ও মাই গড! বলল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস, যেন কোনো সিদ্ধান্তে এসে পড়েছে, আমি জানি কী হল এখন!
পুরোপুরি ভিন্ন জৈবরসায়ন, বলল ডাক্তার, তারপর ভয় পেয়ে যেন চমকে উঠল অনেকটা, অবশেষে রোজি অন্তত একজনকে শিকারে পরিণত করতে পারল।
.
গ্যালিলির সাগরের নামকরণ হয়েছে অবশ্যই ইউরোপার আবিষ্কারকের নামে। অন্য এক দুনিয়ায় ছোট্ট এক সাগরের নাম এখন তার নামে।
সাগরের বয়স একেবারেই কম, মাত্র অর্ধশত বছর। কিন্তু আর সব নবজাতকের মতো সেও নানা বিপত্তি ঘটাতে পারে। ভরসার কথা একটাই, ইউরোপায় এখনো ঝড় তৈরি হবার মতো শক্তিশালী বায়ুমণ্ডল গড়ে ওঠেনি। একটা শান্ত বাতাস ভূমি থেকে সমুদ্রের দিকে বয়ে গেল, যেখানকার আকাশে লুসিফার চির স্থির রূপ নিয়ে বসে আছে, সেদিকে। এখানে, স্থির দুপুরের এলাকাটায় সব সময় পানি সেদ্ধ হয়ে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। এই বায়ুমণ্ডলের চাপে এমন তাপমাত্রায় সহজেই এক কাপ চা বানিয়ে নেয়া যায়।
সৌভাগ্যজনকভাবে, যেখানে সারাক্ষণ এই তাণ্ডব চলছে সেখান থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে পড়েছে স্পেসশিপটা। এলাকা বেশ শান্ত। সবচে কাছের ভূমি থেকে শত কিলোমিটার দূরেও নয়। সর্বোচ্চ গতিতে সে এই দূরত্বটা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে পার করে যেতে পারে। কিন্তু এই অদ্ভুতুড়ে পরিবেশে ইউরোপার চিরস্থায়ী মেঘের নিচে পানিতে পড়ে থেকে সামান্য দূরত্বটাকেই কোয়াসারের মতো অসীম বলে মনে হচ্ছে।
এই ল্যান্ডিংটা যদি এমন শুধু সমুদ্রে না হয়ে কোনো কুমারী বেলাভূমিতেও হতো, কী লাভ হতো তাতে।
এখানে আরেকটু আরাম আয়েশ থাকত তখন। স্পেসশিপ ওয়াটারপ্রুফ হলেও পানিতে তেমন আরামদায়ক নয়। শিপটা সমুদ্র উপরিতলে সত্যিকার জাহাজের মতোই ভেসে আছে, কিন্তু সমস্যা হল, প্রতিটি বড় ঢেউয়ের সাথে এদিক-সেদিক দুলছে এবং এ শিপের ত্রুরা কেউ নাবিক নয়। তাই মহাকাশতরীর অর্ধেক সারেংই অসুস্থ হয়ে পড়েছে বাকীদেরও একই অবস্থায় আসতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়।
সব ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট পেয়েই ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস সবার আগে জানতে চায়, কেউ নৌকা চালাতে জানে কিনা। যে আকার প্রকারেরই হোক না কেন, নৌকা চালাতে জানলেই হল।
ত্রিশজন অ্যাস্ট্রোনট এবং বিজ্ঞানীর মধ্যে কেউ না কেউ সৌখিন নাবিক হবেই, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পাওয়া গেল পাঁচজনকে, এবং মজার ব্যাপার, একজন সত্যিকার নাবিকও বেরিয়ে গেল সাথে সাথে। পার্সার ফ্র্যাঙ্ক লি আসলে সুং শিপিং লাইনে কাজ শুরু করে, তারপর সুযোগ বুঝে ঢুকে পড়ে মহাকাশ তরীতে।
পার্সাররা অ্যাকাউন্টিং মেশিন চালানোয় বেশি পারদর্শী হলেও তাদেরকে অবশ্যই বেসিক সীম্যানশিপ পাশ করতে হয়, তাই তাদের নেভিগেশনাল অপারেশন জানা অবাক করা ব্যাপার নয়। মজার ব্যাপার, ফ্র্যাঙ্ক লিকে অনেক সময় দুশ বছরের পুরনো অ্যাবাকাসও চালাতে হয়েছিল। অবশ্য সে কখনোই তার বিয়ের সময়কার সেই ট্রেনিংয়ের বাস্তব ব্যবহার করতে পারেনি, তার উপর কোথায় বিলিয়ন কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ চীন সাগর আর কোথায় সি অফ গ্যালিলি।
প্রোপ্যাল্যান্ট ট্যাঙ্কগুলো ভরে ফেলা উচিত বলল সে ক্যাপ্টেনকে, তাহলে আর শিপ উঠা নামা করবে না। বেশ স্থির থাকবে।
শিপে আরো পানি আসতে দেয়াটা কেমন যেন বোকামী বলে মনে হল। আর ক্যাপ্টেনও বেশ ইতস্তত করছিল।
ধরা যাক আমরা আশপাশে ঘুরে বেড়াতে চাই, তখন?
আর কেউ আসল জবাবটা দিল না, তাতে কী এসে যায়?
এবং তারপর বেশ কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে সিদ্ধান্ত হল পানির চেয়ে মাটির উপরে থাকাটাই ভাল হবার কথা-যদি যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে।
আবার যে কোনো সময় ট্যাঙ্ক খালি করা যাবে। একাজ করা প্রয়োজনও পড়বে হাল্কা পানিতে যাবার সাথে সাথে। প্রথম সুযোগেই শিপটাকে আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়া করানো যাবে, থ্যাঙ্কস গড, আমাদের হাতে ক্ষমতা আছে…
তার কণ্ঠ স্তিমিত হয়ে গেল সাথে সাথেই। সবাই জানে, কী বোঝাতে চায় সে। অকজিলারি রিয়্যাক্টরটা না থাকলে সবাই এরমধ্যে মারা যেত, লাইফ সাপোের্ট সিস্টেম চালায় ওটাই।
এবং এরই মধ্যে তারা সবাই বেশ ভালভাবে জেনে গেছে, সি অফ গ্যালিলির বুকে পুষ্টির কোনো চিহ্নই নেই। শুধু বিষ আর বিষ, চারদিকে।
গ্যানিমিডের সাথে যোগাযোগের কাজটা সেরে ফেলা হয়েছে, সারা সৃষ্টি জগতের মানুষ জেনে গেছে ওদের কথা। সৌর জগতের শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলো এবার তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করবে। আর তাতেও কাজ না হলে গ্যালাক্সির কু আর যাত্রীরা অসম্ভব জনপ্রিয়তা নিয়ে মরার সুযোগ পাবে।
৪. পানির গর্তে
চতুর্থ পর্ব – পানির গর্তে
৩২. ধনুকভাঙা পণ
সর্বশেষ খবর হল, বলছে ক্যাপ্টেন স্মিথ, তার নতুন যাত্রীদের প্রতি, গ্যালাক্সি ভাসছে এবং তার অবস্থাও বেশ ভাল। একজন ক্রু মেম্বার মারা গেছে, মহিলা স্টুয়ার্ড। বাকী সবার অবস্থা ভাল, নিরাপদেই আছে সবাই।
শিপের সব সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে । দু চার জায়গায় ছিদ্র থাকলেও সময় মতো সামলে নিয়েছে তারা। ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস বলেছেন আপাতত কোনো বিশেষ বিপদ নেই। কিন্তু বিশেষ বাতাসটা ভূমি থেকে আরো দূরে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, দিবাভাগের কেন্দ্রের দিকে। দিনের অংশে আশপাশের হাজারখানেক কিলোমিটারের বাতাস সারাক্ষণ সেদিকেই যায়, কারণ সেখান থেকে বাষ্পের সাথে সাথে বাতাসও গরম হয়ে উপরে ওঠে সব সময় লুসিফারের তাপে সিদ্ধ হয়ে । কিন্তু প্রব্লেমটা মেজর নয়। দেখে বোঝা যাচ্ছে বড়বড় বেশকিছু দ্বীপের মধ্যে কোনো কোনোটায় তারা গিয়ে ঠেকতে পারবে।
