অন্তর্চক্ষুতে দেখে ঝুলে পড়ল চোয়াল, আচ্ছন্ন হয়ে গেল দৃষ্টি।
ক্যামেরার পেছনে, এতোক্ষণে, স্বনামখ্যাত উপস্থাপক, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাক বিদগ্ধদের একজন, ভিক্টর উইলিস, তার সাক্ষাৎকার নেবার আসল মজার একটু একটু পেতে শুরু করেছে।
ঠিক তাই, ক্যাপ্টেন স্মিথ, ঠিক তাই। ও! একটা ব্যাপার, মানুষ এখনো তার স্বাভাবিক দৈহিক ঝামেলা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এবং মহাকাশের ওজনহীন পরিবেশে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়াটাকে তারা…
৩৯. কাপ্তানের টেবিল
আফসোস! পৃথিবীর (পৃথিবীর বাইরের) দর্শকরা ইউনিভার্সের অধিকতর তা অনানুষ্ঠানিক এবং খোলামেলা আলোচনায় ঠিক জুত পায়নি। শিপের জীবন এখন অনেকটা সহজ ও স্বাভাবিক। অনেক পদক্ষেপের কারণে এই বন্ধুসুলভ আবহাওয়ার জন্ম। তার মধ্যে সবচে কার্যকর এবং দীর্ঘজীবী পদক্ষেপ ছিল ঐতিহ্যবাহী কাপ্তানের টেবিল।
ঠিক আঠারোটায় ছ যাত্রী এবং ডিউটিতে না থাকা পাঁচ অফিসার ক্যাপ্টেন স্মিথের সাথে খেতে বসে। এখানে উত্তর অতলান্তিকের বুকে ভেসে চলা প্রাসাদগুলোর মতো জাক-জমক আর পোশাকী রীতি না থাকলেও অনেক বেশি আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। ইভা ডিনারটাকে আরো সুন্দর করে তোলে নিত্য নতুন ব্রেসলেট, আঙটি, নেকলেস, চুলের ফিতা বা সুগন্ধির সৌকর্যে। (এসবের সরবরাহ কোত্থেকে আসে এই একলা মহাকাশে আল্লা মালুম, প্রায়ই ভাবে যাত্রীরা বিশেষত মুগ্ধ ফ্লয়েড)
ড্রাইভ চালু থাকলে সাধারণত খাবারটা স্যুপ দিয়েই শুরু করে তারা। নাহলে, ওজনহীন অবস্থায় অন্য ব্যবস্থা আসে। সেই সাথে ক্যাপ্টেন সর্বশেষ খবর জানায়; অথবা পৃথিবী-গ্যানিমিড থেকে প্রচারিত সর্বশেষ গুজবের ঘোমটা নিয়ে টানাটানি করে।
দুনিয়া ডুবে আছে গুজবে। আর সবচে মজার মজার তত্ত্ব বেরুচ্ছে গ্যালাক্সির হাইজ্যাকিং নিয়ে। প্রতিটি গোপন সংস্থার উপরই সবাই খড়গহস্ত। আরও নানা সম্ভাবনা নিয়ে হা-পিত্যেশ করে মরছে সবাই। তবে, সব গুজবেরই দুটো ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায়, সেগুলো গুজব, এবং সেগুলোর কোনোটারই নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
একটা সত্যি বেরিয়েছে, এবং গুজববিদরা সেটা হাতড়ে আরো জল ঘোলা করার ধান্ধায় আছে দিনমান। অ্যাস্ট্রোপোলের গোয়েন্দারা রোজি ম্যাককোলেন এর আসল নামটা বের করেছে টেনে। রুথ ম্যাসন। সে উত্তর লন্ডনে জন্মানো বিচ্ছ মেয়ে। মেট্রোপলিটন পুলিশে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যখন উঁকি দিচ্ছিল তখনই নীতিহীন কাজের জন্য তাকে বাদ দেয়া হয়। আফ্রিকায় ইমিগ্রেশন নিয়েই সে হাওয়া হয়ে যায়। নিশ্চই বেচারী সেই হতভাগা মহাদেশটার অন্ধকার রাজনীতিতে তলিয়ে গিয়েছিল। একইভাবে শাকার কথা উঠেছিল-এবং, একইভাবে, ইউ এস এস এ সেকথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে অস্বীকার করেছে।
ইউরোপা নিয়ে কী করা যায় সে চেঁচামেচি টেবিলজুড়ে সমাপ্তিহীনভাবে ও ফলহীনভাবে চলছিল সর্বক্ষণ। বিশেষত তর্কাতর্কি শুরুর লেখিকার এক কথা থেকে। ম্যাগি মবালা যখন স্বীকার করল যে সে শাকা নিয়ে একটা উপন্যাসের কথা ভাবছিল তার সহস্ৰ-পত্নীর কারো না কারো দৃষ্টিকোণ থেকে, তখনই পরিবেশ বদলে গেল। কিন্তু প্রজেক্টটা নিয়ে সে যতই এগিয়েছে, ততই দেখা গেল জল ঘোলা।
আমার শাকার ধারণা বাদ দেয়া ছাড়া কোনো গতি ছিল না। আজকের আধুনিক কোনো জার্মান হিটলার সম্পর্কে কী ভাবে তাতো আমরা সবাই জানি।
এভাবেই, মিশন এগিয়ে যাবার সাথে সাথে ব্যক্তিগত দিকগুলো এগিয়ে আসছিল ইউনিভার্সের বুকে। জমে উঠছিল আসর। এমনকি খানাপিনা শেষ হবার পরও একটা গ্রুপকে আধঘণ্টার জন্য সময় বরাদ্দ করতে হত। এই এটুকু আতেই অন্তত এক ডজন বিদগ্ধ জীবনের অভিজ্ঞতা আর একই পরিমাণ স্বর্গীয় মানুষ উপস্থিত থাকাতো কম কথা নয়!
সুতরাং, খাবার পরে আলোচনা-গালগল্প চালানোর এমন সুন্দর উৎস আর কোথায়?
মজার ব্যাপার, সবচে কম প্রভাবশালী বক্তার নাম ভিক্টর উইলিস। সে কথাটা মানতে মোটেও লজ্জা পায় না, আর তার কারণও বলে সহজেই।
আমি লাখো লোকের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে করতে এমন প্রাণবন্ত ছোট্ট আসরে বন্ধুদের মধ্যে নিজের জায়গা দখল করার ক্ষমতা হারিয়ে বসেছি।
আসরটা যদি… অবন্ধুসুলভ হয়, তাহলে কি তুমি একটু ভালভাবে কথা বলতে পারতে? মাইকেলোভিচের গলা সব সময় বন্ধুর সাহায্যে উদারহস্ত, চাইলেই তেমন করে ভোলা যায়।
ইভার এখানে তেমন কার্যকর হওয়ার কথা নয়; কিন্তু সেও বেশ চটপটে। অবশ্য তার সমস্ত স্মৃতি শুধু বিনোদন কেন্দ্রীক। সে এমিতে বিখ্যাত-অখ্যাত পরিচালকদের কথা ঘটাতেই বেশি পছন্দ করে। বিশেষ করে ডেভিড গ্রিফিন।
কথাটা কি সত্যি, প্রশ্ন করল ম্যাগি, নিশ্চই শাকার কথা ভাবছিল, যে লোকটা নারী বিদ্বেষী ছিল?।
অবশ্যই না। সে শুধু অভিনেতাদের ঘেন্না করত। তার মতে ঐ শ্ৰেণীটা মানুষের মধ্যেই পড়ে না।
মাইকেলোভিচের কথকতাও একটা ছোট গন্ডিতে বাঁধা। মহান অর্কেস্ট্রাবাদক, ব্যালে নর্তকী, সুখ্যাত কম্পোজার আর তাদের কাজের প্রতি অমর ক্ষুধাই তার কথার ক্ষেত্র। কিন্তু মিউজিকের সাথে নিজস্ব হাস্যরস আর কথার জাদুকে এমনভাবে মেশাতে জানে সে, যার ফলে সব সময় বাড়তি সময় দিতেই হয়।
আর কর্নেল গ্রীনবার্গ সারাক্ষণ মহাকাশ চষে বেড়াচ্ছে টেবিলে বসে থেকেই। বুধের তপ্ত দক্ষিণ মেরুতে ল্যান্ড করার ঘটনা এতোবার এ টেবিলের সবাই সংবাদ মাধ্যমগুলোতে শুনেছে যে নতুন করে এ নিয়ে কিছু শোনার নেই।
