এবং সেখানে, অবশেষে, একটা মোটামুটি সমতল এলাকা দেখা যাচ্ছে… যথেষ্ট সমতল… এই তার শেষ সুযোগ। কত কম সময়ে কত সুন্দর কাজ করতে জানে সে সেই প্রমাণটা এবার দেখাতে হবে।
অনেক কষ্টে সে দানবটাকে এগিয়ে নিল সেদিকে, অস্থির সিলিন্ডারটাকে সামনের পথের দিকে তাক করে নিল। মনে হয় তুষারে মোড়া… তাইতো, তুষার পড়ে আছে উপরে-ব্লাস্টের কারণে তুষার উড়ে যাচ্ছে–কিন্তু নিচে কী?-এবড়োথেবড়ো ভূমি নয়তো?-কাদার স্তরও হতে পারে-না, বরফের মতো দেখাচ্ছে নিশ্চই জমাট কোনো লেক-নিশ্চই-কতোটা পুরু?-কতো পু
গ্যালাক্সির পাঁচ হাজার টন হাতুড়ির আঘাত পড়ল। মূল জেটগুলো আপনজনের মতো আকড়ে ধরল ভূমি। এর উপর ছড়িয়ে পড়ল তেজস্ক্রিয়তার একটা রেখা, ভাঙতে শুরু করল বরফের বিশাল বিশাল আকৃতি, হঠাৎ মুখ উন্মোচিত হওয়া লেকের গায়ে ড্রাইভের আগুন-গরম অংশ লাগায় বরফ পরিণত হল বাষ্পে, বাস্পঝড় উঠল চারদিকে।
একজন দক্ষ এবং সুন্দর ট্রেনিং পাওয়া অফিসার হিসেবে চ্যাঙ সাথে সাথেই, সাড়া দিল, মনের বিবশ ভাবকে মোটেও ধর্তব্যে আনেনি। বাম হাতটা এক ঝটকায় সেফটি লক বার টেনে নিল নিজের দিকে, ডানটা ধরল লাল লিভার, টেনে তুলল উপরদিকে।
অ্যাবোর্ট নির্দেশনায় ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, প্রোগ্রামটা এই পর্যন্ত ঘুমিয়েই ছিল, জেগে উঠল সাথে সাথে, উল্টে গেল হিসাবের ছক, এবং স্পেসশিপ গ্যালাক্সি জেগে উঠল আকাশের বুকে; আবারও…
৩০. ভাঙা আমার তরী
মরণের মতো আঘাত হয়ে এসেছিল ফুল থ্রাস্টটা; ওয়ার্ডরুমে। আতঙ্কে অস্থির অফিসাররা দেখল তাদের নামার ভূমি মাকড়সা জালের মতো ভেঙে পড়েছে নিচের দিকে; তারা জানে, বাঁচার একটা মাত্র উপায় বাকী আছে, এবং-তাদের জানা মতে গ্যালাক্সিকে চালানোর জন্য সৃষ্টি জগতে শ্রেষ্ঠ মানুষটি আবারও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ায় একটা শ্বাসকে আসার অনুমতি দেয়া যায়।
কিন্তু আর কততক্ষণ ব্যাপারটা উপভোগ করা যায়? কেউ জানে না। শুধু চ্যাঙই জানে শিপের যথেষ্ট প্রোপ্যাল্যান্ট আছে কি না। কোনো স্থিত কক্ষপথে ওঠা যাবে কি যাবে না….
ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাসের চিন্তা অন্য, আগ্নেয়াস্ত্র হাতের সেই উন্মাদটা আবারও হয়ত নামার আদেশ দেবে, সেক্ষেত্রে? এবং পর মুহূর্তেই আবার মনে পড়ে গেল কথাটা, আর যাই হোক, রোজি ম্যাককোলেন আর যাই হোক, পাগল নয়। সে ঠিক ঠিক জানে কী করতে হবে। আফসোস, তাদের জানার সাথে মেয়েটার জানার কোনো মিল নেই।
তারপরই, হঠাৎ বদলে গেল ব্রাস্টের আচরণ।
নাম্বার ফোর থ্রাস্ট এইমাত্র বিকল হয়ে গেল। ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসার রিপোের্ট করল সাথে সাথে, আমি মোটেও অবাক হইনি। সম্ভবত উপরের দিকে…আসলে এ পরিস্থিতিতে বেশিক্ষণ টেকার কথাও নয়।
অবশ্যই, কোনো দিকনির্দেশনার ঠিক ঠিকানা নেই এখন। নিভু নিভু থ্রাস্টটা এখনো কন্ট্রোল প্যানেলের কথা মেনে চলছে, বাইরের দৃশ্য পাগলের মতো উল্টাপাল্টা হয়ে যাচ্ছে, যা হবার কথা… শিপ এগিয়ে যাচ্ছে এখনো, কিন্তু ভূমির সমান্তরালে নয়। পুরো গ্যালাক্সি একটা ব্যালাস্টিক মিসাইলে পরিণত হয়েছে মুহূর্তে, তার টার্গেট অজানা, এবং অজানা ইউরোপার বুকের দিকে লক্ষ্য করা।
আবারো থ্রাস্ট এলোমেলোভাবে শক্তি ছড়াল; মনিটর জুড়ে ভূমি আবার সমান্তরাল হয়ে গেছে।
বিপরীত মনিটরটা বন্ধ করে দিয়েছে চ্যাঙ, আমরা যেন পাগল না হই সেজন্যে… কিন্তু সে কি উচ্চতাটা ধরে রাখতে পারবে… ভদ্রলোক…।
দেখতে থাকা বিজ্ঞানীরা এ কাজের ভাল মন্দ বোঝেনি। বাস্তবকে সরিয়ে রাখলে কী এসে যায়? মনিটরের দৃশ্য পুরোপুরি চলে গেছে, সামনে শুধুই চোখ ধাঁধানো সাদা।
বাড়তি জ্বালানীটাও পুড়িয়ে দিচ্ছে।
এবং, তারপর থ্রাস্ট একেবারে থেমে গেল, মুক্ত পতন হচ্ছে শিপের। থ্রাস্টের তাণ্ডবের সময় বরফের অসীম গুড়া ছড়িয়ে পড়েছিল আশপাশের আকাশে, সেগুলো সাথে নিয়েই শিপ নেমে যাচ্ছে নিচে। তারপর যখন পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণের আটভাগের একভাগ আকর্ষণে মহাকাশতরী নিচের দিকে নামছিল, তাকে স্বাগত জানানোর জন্য ইউরোপার কেন্দ্রীয় মহাসাগর মুখব্যাদান করে ছিল প্রবল উৎকণ্ঠায়।
অন্তত চ্যাঙ একটা ভ্যাজাল থেকে বাঁচল, তাকে আর ল্যান্ডিং সাইট খুঁজে বেড়াতে হবে না। এখন থেকে অপারেশনাল সিস্টেম পৃথিবীর কোটি কোটি ভিডিও গেমারের গেম কন্ট্রোলের মতো হবে যারা কখনোই স্পেসে যায়নি, হয়তো কখনো যাবে না।
এখন তার কাজটা বেশ সরল এবং কঠিন, তার উপর এ গেমে গেম ওভারটা খুবই নিষ্ঠুর হওয়ার কথা। নামতে থাকা শিপের জেটগুলোকে শুধু পতনের বিপরীতে চালাতে হবে; জিরো মুমেন্টে জিরো মোমেন্টাম পেলেই খেলোয়াড় এ স্টেজে জিতে যাবে, এগিয়ে যাবে পরের স্টেজের দিকে। সাগরের উপরভাগ ছুঁয়ে দেয়ার মুহূর্তে পতন গতি যেন শুধু শূন্য হয় এটাই যে কোনো দক্ষ খেলোয়াড় (ভিডিওগেমের ক্ষেত্রে) এবং দক্ষ পাইলটের (স্পেস শিপের ক্ষেত্রে) একমাত্র লক্ষ্য। আমেরিকান স্পেসবিশেষজ্ঞরা আগের দিনে এভাবে নামাটাকেই সবচে নিরাপদ এবং নির্ভেজাল মনে করত। কিন্তু সেজন্যে শিপটাকে সেভাবেই ডিজাইন করতে হয়। আর না এর মালিকপক্ষ আমেরিকান, না চালকপক্ষ। কিন্তু সে যদি গত ঘণ্টা কয়েকের দক্ষতার পরও শেষ কাজটায় ব্যর্থ হয় তাহলে কোনো হোম এন্টার্নেইনমেন্ট কম্পিউটার বলবে না, স্যরি-তুমি ক্র্যাশ করেছ। আরেকবার চেষ্টা করবে? অ্যানসার-ইয়েস/নো…
