সাধারণ মানুষ ব্যাপারটাকে দারুণভাবে নিচ্ছে। আর কটা দিন কাটুক না, তারপর ভোরের দিকে আরো বড় চমক অপেক্ষা করছে।
শিপটা, প্রতি ঘণ্টায় যেটা দশ হাজার কিলোমিটারের চেয়েও অনেক বেশি গতি বাড়াচ্ছে, সেটা এখন শুক্রের এলাকায়। সে সূর্যেরও বেশ কাছ দিয়ে সৎ করে বেরিয়ে যাবে, এবং তখন, তার গতি থাকবে যে কোনো পার্থিব-অপার্থিব বস্তুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। গন্তব্য লুসিফারের সাম্রাজ্য।
সূর্য ছাড়িয়ে পৃথিবীর কাছাকাছি দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় পৃথিবীর মানুষ খালি চোখেই আরো একটা মজার ব্যাপার দেখতে পেল। অসম্ভব গতিতে একটা বিশাল তারা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে, খুব কাছ দিয়ে, এবং তার লেজটা জ্বলজ্বলে, হাজার কিলোমিটার লম্বা।
সৃষ্টি জগতের যে কোনো বস্তুর চেয়ে বেশি (এমনকি সূর্যের বা চাঁদের দিকেও সারা পৃথিবীতে এতো মানুষ একই সময়ে তাকিয়ে থাকেনি কোনোদিন, গ্রহণের সময়ও না।) মানুষের চোখে একেবারে একই সময়ে ধরা পড়ার নতুন রেকর্ড গড়ল এই মহাকাশযান, ইউনিভার্স।
৩৫. দিকচিহ্নহীন
সিস্টার শিপ ইউনিভার্স আসছে। এমন এক গতিতে এমন এক অভাবনীয় পন্থায় এমন এক সাহসিকতা দেখিয়ে আসছে যে কথা মানুষ স্বপ্নেও দেখতে সাহস পায় না। তারা আসছে অনেক অনেক আগে। এর যে কী প্রভাব পড়ল গ্যালাক্সির উপর তার কোনো তুলনা নেই, মানুষজন যেন অজান্তেই নেশার চরম শিহরন অনুভব করছে, যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে বারবার।
তারা যে অজানা সাগরের বুকে অচেনা অপার্থিব জলদানব পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছে, তাও নিষিদ্ধ জগতে, সেকথা যেন সবাই ভুলে গেছে।
একই কথা জানোদের ক্ষেত্রেও বলা চলে, তারা আশপাশে আসে, এমনকি সেই হাঙরেরাও আসে, কিন্তু যথেষ্ট দূরত্ব রেখে চলে। এমনকি ময়লা ফেলার সময়ও কাছেধারে ঘেঁষে না। অবাক ব্যাপার, দেখেশুনে মনে হয় তারাও যেন যোগাযোগের দারুণ একটা পদ্ধতি মেনে চলে। এখন মনে হচ্ছে তারা হাঙরের চেয়ে ডলফিনদের সাথেই বেশি আত্মীয়তা তাদের।
এবং ছোট্ট মাছেদের বেশ বড় বড় সমাজ দেখতে পাওয়া যায় যার কোনোটাই কোনোকালে পৃথিবীর মেছো হাটগুলোয় পাওয়া যায়নি।
হাজার যত্নআত্তি করে এক অফিসার একটা ধরতে পারল হুক দিয়ে। ভিতরে আনতে নিলে ক্যাপ্টেন খুনখারাবি বাঁধিয়ে দিবে। কী দরকার বাবা! তারচে বেশ কয়েকটা ছবি নিয়ে সাগরে নামিয়ে দিলেই হল।
এবং এ কাজের জন্য খেলোয়াড়কে সাথে সাথেই মূল্য দিতে হয়েছিল। তার প্রেশার স্পেসস্যুটে মাছটার গা লেগে যায় সামান্য সময়ের জন্য। তারপর শিপে প্রবেশ করেই যত বিপত্তি। পঁচা ডিমের গন্ধ এল তার গা থেকে। যতই বলা হোক, কেউ মানল না, বিশ্রী ব্যাপারটা নিয়ে কথা চালাচালি চলতেই থাকবে এবার। গায়ের গন্ধ ঠিকই যায় মনের গন্ধ যায় না। হায়রে অ্যালিয়েন বায়োকেমিস্ট্রি!
তারপরই বেঁধে ফেলা হল বিজ্ঞানীদলকে, আপনারা প্রকৃতিবিদ নন, ভূগোলবিদ। তাই প্রকৃতিবিদ্যা নিয়ে গবেষণার সময় দূর থেকে ডাটা কালেক্ট এবং রেকর্ড করতে পারবেন, প্রকৃতিকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে । কেউ ফরমালিন আনার কথা ভাবেনি। হাজার হলেও এখানে নামতে হবে তা কার মাথায় ছিল? রোজি আনলে আলাদা কথা।
সামনে শিপ সবুজ সবুজ শ্যাওলা জাতীয় দলের মুখোমুখি হল। জিনিসগুলো প্রায় দশফুটি, ডিম্বাকার এবং প্রায় সমান সমান। বিনা বাধায়ন জাহাজ সেগুলোকে এড়িয়ে এগিয়ে গেল সামনে। কোনো ধরনের কলোনিয়াল উদ্ভিদ হবে হয়তো।
তারপর এক সকালে অফিসার ইন ডিউটি সমুদ্রের বুক থেকে পেরিস্কোপ জেগে উঠতে দেখে যারপরনাই অবাক হল। একটু পর পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠেই সে বর্ণনা করেছিল, জিনিসটা নাকি অনেকটা মরা গরুর চোখের মতো। ঠাণ্ডা, নীল। সেটা তাকে বেশ অনাগ্রহ আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সাথে বেশ কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে ভুস করে আবার সাগরে ডুব দিল।
এখানে কোনোকিছুই দ্রুত চলে না। ব্যাখ্যাটা বেশ সরল, পৃথিবীর ভারী অক্সিজেন স্তর সব প্রাণীকেই জন্ম থেকে ও-টু বিস্ফোরণে শক্তির জোগান দিয়ে আসছে। এখানে হাল্কা বায়ুমণ্ডল এবং তারচেও পল্কা অক্সিজেন গ্যাসের হার থাকায় কেউ জুতসই প্রসেসিং চালাতে পারে না, ফলে দ্রুত কার্যক্ষম হয় না দেহঘড়ি।
শুধু হাঙর গুলোর মধ্যে বেশ ব্যতিক্রম দেখা গেল। প্রথম পরিচয়ে তেমন গতি দেখাতে না পারলেও শেষবেলায় তার শক্তিমত্তার একটু দেখতে পেয়েছিল সবাই।
স্পেসস্যুটে নিজেদের যারা জড়িয়ে রাখছে তাদের জন্য এটা বেশ সুখবর। এখানে চাইলেও কেউ তাদের ধরে খেতে পারছে না। আপাতত।
.
ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস সমস্ত শিপের ভার পার্লারের হাতে ছেড়ে দিয়ে মৌজেই আছে বলা চলে। এই দূর সমুদ্রে, সাগর-মাটির সন্ধিক্ষণের কাছাকাছি চলে এসে শিপ-হিসাব রক্ষককে পুরো শিপের কর্ণধার করে দেয়ার মতো কাজ করার মধ্যে গভীর একটা দার্শনিকতাও যেন আছে।
অবশ্য মি. লির করার মতো তেমন কোনো কাজ নেই। গ্যালাক্সি একটা স্থিত গতিতে ঢিমে তালে এগিয়ে চলছে; এক তৃতীয়াংশ মুখ বাইরে ভাসিয়ে রেখে, পাঁচ নটের মৃদুমন্দ গতিতে, সমান্তরালে। দু চারটা ছিদ্র পেয়ে সাথে সাথে ঠিক করা হয়েছে আগেই, মূল খোল ভালই আছে, একেবারে অটুট।
বেশিরভাগ নেভিগেশন ইকুইপমেন্ট ভালই আছে, যদিও তারা একেবারে অকর্মার টেকি। গ্যানিমিড় প্রতি ঘণ্টার বিকন দিয়ে গ্যালাক্সির সাথে যোগাযোগ রাখছে। এ গতিতে চলতে থাকলে তিন দিনের মধ্যে একটা নতুন দ্বীপে চলে যেতে পারবে তারা।
