প্রশ্ন উঠল, ইউরোপায় থাকাটা আসলে ঠিক কেমন? (অথবা গ্যানিমিডে, বা আইওতে, কিংবা ক্যালিস্টোতে…)
সে নাঙা গলায় প্রশ্নকর্তাকে শিপের লাইব্রেরির রিপোের্ট ঘাটতে বলে সাথে সাথে । কিন্তু এখনো একটা ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা আর সবার চেয়ে এগিয়ে। আজ অর্ধশত বছর পরে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সেই অনির্বচনীয় অপার্থিব অভিজ্ঞতাটাকে। ডিসকভারিতে ডেভিড বোম্যান আসার সময় সে কি আসলেই জেগে ছিল, দেখেছে সেসব ঘটনা? ব্যাপারটা ভেবে নেয়া খুবই সহজ যে দশ বছরের পরিত্যক্ত ধুলোমলিন স্পেসশিপ ভুতুড়ে হয়ে যেতে পারে….
কিন্তু, সে তখন ঘুমায়নি-মানে ঘুমাতে পারে না। স্পষ্ট, সে দেখল সেই মানুষটার মুখ-যে এই বিরান আকাশে হারিয়ে গেছে একযুগ আগেই, দেখল কামরার সবটুকু ধুলাকে একত্রিত হতে, দেখল ভেসে থাকা ধূলিকণা মিলেমিশে কী করে ত্রিমাত্রিক একটা মুখ-অবয়ব গড়ে তোলে।
অস্বীকার কী করে করে সে? সেই মুখের সাবধানবাণীতেই পুরো লিওনভ আর তার সমস্ত ক্রু বৃহস্পতি-বিস্ফোরণের হাত থেকে বেঁচে যায়। এখনো কী স্পষ্টভাবে তার মনে পড়ে, ঠোঁটগুলো একেবারে অনড় ছিল, আর শব্দ এসেছিল স্পিকার কনসোল থেকে!
এক ডিনার টেবিলে বসে অবশেষে একদিন মুখ খুলল অশীতিপর ডক্টর হেউড ফ্লয়েড, খুলে গেল আধ-শতাব্দীর বন্ধ দুয়ার।
“কেন সে করল কাজটা, কেন? আজ পঞ্চাশ বছর, আমি প্রশ্নটা বুকে নিয়ে মরছি। সে ডিসকভারির স্পেসপোড নিয়ে মনোলিথটা দেখতে বেরুনোর পর যা-ই হয়ে গিয়ে থাকনা কেন, মানুষের সাথে কোথায় যেন তার একটা সম্বন্ধ থেকে গেছে। তখনো একেবারে ভিন্ন সত্তা হয়ে যায়নি। তার সেই পৃথিবী ভ্রমণ থেকেই কথাটার প্রমাণ মেলে। ভ্রমণটা ছোট ছিল, কিন্তু প্রমাণ ছিল অনেক। তার মধ্যে আণবিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটা সবচে শক্ত। সে তার মা আর পুরনো গার্লফ্রেন্ডের বাসায় যায়, এমন প্রমাণও নিশ্চিত। যা-ই হয়ে থাক না কেন সে, তার আবেগ উবে যায়নি।
কী মনে হয়, সে এখন কী হয়ে গেছে? প্রশ্ন তুলল উইলিস, বহু পুরনো প্রশ্ন, আর, কোথায় আছে এখন?
হয়তো শেষ প্রশ্নটার কোনো অর্থ নেই-এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। তোমার সচেতনতা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে তা কি তুমি জান?
আমি অধিভৌতিকতা নিয়ে কোনো দর্শন কপচাচ্ছি না। সচেতনতা? আমার ব্রেনের কোনো না কোনো স্থানে, হয়ত।
আমি যখন তারুণ্যে টগবগ করছি, যেন লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল বাদ্যযন্ত্রবিদ মাইকেলোভিচের চেহারা, যে সব সিরিয়াস আলোচনায় আসল কথাটা বলে বসে, তখন আমারটা মাথা থেকে মিটারখানেক নিচে ছিল…।
আচ্ছা, ধরে নিই সে এখন ইউরোপায়। আমরা জানি ঐ মরার জায়গাটাতেও একটা মনোলিথ ঘাপটি মেরে বসে আছে। ধরা যাক সে কোনো না কোনো মহাসাগরের প্রতিনিধিত্ব করছে, ওয়ার্নিংটা কীভাবে প্রচার করল তা নিয়ে একটু কথা বলা যাক।
তোমার কি মনে হয় সে দ্বিতীয় সাবধান বাণীটাও উচ্চারণ করেছে, আমাদের দূরে থাকতে বলে?
যে সাবধানবাণীটা আমরা থোড়াই পরোয়া করতে যাচ্ছি।
-বেশ ভাল একটা কারণ থাকাতে
ক্যাপ্টেন স্মিথ সাধারণত আলোচনাটাকে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। কখনো যা করে না সেটাই করল এবার, কথা বলে উঠল মাঝ থেকে।
“ড. ফ্লয়েড, আপনি এক অসাধারণ পর্যায়ের মানুষ, আর সেই সুযোগটা নেয়া উচিত আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে। একবার বোম্যান আপনাকে সাহায্য করতে এসেছিল। আশপাশে থেকে থাকলে আবারও সে একই কাজ করবে বলে আমার ধারণা। আমি সেই–এখানে নামার কোনো চেষ্টাই করো না–আদেশ নিয়ে চিন্তিত। সে যদি একবার জানায়, আদেশটা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে, তাহলে নিশ্চিন্ত হই।
