সে বলতে পারতো, অন্য শিপটাকেও সেদিকে ছুঁড়ে দিচ্ছি, আর্থিক দিক দিয়ে হিসাব করলে লাভই হবার কথা।
ক্যাপ্টেন স্মিথের ব্যাপারে সে বেশ দুঃখিত। অন্যদিকে ল্যাপ্লাস পচছে ইউরোপায়। আর কে আছে এখন পৃথিবীতে এতো দক্ষ?
৩৩. গর্তের শেষ
কলেজ ছাড়ার পর সবচে বিশ্রী কাজ এটা, কিন্তু এ ছাড়া আর কী করার আছে আমাদের?
উম্মা ঝাড়ল চিফ ইঞ্জিনিয়ার।
পঞ্চাশ মিটার লম্বা পাইপলাইনের ভিতর দিয়ে এখন ওল্ড ফেইথফুলের বাষ্প আর বরফকণার সাথে কার্বনের সূক্ষ্ম আকৃতি এগিয়ে যাবে। সূর্য ওঠার সাথে সাথে উষ্ণ প্রসবণটার ভিতরে চঞ্চলতা বেড়ে যাবে অনেকখানি।
অবজার্ভেশন লাউঞ্জ থেকে দেখতে দেখতে হেউড ফ্লয়েড ভাবল, চব্বিশটা ঘন্টা কাটতে না কাটতেই এতোকিছু হয়ে গেল কীভাবে! প্রথমেই শিপের সবাই দু ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, একদল ক্যাপ্টেনের পক্ষে, অন্যদল ফ্লয়েডের। এম্নিতে কোনো
প্রকাশ্য বিতর্ক হয়নি, এমনকি শীতল হলেও সৌজন্যমূলক কথাবার্তাও চলেছে, সামনে পড়ে গেলে। কিন্তু আড়ালে আবডালে কেউ কেউ তাকে সুইসাইড ফ্লয়েড নামেও ডেকেছে। হাজার হলেও, জীবনভর যে সম্মান নিয়ে চলেছে সে, সেটার সাথে মানাচ্ছে না ব্যাপারটা।
এখনো কেউ ফ্লয়েড-জলসন চলনের কোনো ভুল খুঁজে পায়নি। (নামটাও অন্যায়: সে হাজারবার বলেছে যে সমস্ত ক্রেডিট জলসনের; কিন্তু কে শোনে কার কথা! তারপর সহাস্যে মাইকেলসন বলল, তুমি কি দোষের ভাগ নিজের কাঁধে নিতে চাও না?)
বিশ মিনিটের মধ্যে প্রথম টেস্ট হয়ে যাবার কথা ওল্ড ফেইথফুলে সকাল হবার সাথে সাথেই। আর সাথে সাথেই যদি ক্যাপ্টেন স্মিথের কথামতো কাদামাটির বদলে বিশুদ্ধ পানিতে ট্যাঙ্ক ভরে উঠতে শুরু করে তাহলেই ইউরোপা যাবার পথ বেরিয়ে যাচ্ছে না।
সমস্যাটা ছোট হলেও চিন্তা করতে হবে। অতিথিদের ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। তারা সবাই মাটির সেরা সন্তান, দুসপ্তাহের মধ্যে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেখানে তাদেরকে সৌর জগতের একদিক থেকে আরেকদিকে, প্রায় অর্ধেক এলাকা ঘুরিয়ে একটা নিষিদ্ধ অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে (যেখানে উদ্ধার পাওয়াও এক প্রশ্ন) আবার ফিরিয়ে আনতে হবে উদ্ধারপ্রাপ্ত লোকদের সাথে খাবার এবং সুবিধা শেয়ার করিয়ে। তাদের বয়সটাও বিবেচ্য।
উইলিস বেশ বিরক্ত হয়েছে, তার সব শিডিউল এলোমেলো হয়ে যাবে। সে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে আইনের আশ্রয়ে যাবার কথা বলছিল বেশ গরম সুরে, কিন্তু কেউ দাম দেয়নি।
টগবগ করে ফুটছে গ্রিনবার্গ। অনেক বছর পর, আবার সে সত্যিকার স্পেস অভিযানে নামতে পারবে। অন্যদিকে মাইকেলোভিচ তার বেশিরভাগ সময় নষ্ট করে গেছে সাউন্ডপ্রুফ অফিসে বসে বসে কম্পোজ করার কাজে, সেও বেশ উৎফুল্প। তার বিশ্বাস, এই পরিবর্তনটা জীবনে নূতন গতি এনে দেবে, সৃষ্টিশীলতা আসবে আবার ফিরে।
ম্যাগি পুরোপুরি দার্শনিকতায় ভরপুর: যদি কাজটা অনেক জীবন বাঁচায়, তো উইলিসের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বাকীটা শেষ করে সে, কী করে কোনো মানুষ এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে?
ইভা মারলিনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যভাবে এসেছে। ফ্লয়েড সময় নিয়ে সবকিছু বুঝিয়েছে তাকে, তারপর আবিষ্কার করেছে যে সেও পরিস্থিতি বুঝতে পারে বেশ সহজেই। অবাক হয়ে সে লক্ষ্য করে অন্যরা যে প্রশ্ন তোলেনি তাই ইভার মনে উঁকি দিয়েছে সবার আগে, যদি ইউরোপানরা আমাদের ল্যান্ড করতে দিতে না চায়? যদি
তারা উদ্ধার করতে দিতে না চায় তখন?
ফ্লয়েড এখনো তাকে ঠিক রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। সে দুর্বোধ্য জগত থেকে কখন বেরিয়ে আসবে কে জানে! তার অন্যরকম থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
বিশ্বাস কর, আমি এ নিয়ে কাজ করছি এখনো, ইভা।
তার কথা সত্যি। সে কখনো ইভা মারলিনের সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারবে না।
.
উষ্ণ প্রসবণ থেকে বাস্পের প্রথম ছোঁয়া বেরিয়ে আসে একটু একটু করে, তারপর একেবারে হঠাৎ উপরের সবটুকু আকাশের সারা বাঁধা এড়িয়ে তীরবেগে উঠে যেতে থাকে উপরদিকেই।
আবারও ওল্ড ফেইথফুলের মুখ খুলে গেছে। আকাশের দিকে তুষারশুভ্র এক স্তম্ভ উঠে গেছে বিনা বাঁধায়। যে কারো পার্থিব দৃষ্টি আশা করবে প্রসবণটার উপরপ্রান্ত ব্যাঙের ছাতার মতো বেঁকে গিয়ে ফিরে আসবে মাটিতে, কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। খুব কমই ছড়াচ্ছে আশপাশে, এবং উঠতে উঠতে মিশে যাচ্ছে এর বাড়তে থাকা বিশাল বাষ্প-খামের সাথে। ফ্লয়েড দেখল পাইপলাইনটা ঋকি খাচ্ছে, ভিতরে তরল।
দশ মিনিট পর ব্রিজের উপর একটা যুদ্ধসভা বসল। ক্যাপ্টেন স্মিথ সামান্য মাথা নুইয়ে ফ্লয়েডের উপস্থিতি স্বীকার করল। তার সারিন্দাই সব কথা বলল, একটু অপ্রস্তুত হয়ে।
যাই হোক, কাজ করছে চমৎকার। বিশঘণ্টা এ হারে পানি ভরলেই আমাদের সবটা পূর্ণ হয়ে যাবে। বাইরে গিয়ে পাইপটা একটু শক্ত করে নিতে হবে, এই যা।
ময়লার কী হবে? প্রশ্ন তুলল কেউ একজন।
ফাস্ট অফিসারের হাতে একটা স্বচ্ছ স্কুইজ বা ধরা, সেটায় স্বচ্ছ পানি ভরা।
কয়েক মাইক্রন পর্যন্ত যা ছিল সবই ছেকে নিয়েছে ফিল্টারগুলো। নিরাপত্তার খাতিরে আমরা কাজটা একাধিকবার করব। এক ট্যাঙ্ক থেকে আরেকটায় পানি নিয়ে গেলে ফিল্টারিংয়ের কাজ আরো সূক্ষ্মভাবে হয়। মঙ্গল ছেড়ে যাবার আগে কোনো সুইমিং পুল নয়।
