এতোক্ষণে একটু হাসির আওয়াজ উঠল আশপাশ থেকে। ফলে ক্যাপ্টেনও সহজ হয়ে এল একটু। হাসিটা দরকার ছিল খুব।
হ্যালির পানিতে কোনো সমস্যা নেই তা বোঝার জন্য একটু সময়ের জন্য ইঞ্জিন চালানো হবে। যদি বিন্দুমাত্র সমস্যা দেখা দেয় তো নির্দ্বিধায় চাঁদে ফিরে গিয়ে সহজ সরল এ্যারিস্টার্কাসের পানিই ব্যবহার করব।
এখানেও সেই পার্টি নিরবতা জেঁকে বসেছে, যখন সবাই আশা করে অন্য কেউ কথা বলবে।
আর না পেরে ক্যাপ্টেন স্মিথ অস্বস্তিকর পরিবেশটা ভেঙে দিল।
আপনারা সবাই জানেন আমি পুরো আইডিয়াটার উপর খুব নাখোশ। এমনকি তারপর হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। সবাই জানে যে সে এই নাখোশির প্রমাণ– স্বরূপ স্যার লরেন্সের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিল।
কিন্তু গত কয়েক ঘণ্টায় যেন কয়েক রাত কেটে গেল। মালিকপক্ষ রাজি, যদি
কোনো মৌলিক সমস্যা না থাকে। আর সবচে অবাক ব্যাপার, ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল শুধু অনুমোদন দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং অনুরোধ করেছে যেন কাজটা আমরা করি । এমনকি যে কোনো মূল্যে কাজটা করার কথাও আছে সেখানে। হ্যাঁ, আমার মতো আপনাদের অনুমানের ক্ষমতাও সমান….
কিন্তু এখনো আমার একটা দুঃখ রয়ে গেল।
সে একটু তাকায় পানির বাটার দিকে। সেটা এখন হেউড ফ্লয়েডের হাতে ধরা। সে জিনিসটাকে আলোর দিকে ঝাঁকাচ্ছিল।
আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার, কোনো মরার কেমিস্ট নই। দেখতে তো বেশ পরিষ্কার- কিন্তু যদি ওটা কোনো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় লাইনিংয়ের জন্য?
ফ্লয়েড বোঝে না কেন লোকটা এমন আচরণ করে যা তার সাথে মিলছে না। মিলছে না তার চরিত্রের সাথে । হয়তো হাজার তর্কে সে ক্লান্ত হয়ে রণেভঙ্গ দিয়ে কাজে ফিরতে চাচ্ছে। নয়তো তার মন-মস্তিষ্কে বসে গেছে যে ক্যাপ্টেনের অবশ্যই আচার-আচরণে, মেরুদণ্ডে বেশ শক্তপোক্ত হওয়া উচিত।
সাথে সাথেই সে হ্যালির পানি থেকে খানিকটা, প্রায় বিশ সিসি তুলে নিয়ে গলায় ঢেলে দিল।
সবার বিস্মিত চোখের সামনে বলল, এই আপনার জবাব, ক্যাপ্টেন।
.
এটা আমার জীবনে দেখা সবচে বোকামিপূর্ণ প্রদর্শনী। আধঘণ্টা পর ডাক্তার বলল, আপনি কি জানেন না যে এই পানিতে সায়ানাইড, সায়ানোজেন আর কী কী আল্লা মালুম টাইপের যৌগ থাকার কথা?
অবশ্যই আমি জানি, বিস্তৃত হল ফ্রয়েডের হাসি, জানি বলেই খেয়েছি। লাখ লাখ ভাগে একভাগ সায়ানাইড ধরনের কম্পাউন্ড আছে সেখানে। কেমিক্যাল অ্যানালাইসিসটা আগেই দেখে বসে আছি। তবে একটা চমক আমি পেয়েছি।
কী চমক? আরো বেশি বিস্তৃত হল এবার বৃদ্ধ সেলিব্রিটির মুখের হাসি, একবার পানিটা পৃথিবীতে নিয়ে যান না; তারপর হ্যালির পানি মানুষ একনামে কিনবে।
৩৪. কার ওয়াশ
এবার যাবার কথা দেয়ার পর পরই পুরো ইউনিভার্সের চেহারা বদলে গেল পুরোপুরি। আর কেউ কথা তোলেনি তারপর। এরচে খারাপ পরিস্থিতি যাতে না হয় সে আশাই সবার। সাধ্যমতো কাজ করছে পুরো স্পেসশিপ। পরের দু হ্যালি দিবস (পৃথিবীতে শত ঘণ্টা কেটে যাবে এটুকু সময়ে।) অনেকেই ইচ্ছামতো ঘুমিয়ে নিল।
প্রথমবার, সারাদিন বেশ সাবধানে ওল্ড ফেইথফুলের পানি সংগ্রহ করা হলেও পরে আর কোনো সন্দেহ থাকেনি। হাজার টনের চেয়েও বেশি পানি তোলা হয়েছে শিপের গায়ে। বাকীটা ভরার জন্য পরদিনই যথেষ্ট।
ফ্লয়েড যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে ক্যাপ্টেনকে। বেচারা দেখা হলেই হাজারটা ফ্যাকড়া তোলার ধান্ধা করে। নতুন অর্বিট নিয়েও কথা তুলতে পারে। যাক, বাঁচা গেল, অর্বিটটা তাদের তৈরি নয়, বরং পৃথিবী থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রশংসা জুটছে দেদার। এবং প্রত্যাশিত সময়ের চেয়েও কম লাগবে কাজ শেষ হতে। প্রাথমিকভাবে জলসন যে সময় এবং কক্ষপথ দেখিয়েছিল তারচে সুন্দর, সহজ এবং নিরাপদ ব্যবস্থার অনুমতি দিয়েছে পৃথিবীর কন্ট্রোল। সবাই ব্যাপারটায় দারুণ খুশি।
আচ্ছা, ঠিক আছে, সবাই না। প্রায় সবাই।
পথিবীতে, দ্রুত ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হ্যান্ডস অব হ্যালি সোসাইটি পৃথিবীজুড়ে মাতম তুলল, এর সদস্যরা (সব মিলিয়ে মাত্র ২৩৬ জন, কিন্তু তারা জানে কীভাবে নিজেদের ঢোল নিজেদের দিয়ে পেটাতে হয়।) চিরে ফেলল আকাশ, না, এই প্রাকৃতিক জিনিসটা থেকে আর যাই হোক, ভর ছিনিয়ে নেয়া যাবে না। এমন বিজ্ঞান থাকার চেয়ে না থাকা ভাল। হ্যালি সৌর জগতের মুক্তা, এর এমন ক্ষতি সহনীয় নয়। হয়তো এ ভরটা একদিন হ্যালি ছড়িয়ে দিত কালো মহাকাশে, তাই বলে তার ধ্বংস ত্বরান্বিত করার কোনো অধিকার কারো নেই।
একটা অ্যাটিচ্যুড কন্ট্রোল থ্রাস্টার দিয়ে অতি সাবধানে ক্যাপ্টেন স্মিথ পরীক্ষাটা চালালো। এটা নষ্ট হয়ে গেলে এ ছাড়াও আপাতত শিপের চলবে। আর পৃথিবী থেকে আনা ফিরে যাবার মতো পানি তো আছেই। জেটের আচার ব্যবহার অতি ভদ্র, যেন কিছুই হয়নি, যেন চাঁদের কোনো খনি থেকে পানি তুলে ভরা হয়েছে এর ভিতরে।
এবার সে আসল থ্রাস্ট ড্রাইভটাকে পরীক্ষার ময়দানে তীর-ধনুকে সাজিয়ে পাঠালো। ক্ষতি যদি হয়েই যায়, চলাচল বন্ধ হবে না। এটাই আসল গতি দেয়, ঠিক, কিন্তু চারপাশের চার অ্যাটিচ্যুড কন্ট্রোল জেটই দিক ঠিক করে। এটা নষ্ট হলে চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে না, গতিটা শুধু আশিভাগ কমে যাবে।
এখানেও তাবৎ ইঞ্জিন বহাল তবিয়তে থাকল। এবং সবাই ভাল ব্যবহার করা শুরু করল হেউড ফ্লয়েডের সাথে, এমনকি সেকেন্ড অফিসার জলসন আর মানুষের চক্ষুশূল নয়।
