হয়তো আপনার সাথে আগেই কথা বলে নেয়া উচিত ছিল, স্যার। কিন্তু দেখেছি সারাক্ষণ কেমন ব্যস্ত ছিলেন। আমি শিওর, ড. ভ্যান ডার বার্গ কোনো না কোনোভাবে জড়িত। কীভাবে, বলতে পারব না। তিনিও একজন… কথাটা আসলে অন্যরকম শোনায়, কিন্তু বলতেই হচ্ছে, কালো। এবং তারা দুজনই এমন ছিলেন শিপে। সত্যি, তাদের ঠিক বুঝতে পারিনি।
অথবা পছন্দ করতে, সে বলতে পারতো।
ভ্যান ডার বার্গ… হুম। অন্য বিজ্ঞানীদের বেলায়?
তাদেরকেও চেক করেছি, অবশ্যই। কোনো গড়মিল পাইনি।
সব কথা সত্যি নয়। ড. সিম্পসনের স্ত্রীর সংখ্যা বেশি, অন্তত বে-আইনি ধারার একজনতো আছেই। আর ড. হাগিন্স বিস্তৃত বইয়ের এক ভাণ্ডার নিজের সম্প্রহে রাখে। ফ্লয়েড জানে না ঠিক কেন তাকে এত কথা বলা হয়েছিল তখন, সম্ভবত তার নিয়োগকর্তারা তাদের ক্ষমতা এবং দক্ষতার দু একটা নমুনা দেখাতে চাচ্ছিল। আর সে মনে করেছিল অ্যাস্ট্রোপোল বা এমন যে কোনো বড় সংস্থার হয়ে কাজ করাটা বেশ সৌভাগ্যের কথা, ভবিষ্যতের জন্যও।
ভাল, চমৎকার। অ্যামেচার গুপ্তচরকে সমাপ্তির দিকে টেনে আনল ক্যাপ্টেন, যখনই শিপের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কিছু টের পাবেন-যখনই-আমাকে জানাবেন দয়া করে।
এই পরিস্থিতিতে শিপের জন্য ক্ষতিকর আর কী থাকতে পারে? এরচে বেশি ক্ষতিকর কিছু আর আশা করা যায় কি?
৩৬. অচেনা বেলাভূমি
সামনের দ্বীপটা চোখে পড়েছে চব্বিশ ঘন্টা হল। কেউ জানে না সেখানেই যাওয়া যাবে, নাকি কেন্দ্রের নরকে গিয়ে হাজির হবে শিপ! দ্বীপটার অবস্থান গ্যানিমিড থেকে নিশ্চিত করে পাঠিয়ে পথও বাৎলে দেয়া হয়েছে, তারপরও প্রতিদিন প্রত্যেকে পালা করে বেশ কয়েকবার দেখে নেয়, নিজের সন্তুষ্টির জন্য হলেও।
দ্বীপের দেখা পেলে ভালর বদলে মন্দও হতে পারে, বিগড়ে যেতে পারে হিসাবের খাতা। ভদ্র কোনো উপকূলের বদলে শিপ পাথুরে দেয়ালেও ধাক্কা খেতে পারে। তখন আর শিপ বলে কিছু থাকার কথা নয়।
অ্যাক্টিং ক্যাপ্টেন লি এই সব ব্যাপারেই সতর্ক। এক কেবিন ক্রুজারের ইঞ্জিন। বিগড়ে যাবার পর শিপ ভেঙে পড়ার ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল তাকে। জাহাজটা আছড়ে পড়ে বালির একটা দ্বীপে। একটু বিপদ আর একগাদা অ্যাডভেঞ্চার জড়ো হলেও তেমন কোনো অভিজ্ঞতা আবার পাবার কোনো ইচ্ছাই নেই তার। বিশেষত এমন কোথাও, যেখানে এসে উদ্ধার করার মতো কোনো কোস্টগার্ড নেই।
এখানে যেন সত্যিকার এক মহাজাগতিক প্রহসন হয়ে গেল। তারা মানবসৃষ্ট সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ও বাহন নিয়ে এতদুরে এল, এমন ক্ষমতা নিয়ে যা দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই সৌর জগৎ পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব; সেকেন্ডে দেড়-দু হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে যাওয়া কোনো ব্যাপারই না-এখন কিনা মাত্র কয়েক ফুট এদিক-সেদিক করার যো নেই।
কিন্তু একেবারে হেরে বসেনি তারা, লির হাতে খেলার মতো আরো কিছু পাশাগুটি রয়ে গেছে, এখনো।
এই তীক্ষ্ণ ধারওয়ালা দুনিয়ায় প্রান্ত তেমন বিস্তৃত নয়, মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের জিনিসও দেখা যায় না গোলকটা ছোট হওয়াতে। এবং দেখা যাচ্ছে দ্বীপটাকে। লি হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, ভয় ধরানো পাথুরে টিলা নেই উপকূলের দিকে। কিন্তু প্রত্যাশিত বালুকাবেলাও নেই।
ভূগোলবিদরা আগেই সাবধান করেছিল, এখানে বালু জন্মাতে আর মাত্র ত্রিশ চল্লিশ লাখ বছর লাগবে। ইউরোপার বালু তৈরির কারখানা এখনো গড়ে ওঠেনি ঠিকমতো ।
সরাসরি মাটিতে গিয়ে উঠতে হবে দেখেই লি ট্যাঙ্কগুলো সাথে সাথে খালি করে ফেলার আদেশ দিল, টাচডাউনের পর যেগুলো ভরার পরামর্শ সেই দিয়েছিল।
বেশ অস্বস্তিকর কয়েকটা মুহূর্ত ভুগতে হল তাদের। কী হয়-কী হয়! তারপর উৎসাহ হারিয়ে ফেলল এক চতুর্থাংশ কু। হাজার হলেও, এক কাজে কতক্ষণ ব্যস্ত থাকা যায়!
একটু একটু করে জলের আড়াল থেকে আবার শরীর জাগাচ্ছে গ্যালাক্সি; আবার বাড়ছে ঢেউয়ের দোলা। পুরনো দিনের মাছধরা নৌকারা ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে ঠিক যেভাবে নিজেদের হাল্কা করত, সেভাবে ।
সাহায্য করল সবাই, তারপর ঢেউয়ের তোড় উপেক্ষা করে তীরের জন্য অপেক্ষা।
একটা ছোটখাট তীর এগিয়ে আসছে, পাশে ছোট ঘোঁট দুটো বোল্ডার। বালু না পেলে ছাই ফেলতে ভাঙা কুলোই ভাল…
তারপর আরো বড় একটা ঢেউয়ে ভেসে তীরের দিকে এগুনো। কিন্তু এখানেই বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ একবার আছড়ে পড়বে ঠিকই, তারপর আবার ঢেউয়ে নেমে আসতে হতে পারে, অথবা বারবার ঢেউয়ের ধাক্কায় পর্যুদস্ত হওয়াও বিচিত্র নয়।
এবং অবশেষে অ্যাক্টিং ক্যাপ্টেন লি শেষ চালটা চালল।
গ্যালাক্সি শেষবারের মতো তার ল্যান্ডিং গিয়ার প্রসারিত করেছে সামনের দিকে। তারপর, কে জানে, এই প্রথম হয়তো ইউরোপার বুকে কোনো কাঁকড়ার পা পড়ল। মহাকাশ তরী গ্যালাক্সি শেষবারের মতো থামল একটা নিরাপদ জায়গায়, যেখানে সামুদ্রিক ঢেউ বা বাতাস কোনো আঘাত হানবে না।
গ্যালাক্সি যে শেষবারের মতো তার বিশ্রামস্থান পেয়েছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই-আর, বাকীটাও সম্ভব, হয়তো সে কুদের মায়া ছাড়তে পারবে না।
৫. অ্যাস্টেরয়েডের ভেতর দিয়ে
পঞ্চম পর্ব – অ্যাস্টেরয়েডের ভেতর দিয়ে
৩৭.নক্ষত্র
এখন ইউনিভার্স এতো দ্রুত চলছে যে একে কোনো কক্ষপথ ধরে চলা জিনিসের সাথেই তুলনা করা যাবে না। এমনকি সৌরজগতে কোনো বস্তু এতো দ্রুত চলে না-অবশ্য কখনো চলেনি সেকথা আর কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না; এই ক্ষমতা মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে অর্ধশত বছর আগেই।
