এগারো মিনিট। সে বলে উঠল হঠাৎ করে, যদি সে থ্রাস্ট না কমায়-বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। ধরা যায়, দশ কিলোমিটার উপরে ভেসে থাকবে, তারপর নামবে সোজা। সে কাজে আরো মিনিট পাঁচেক লাগার কথা।
সে আর বাড়তি কথা বলতে চায় না, তবু বলা যেত, সেই পাঁচ মিনিটের শেষ পলটাই সবচে বিপজ্জনক।
দেখেশুনে মনে হচ্ছে ইউরোপা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের মনেই রহস্যটুকু লুকিয়ে রাখবে; দেখতে দিবে না কাউকে। গ্যালাক্সি যখন স্থির দাঁড়িয়ে আছে, নামবে বরাবর নিচে, তখনো ঘন মেঘে মেঘে নিচের সব এলাকা ডুবে আছে। সাগর-ভূমি সব অদৃশ্য, কুয়াশা-মোড়ানো। তারপর বেশ কয়েকটা যন্ত্রণাময় মুহূর্তের জন্য ক্যামেরাগুলোয় বেরুতে থাকা ল্যান্ডিং গিয়ার ছাড়া আর কিছু দেখা যায়নি। এ জিনিস খুব-ই কম ব্যবহার করতে হয়। এখন, বেরুনোর সময় একটু অ্যালার্মের আওয়াজ করার সময় যাত্রীদের একটাই আশা, জিনিসটা যেন ঠিকমতো কাজ করে।
এই মরার মেঘ আর কত গভীর! নিজেকেই প্রশ্ন করল ভ্যান ডার বার্গ, একেবারে নিচে পর্যন্ত যাবে নাতো?
না, মেঘ হাল্কা হচ্ছিল এখন, কেটে যাচ্ছিল ভারী স্তর। এখন মেঘের দলেরা হাল্কা হাল্কা, কোথাও বিভক্ত।
তারপর, অনেকটা হঠাৎ করেই যেন সবার রক্ত ছলকে উঠল। ইউরোপা! মাত্র কয়েক হাজার মিটার নিচে চির রহস্যময়ী নতুন ইউরোপা ভাসছে, সত্যি সত্যি মাত্র কয়েক হাজার মিটার।
অবশ্যই, গঠন পুরোপুরি বদলে গেছে। ব্যাপারটা বোঝার জন্য ভূগোলবিদ হওয়ার দরকার নেই। চার বিলিয়ন বছর আগে, সম্ভবত, প্রাচীন পৃথিবী দেখতে ঠিক এমন ছিল। এবং সেই পৃথিবীতে সমুদ্র-ভূমির কালান্তরী কামড়াকামড়ির শুরু হয়।
কিন্তু এখানে? মাত্র অর্ধশত বছর আগেও না ছিল স্থলভাগ, না জল-শুধু বরফ আর বরফ। আর এখন লুসিফারের দিকে মুখ করা প্রান্তের বরফ গলে গেছে, তরল পানি বাষ্প হয়ে উঠে গেছে উপরদিকে, তৈরি করেছে অথৈ মেঘের স্তর, তারপর ভাসতে ভাসতে রাতের প্রান্তে যেতেই অকল্পনীয় ঠাণ্ডায় চিরদিনের জন্য জমা হয়েছে উল্টো পিঠে। এক মুখ থেকে আরেক মুখে বিলিয়ন বিলিয়ন টন পানি স্থানান্তরিত হওয়াতে এমন ভূমি জেগে উঠেছে যেখানে কোনদিন দূর-সূর্যের ক্ষীণ আলো পড়েনি।
তারপর, কোনো একদিন হয়তো এই ভূমি নরম হবে, ভরে উঠবে নমনীয় জৈবিক সৃষ্টিতে, ফলাবে ফসল । কিন্তু এখন তারা নাঙা। এখন সেখানে শুধু লাভা আর গরম কাদার স্তর। মাঝেমধ্যে নিচ থেকে উঠে আসে শক্ত পাথরের দল।
দেখে পষ্ট বোঝা যায়, এখানে আসলে স্থিরতা বলে কিছু নেই, সত্যিকার শক্ত বলে বড় কিছু নেই উপরিতলে; এখন যেটা ভূমি সেটাই হয়তো আসল সময়ে চিরস্থায়ী সাগরে পরিণত হবে, আর সাগর হবে ভূমি। একেই বলে টেকটোনিক যুগ। ব্যাপারটা বেশ ধাঁধায় ফেলে দেয়, এই এলাকায় কিনা প্রায় মাউন্ট এভারেস্টের মতো একটা পর্বতের উত্থান হয়েছে।
এইতো, সেই পাহাড়, অপ্রত্যাশিত উচ্চতায় জ্বলজ্বল করছে অবিরাম। রালফ ভ্যান ডার বার্গ বুকের কাছে কেমন যেন ব্যথা অনুভব করছে, আর গলার কাছে আটকে আসছে খাস। কোনো যান্ত্রিক-অসম্পূর্ণ চোখে মেঘের আড়াল থেকে লো রেজুলেশনে এক মুহূর্তের জন্য নয়, নিজের চর্মচক্ষুতে মাত্র দু-চার কিলোমিটার উপর থেকে দেখা যাচ্ছে স্বপ্ন পর্বত! তার স্বপ্ন পর্বত।
সে ভালমতোই জানে এর আকার প্রায় নিখুঁত চতুষ্কোণ, একটা মুখ প্রায় খাড়া। (এই নিচু গ্র্যাভিটিতেও এখানে ওঠাটা বেশ কষ্টকর হবে পর্বতারোহীদের জন্য…) ওদের দিকে ফেরানো মুখটা তুষারাবৃত আর গোড়া ঢেকে আছে মেঘের আড়ালে।
এটা নিয়েই কি এতো রাজা-উজির মারামারি হলো এতোদিন? কে যেন আড়াল থেকে বলে উঠল, দেখেশুনে তো মনে হয় একদম আটপৌরে… যদ্দুর মনে হয় আপনি একবার কোনো একটা… কথা শেষ না করেই রাগে বন্ধ করে দিল কথক।
এখন গ্যালাক্সি ধীরে ধীরে মাউন্ট জিউসের দিকে এগুচ্ছে, চ্যাঙ একটা ল্যান্ডিং সাইটের আশায় দেখছে আশপাশ। আরো মিনিট পাঁচেক ভেসে থাকার মতো প্রোপ্যাল্যান্ট জমা আছে শিপের গায়ে; তার পরও সে নিরাপদে ল্যান্ড করার একটা সুযোগ নিতে পারে, কিন্তু আবার ওঠা সম্ভব হবে না কোনোদিন।
প্রায় শতবছর আগে নিল আর্মস্ট্রং এমনই এক মানসিক অবস্থায় পড়েছিল; আর যাই হোক, তার দিকে নিশ্চই কোনো আগ্নেয়াস্ত্র তাক করা ছিল না সে সময়টায়…
এখন, গত পাঁচটা মিনিট ধরে তার না মনে আছে আগ্নেয়াস্ত্রের কথা, না রোজির কথা। আর আসলেই, মন-মগজ ঢুকে আছে পুরোপুরি কাজের ভিতরে। আক্ষরিক অর্থেই যে বিশাল যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণভার তার হাতে সেটারই এক অংশে পরিণত হয়েছে অবশেষে। মানবিক আবেগ বলতে একটা ব্যাপারই কাজ করছে তার মনে, ভয় নয়-কাজ কাজ আর কাজ। এ কাজের জন্যই সে এতো কষ্টে ট্রেনিং নিয়েছে, এবং জীবনে শেষবার হলেও কাজটা সে করতে চায় নিজের পেশাদারিত্বের প্রমাণসহ।
কিন্তু এখন তাই প্রমাণ করার পালা, পর্বতের পা আর মাত্র কিলোমিটারখানেক দূরে, এবং এখনো সে কোনো ল্যান্ডিং সাইট খুঁজে পায়নি। নিচে একটুও স্থিত ভূমি নেই। ছোটবড় খাদ আর খানাখন্দে ভরা চারদিক। তার উপর মহা উঁচুনিচু। একটা টেনিস কোর্টের মতো ছোট জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ফুয়েল গজের লাল দাগ ত্রিশ সেকেন্ডে ঠেকে গেছে।
