বড় দ্বীপটায় ঠেকতে না পারলে বিপদ। শিপ সোজা ভেসে যাবে মধ্য ইউরোপার দিকে, বা মধ্য দিবসের দিকে-যেখানে সর্বক্ষণ লুসিফারের রাক্ষস-চোখ কুটিল দৃষ্টি হেনে থাকে। তখন বড় সমস্যায় পড়তে হবে। অ্যাক্টিং ক্যাপ্টেন লির চিন্তার অনেকাংশ জুড়ে এ ভাবনাটা থাকে।
পালে তেমন কোনো ফারাক পড়বে না। টানানো সম্ভব কিনা তাও ভাবার বিষয়। এরই মধ্যে নোঙর বানানোর কাজ শেষ, পাঁচশো মিটার গভীরেও বসিয়ে দেয়া হয়েছে, লুকানো জলস্রোতের খোঁজে। তাও বিন্দুমাত্র কাজ দেয়নি। না পেয়েছে তলা, না ভিন্ন স্রোতের অস্তিত্ব। এখন তার একটা কথা ভাবা ছাড়া কোনো উপায় থাকছে না, আমিতো এর আগে কখনো দুঃস্বপ্নে স্পেসশিপকে জাহাজ হিসেবে চালানোর ট্রেনিং নিইনি।
অবশ্য অতল হওয়ায় লাভও হয়েছে একটা, মাটির নিচে পানির নিচে সর্বক্ষণ ভূ-আকৃতি ঠিক করার যে কসরৎ চলছে তার কম্পন টের পেতে হচ্ছে না মোটেও। মাঝেমধ্যে নিচ থেকে উঠে আসা শকওয়েভে গ্যালাক্সি কেঁপে ওঠে, যেন বিশাল কোনো হাতুড়ির বাড়ি খেয়েছে। আর ঘণ্টা কয়েক পর ইউরোপার কোথাও না কোথাও প্রায় কয়েক ডজন মিটার উঁচু সুনামি আছড়ে পড়বে কোনো অচেনা সাগরতীরে। কিন্তু এখানে একটা জোর কাঁপন, ব্যস।
তারপরই দেখা গেল সামুদ্রিক ঘূর্ণি, সেইসাথে ঝড়। এতো বেশি ভয়াল যে ইচ্ছা করলে মুহূর্তেই গ্যালাক্সিকে টেনে নিতে পারে অতলে; কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন, সেগুলোও অনেক দূরে। তার পরও সেই ক্ষমতার দাপটে এখানেই শিপটা লাটুর পাক খেয়ে হেনস্থা হতে পারে।
এবং মাত্র একবার, পানি থেকে বিশাল এক বুদ্বুদ উঠল, মাত্র একশ মিটারের মতো দূরে। তারপর সবার মনে যা ছিল তা নির্লজ্জের মতো বলে বসল ডাক্তার, স্রষ্টার কী লীলাখেলা! আমরা ঐ আযাবের কোনো গন্ধই শুঁকতে পারব না। থ্যাঙ্কস গড!
.
দুনিয়া কী অদ্ভুত রীতিতে চলে! এখন, এই অকল্পনীয় রুটিনও গা সওয়া হয়ে গেছে। আর ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাসের একমাত্র চেষ্টা ক্রুদের নিজের দখলে রাখা, ব্যস।
সে পষ্ট দেখতে পাচ্ছে আলসেমির চেয়ে বড় অপনীতি আর নেই। কুঁড়েমির চেয়ে বড় মনোবলহীনতা আর সৌর জগতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই নিষ্কমতা বন্ধ রাখতেই সবাইকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা এবং সে চেষ্টা করতে গিয়েই তার গলদঘর্ম হওয়া।
কীভাবে যে আগের দিনের সাগর অভিযানে কাঠখোট্টা কাপ্তান তার মাঝিমাল্লাদের সব সময় ব্যস্ত আর সুশৃঙ্খল রাখত আল্লা মালুম। মাস্তুল বেয়ে ওঠা নামা আর ডেক ধুয়েমুছে ঝকঝকে করার কাজ কাঁহাতক করানো সম্ভব?
আর বিজ্ঞানীদলের কাছ থেকে বিপরীত সমস্যা আসছে সারাক্ষণ, খেয়ে না খেয়ে তারা পড়েছে টেস্টিংয়ের পেছনে। জান তিতিবিরক্ত করে ছাড়ছে।
কাজগুলো অনুমোদন না করলে অবস্থা কাহিল করে ফেলে, অনুমতি দিলে শিপের সীমিত যোগাযোগ ক্ষমতার সবটুকু দখল করে নিবে।
মাত্র কয়েক মেগাহার্টজের ব্যান্ড উইথড এ কথা পাঠাতে হয় গ্যানিমিডে, সেই কথা উপগ্রহটা ঘুরে পৃথিবীতে রিলে হয়। কারণ মূল অ্যান্টেনা পানির নিচে চলে গেছে।
একটা ক্যামেরা কাজ করছে ডাটা পাঠানোর চ্যানেলে। সেটা বিরক্তিকর সাগর, একঘেয়ে শিপের অভ্যন্তরভাগ আর এখনো শান্ত কিন্তু ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে ওঠা ক্রুদের খবর প্রচার করতে পারে সারাক্ষণ।
এতো বেশি পরিমাণ ডাটা একা তরুণ অফিসার ক্রিস ফ্লয়েডের কাছে আসছে যে ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস কথা না বলে পারল না।
নিজের কেবিনের গোপনীয়তায় বসে সে বলল, ফ্লয়েড সাহেব, আপনি যদি দয়া করে আপনার পার্ট টাইম জবটার কথা একটু খুলে বলেন তো আমি বেশ খুশি হতাম।
ফ্লয়েড অপ্রস্তুত হয়ে টেবিল আঁকড়ে ধরল, হঠাৎ আসা ঢেউয়ের ধাক্কায়, নাকি কথায় কে জানে!
পারলে খুশি হতাম, স্যার। খুশি হয়েই বলতাম। কিন্তু অনুমতি নেই।
কার অনুমতি নেই? প্রশ্নটা করা যাবে তো?
খোলামেলা বলতে গেলে, আমি নিজেও জানি না।
কথাটা এক্কেবারে সত্যি।
তার সন্দেহ সংস্থাটার নাম অ্যাস্ট্রোপোল। কিন্তু যে দুজন ভদ্রলোক গ্যানিমিডে তাকে ব্রিফ করেছে তারা কথাটা জানায়নি।
শিপের ক্যাপ্টেন হিসেবে-স্পেশালি এই বিশেষ মুহূর্তে… আমি আপনাকে এখানকার আগাগোড়া সব জানাতে চাই। এই গাড়া থেকে উদ্ধার যদি পাইও, আগামী কয়েক বছর কাটবে প্রশ্নের উত্তর দিতে। আমার বিশ্বাস আপনার একই হাল হতে যাচ্ছে।
কোনোমতে একটা ফ্যাকাসে হাসি ঝুলল ক্যাপ্টেনের ঠোঁটে।
যদিটা থেকেই যাচ্ছে। যদি উতরে যাই, তাই না, স্যার? আমি শুধু এটুকুই জানি, কোনো এক উচ্চ স্তরের এজেন্সি জানত যে এখানে কোনো না কোনো সমস্যা হবে। সমস্যাটা কী তা জানত না। শুধু চোখ কান খোলা রাখার কাজ পেয়েছিলাম আমি। জানি, কাজটা ঠিক ভালমতো করতে পারিনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমাকেই তারা পেয়েছিল, একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে।
মনে হয় না আপনি কোনো ভুল করেছেন। যাই হোক, কী মনে হয়? এই রোজি মেয়েটা কে…
তারপর হঠাৎই সে থেমে গেল। আপনি কি আর কাউকে পেয়েছেন এর সাথে যুক্ত? ঠিক যুতসই কথাটা বেরুচ্ছিল না মুখ থেকে, তারপর ক্যাপ্টেন বলেই বসল, অন্য কাউকে কি সন্দেহ করছেন? একটু ইতস্তত করে, যেমন আমাকে?
শান্ত চোখে একটু তাকিয়ে থেকে ফ্লয়েড কথা শুরু করল আবার।
