তারপর, পরের ঘণ্টাগুলোয় অভিযানের পরিকল্পনা চলল। আর কিছুক্ষণ, তারপরই ওল্ড ফেইথফুল হারিয়ে যাবে মানুষের চোখের সামনে থেকে। পরের অভিযানে এটা থাকে না থাকে আল্লা মালুম। কে জানে, ভাবল ফ্লয়েড, হয়তো ১৯১০ সালের ছবিগুলোতেও এই প্রসবণটাকে দেখা যাবে।)।
আগেকার দিনের মতো কোনো কাউন্ট ডাউনের ঝক্কি ঝামেলা নেই। সব ঠিকঠাক চলছে বোঝার সাথে সাথেই ক্যাপ্টেন মাত্র পাঁচ টনের ধাক্কা দিয়ে শিপকে ভদ্রভাবে ধূমকেতু থেকে তুলে দিল।
ত্বরণ স্বাভাবিক হলেও প্রযুক্তিটা মানুষকে বিবশ করে রাখে। এই বাইরে থেকে না দেখতে পাওয়া জেটগুলো অসাধারণ। উচ্চ আয়োনিত হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন বেরিয়ে যায় নরকের তাপ গায়ে নিয়ে। শত শত কিলোমিটার দূরে সরে গিয়ে আস্তে আস্তে তাপ থিতিয়ে আসে, তারপর রাসায়নিকভাবে যুক্ত হওয়ার মতো ঠাণ্ডা হয়। তারও অনেক অনেক পরে তাপমাত্রা পরিবেশের সাথে মানিয়ে যায়। এবং সেই জ্বলন্ত পরমাণু বা আয়নগুলোকে দেখা যায় না কারণ দেখার মতো বর্ণালী নেই সে আলোতে।
কিন্তু এখন ইউনিভার্স এমন এক আলো পেছনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে যেদিকে তাকানো যায় না তখন মানুষ অবাক না হয়ে কি আর পারে! যেন আগুনের এক কঠিন স্তম্ভ। যেখানে এটা পাথরকে স্পর্শ করছে সেখানেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রস্তরগাত্র! চলে যাবার আগে মহাজাগতিক স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে ইউনিভার্স, হ্যালির ধূমকেতুর বুকে।
সবাই স্তম্ভিত। ফ্লয়েড অপ্রতিরোধ্য ব্যাখ্যার আশায় বসে আছে। উইলিসকে বোঝানো হচ্ছে যে এমনটা মাঝেমধ্যেই ঘটতে পারে।
কার্বন। সে কোনো কথাই মানবে না, কার্বনের হার বেশি। তাই এমনভাবে জ্বলছে। মোমের আলোর মতোই, শুধু একটু বেশি গরম।
এই, সামান্য আর কী! যোগ করে ফ্লয়েড।
“আমরা জ্বলে পুড়ে মরতে যাচ্ছি না-তুমি যদি কথাটাকে ক্ষমা করো-(ঠিক কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না যেন ফ্লয়েড)- পিওর ওয়াটার-অনেক সাবধানে ফিল্টারিং করার পরও হাজারটা মাইক্রনিক গুড়ো রয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কলয়েডিয় কার্বন থেকেই যায়। সাথে এমন কিছু যৌগ থাকে যা শুধু ডিস্টিল্ড ওয়াটারেই থাকে না।
কাজ হয়েছে দুর্দান্ত, কিন্তু আমি একটু হতাশ হলাম। বলছে গ্রিনবার্গ, এই তেজস্ক্রিয়তা কি ইঞ্জিন আর শিপের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না?
দারুণ প্রশ্ন-এবং বেশ চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে দিল চারপাশে। ফ্লয়েড আশা করেছিল উইলিসই জবাব দেবে কিন্তু চতুরতার সাথে সে বলটা তার দিকেই ফিরিয়ে দিল।
জবাবটা ড, ফ্লয়েড দিলেই ভাল হয়। হাজার হলেও আইডিয়াটা তার।
জলসনের, প্লিজ। তোলা পয়েন্টটা বেশ শক্ত, বলতেই হয়। ফুল গ্রাস্টে চলার সময় সমস্ত পুচ্ছটা হাজার কিলোমিটার দূরে থাকবে। এ নিয়ে চিন্তার কিছুতে দেখছি না।
শিপ এখন নিউক্লিয়াসের কিলোমিটার দুয়েক দূরে ভেসে আছে। নিচের-অথবা দূরের সেই উষ্ণপ্রস্রবণ এর উঠে এসে সামান্য প্রশস্ত হয়ে যায় দেখে তার লেক জেনেভার কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। সে পঞ্চাশ বছর ধরে সেগুলো দেখছে না। কে জানে এখনো আছে কিনা সেখানে।
ক্যাপ্টেন স্মিথ এখনো পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, সামান্য প্রাস্টে ডান-বাম করে দেখছে কোনো সমস্যা আছে কিনা। একবার এক্স আরেকবার ওয়াই অক্ষ ধরে এগুচ্ছে। আর কোনো সমস্যা না দেখা দেয়ায় কথা বলে উঠল এবার সে।
মিশন টাইম জিরো এখন থেকে দশ মিনিট দূরে। ০.১ জি থাকবে প্রথম পঞ্চাশ ঘণ্টা, তারপর ঘোরার আগ পর্যন্ত ২।
কথাটা হজম করার সুযোগ দিল সে সবাইকে। এর আগে কোনো শিপ এতোক্ষণ ধরে এতে ত্বরণ সয়নি। যদি ইউনিভার্স সয়ে যেতে পারে তো সে প্রথম শিপ হিসাবে নাম লেখাবে ইতিহাসের বুকে।
শিপ উপরের দিকে মুখ করে (শুনতে বেখাপ্পা লাগে) সোজা বরফ-বাষ্পের স্তম্ভের দিকে উঠে যাচ্ছে।
কী করছে লোকটা? অস্থির হয়ে প্রশ্ন তুলল মাইকেলোভিচ।
নিশ্চই ক্যাপ্টেন জানে এ প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে তাকে। তাই সে নিজে থেকেই কাঠখোট্টা জবানিতে ব্যাখ্যা করল।
ছেড়ে যাবার আগে এই একটু চেখে নেয়া। আমি ঠিকই জানি, কী করছি না করছি। নাম্বার টু ও আমার সাথে একমত। আপনারা কী বলেন?
ইয়েস, স্যার-যদিও প্রথমদিকে মনে হল আপনি ঠাট্টা করছেন…
ব্রিজে কী হচ্ছে? হচ্ছেটা কী? প্রশ্ন ঝুলে আছে উইলিসের কণ্ঠে।
এখন শিপ ধীর একটা কাজ শুরু করল। প্রস্রবণটার কাছাকাছি চলে এসেছে তারা, আরো বেশি করে জেনেভা হ্রদের কথা মনে পড়ছে ফ্লয়েডের।
নিশ্চই সে আমাদেরকে এটার ভিতরে নিতে চাচ্ছে না…
কিন্তু সে তাই চাচ্ছে। ফোমের উঠতি স্তম্ভের গায়ে লেগে গিয়েই ইউনিভার্স ছোটখাট একটা ঝাঁকি খেল। তারপর ভিডিও মনিটর আর বাকী সবকিছুতে একটা অস্পষ্ট সাদাটে আলো ছাড়া অন্য কিছুই দেখা গেল না।
পুরো কাজের পেছনে খুব বেশি হলে দশ সেকেন্ড ব্যয় হল, তারপরই উঠে এল * অনেকটা উপরে এবং বেরিয়ে এল অন্যপাশে। ইতস্তত বোধ করছে সবাই, অফিসার অন ডিউটিও চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে চারদিকে। বেচারার ভাব, যাত্রীরা প্রশ্ন তুললে কী জবাব দেবে!
এবং অবশেষে শব্দ ভেসে এল, ক্যাপ্টেনের গলা থেকেই, আমরা এখন যেতে প্রস্তুত। আবার একটা ঝকঝকে তকতকে শিপে করে যাত্রা হোক শুরু।
.
পরের আধঘণ্টা পৃথিবী আর চাঁদে উথাল পাথাল চলল। দশ সহস্রাধিক অপেশাদার ধূমকেতু দর্শক হা-পিত্যেশ করে মরল! হ্যালির উজ্জ্বলতা বেড়ে গেছে অনেকগুণ। কমেট ওয়াচ নেটওয়ার্ক অতি ভারে পুরোপুরি ব্লক হয়ে গেল সাথে সাথে। এবং ভয়াবহ রূপ নিল পেশাদার অ্যাট্রোনোমাররা।
