এক মুহূর্তের জন্য ইভা থামল, তারপর তার গাল বেয়ে গড়িয়ে গেল আরো এক বিন্দু অশ্রু।
ফ্লয়েড না ভেবে পারল না, এই অশ্রু গড়ানোও নাটকীয়।
আর দেখ, আরো অদ্ভুত ব্যাপার, সে জীবনের শেষ ছায়াছবিটাও করেছিল আজ থেকে শত বছর আগে, জান, কী নাম ছিল মুভিটার?
বলে যাও, আরো একটা চমক পাওনা হয়েছে আমার।
আশা করি নামটা ম্যাগিকে চমকে দেবে, যদি হুমকি অনুযায়ী বইটা লিখেই ফেলে-তার শেষ চলচ্চিত্রের নাম ছিল-শিপ অব ফুলস।
৩৮.মহাকাশের হিমবাহ
হাতে অযাচিত সময়। কী করা যায়? অবশেষে ভিক্টর উইলিসকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করতে চাচ্ছে ক্যাপ্টেন স্মিথ। সে এখন ইন্টারভিউ দিতে পারবে। কিন্তু ভিক্টর বেশ ফুলে আছে, অবশ্যই, মাইকেলোভিচের করা সর্বশেষ অপমানটার কারণে। পাবলিক ইমেজ ফিরে পেতে (কিংবা চোয়ালে গজাতে) তার বেশ কমাস লেগে যাবে-কী আর করা, ইন্টারভিউটা ক্যামেরার বাইরেই নেয়া হোক। পৃথিবীর স্টুডিও তাকে নতুন শট নিয়ে মানিয়ে নিতে পারবে।
শিপের একমাত্র আংশিক সজ্জিত কক্ষে তারা বসে আছে। ক্যাপ্টেনের কেবিন ছাড়া আর কোথাও ফার্নিচার নেই। আর তাদের সামনে সৃষ্টি জগতের (এ নিয়ে এখন সবার সন্দেহ ওঠে) সবচে ভাল ওয়াইন পরিবেশিত। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউনিভার্স মূল ড্রাইভ বন্ধ করে ভেসে চলা শুরু করবে, তাই আগামী দিন কয়েকের মধ্যে ক্যাপ্টেনকে বাগে পাওয়ার এই এক সুযোগ। এদিকে ওজনহীন মদ্যপানে কোনো রাজকীয় তৃপ্তি নেই, তাই ভিক্টর স্কুইজ বাল্ব দিয়ে তার আনা ভিনটেজ খেতে অস্বীকার করেছে।
“ভিক্টর উইলিস বলছি, মহাকাশ অগ্নিরথ ইউনিভার্সের বুকে শুক্রবার আঠারোটা ত্রিশ মিনিটে, দু হাজার একষট্টি সালের জুলাই মাসের পনের তারিখে। আমরা যদিও লক্ষ্যস্থলের কাছাকাছি যাইনি, তবু মঙ্গলের অর্বিটে আমাদের সর্বোচ্চ গতি উঠে যাবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। গতিটা কতো, ক্যাপ্টেন?
প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার পঞ্চাশ কিলোমিটার।
একপল যেতে না যেতেই সহস্র কিলোমিটার পেরিয়ে যাব আমরা! অর্থাৎ ঘণ্টায় চল্লিশ লক্ষ কিলোমিটার!
ভিক্টর উইলিসের কথা শুনে মনে হবে সে এসব কিছুই জানতো না, অথচ অর্বিটাল মেকানিক্স সম্পর্কে ক্যাপ্টেনের চেয়ে তার জ্ঞান কিছু কম নেই।
এখানেই ভিক্টরের সার্থকতা, সে শুধু দর্শকদের মন পড়তেই জানে না, বরং তাদের প্রত্যাশিত ব্যাপার প্রত্যাশিত সুরে শুনিয়ে প্রত্যাশা আর উৎসাহকে জাগিয়ে তোলে।
কথাটা সত্যি। গর্বে ফুলে উঠেছে ক্যাপ্টেনের বুক, সৃষ্টির আদি থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ সর্বোচ্চ যত গতি পেয়েছে তারও দ্বিগুণ আমাদের প্রাপ্তি।
এই কথাটা আমার লাইনে চলে আসছে-ভাবল ভিক্টর। সে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়াটাকে মোটেও ভাল চোখে দেখে না। কিন্তু ভাল পেশাদার আর কাকে বলে! দ্রুত কাটিয়ে উঠল সে।
নিজের কথাটাকে আরো একটু এগিয়ে রাখার জন্য সামনে জ্বলতে থাকা স্ক্রিনের তথ্য আউড়ে গেল নির্দ্বিধায়।
আমরা প্রতি বারো সেকেন্ডে পৃথিবীর পরিধির সমান দূরত্ব পেরুচ্ছি। আরো দশ-দশটা দিন লেগে যাবে বৃহস্পতি-আহ, লুসিফারে পৌঁছতে! এ থেকেই সৌর জগতের পরিমাপ পদ্ধতির ধারণা পাওয়া যায়…
এখন, ক্যাপ্টেন, ব্যাপারটা চমৎকার। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আমার মনে এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন ঘুরছে।
ওহ-না, বিব্রতকর প্রশ্ন ছাড়া আর কিছু পাওনা তোমরা? আবার জিরো গ্র্যাভিটি টয়লেট নিয়ে নাড়াচাড়া করোনা দাড়িওয়ালা বুড়ো ভাম! গর্জে উঠল স্মিথ, মনে মনে।
ঠিক এ মুহূর্তে আমরা গ্রহাণুপুঞ্জের বলয় পেরিয়ে যাচ্ছি।
(খোদা না খাস্তা, আর আমি কিনা ভেবেছিলাম টয়লেট, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল স্মিথ।)
–এবং এখনো কোনো স্পেসশিপ তেমন আঘাত পায়নি এখানে। তার পরও, আমরা কি খুব বড় কোনো রিস্ক নিচ্ছি না? হাজার হলেও, সেখানে আক্ষরিক অর্থেই বিচবলের আকারের লাখ লাখ কঠিন আকৃতি ভেসে বেড়ায়। তার মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার চার্টে জায়গা পেয়েছে।
কয়েক নয়, একটু বেশিই হবে। দশ হাজারেরও অনেক বেশি।
কিন্তু আমাদের অজানা লাখ লাখ দেহ এখনো সনাক্ত হয়নি।
কথা সত্যি। কিন্তু আমরা চিনে রাখলেও খুব বেশি কাজে আসত না।
আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
এ নিয়ে আমাদের কিছুই করার নেই।
কেন?
ক্যাপ্টেন স্মিথ বুঝতে পারছে, তার হাজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা জাল ঠিকই পাতা হয়ে গেল তার চারপাশে এবং সেটা গুটিয়ে আনছে বুড়ো ভামটা। শালার! এই ইন্টারভিউওয়ালারা মাছধরা জেলে হলেও জীবনে উন্নতি করতে পারত।
উইলিসের কথা সত্যি। হেড অফিস খুব সুন্দর করে গোছানো কোনো জবাব বানাতে পারত, কিন্তু এখন বেস কিছু মুখ গলে না বেরুলেই হল। কাস্টমার ক্ষ্যাপানো কোনো কাজের কথা নয়।
স্পেসের হৃদয় এত বড় যে, এমনকি এই এখানেও, অ্যাস্টেরয়েড বেল্টের ঠিক মাঝখানে সংঘর্ষের সম্ভাবনা আক্ষরিক অর্থে নগণ্য, যার অর্থ গুনে বের করা সহজ নয়। আমরা আপনাকে একটা অ্যাস্টেরয়েড দেখানোর আশা করতে পারি। সবচে বেশি সম্ভাবনা আছে হনুমানকে দেখার। সে মাত্র তিনশো মিটার লম্বা। কিন্তু এর । পেছনেই যেটা আছে সেটা আড়াই লাখ কিলোমিটার দূরে।
ক্যাপ্টেন স্মিথের ইন্টারভিউ ক্যামেরার সামনে ভিক্টর উইলিসের সাথে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে যাওয়া উচিত হয়নি। উইলিস দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলছে, ব্যাটা, কথা ঘোরাও, না? দেখাচ্ছি তোমাকে হনুমানের আসল রূপ।
