কিন্তু নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা দাবী করে না সে। নিজের বিশ্বাসটাকেই সত্য বলে মনে করে, সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু ঘটনার এমন অদ্ভুত ক্রমবিন্যাস অনেকটা নিউট্রনের বাড়তে থাকা চেইন রিয়্যাকশনের মতো হয়ে যাচ্ছে। সামান্য একটা নিউট্রন বেরিয়ে এসে পরমাণুর নগণ্য নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে ভেঙে দিবে, বেরুবে আরো দুটো নিউট্রন… কিন্তু তারপর? ছোষ্ট্র থেকে শুরু হয়ে ব্যাপারটা প্রলয়ে পরিণত হয়।
ক্রিস ফ্লয়েড কোন পক্ষের এখন এখানে কটা পক্ষ কাজ করছে? বান্ড নিশ্চই জড়িয়ে পড়েছে এর সাথে; অন্তত গোপনীয় কথাটা বেরিয়ে যাবার পর তারা কি আর
জড়িয়ে পারে? স্বয়ং বান্ডের ভিতরেই বোমার স্প্রিন্টারের মতো হাজারটা খুদে কিন্তু শক্তিমান অংশ লুকিয়ে আছে। তারপর বান্ডের বাইরে আরো কত পক্ষ যে আছে এবং থাকতে পারে আল্লা মালুম। রালফ ভ্যান ডার বার্গ যেন কোনো আয়না মহলে আটকে পড়েছে, চারদিকে খণ্ড খণ্ড আয়না আটকানো।
এমন কোনো উপায় নেই যেটা ভেবে সে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারে। ক্রিস ফ্লয়েডকে তার কানেকশনগুলোর দোহাইয়ের কারণে বিশ্বাস করা যেতে পারে। আমি সমস্ত টাকা বাজি ধরতে রাজি, ভাবল ভ্যান ডার বার্গ, সে এই মিশনের জন্য অ্যাস্ট্রোপোল থেকে নিয়োগ পেয়েছে, যদ্দিনের জন্যই হোক, অথবাধ্যাৎ, ব্যাপারটা এখন অন্যরকম হতে পারে…
আমি আপনাকে হেল্প করতে পারলেই খুশি হব, ক্রিস। ধীর লয়ে বলে গেল বিজ্ঞানী, যা সন্দেহ করছেন, ঠিক। আমার কিছু থিওরি আছে। কিন্তু সেগুলো এখনো এক্কেবারে বোকার হদ্দদের মতো শোনায়, এখনো…
আসল সত্যি জানতে আধ ঘণ্টাও লাগবে না। সে পর্যন্ত কিছু না বলাই ভাল।
তবে, তার কথা যদি সত্যি না হয় তো এমন কারো সাথে সে মরতে রাজি নয় যারা তাদের সর্বনাশের জন্য তাকেই দায়ী করবে।
২৯. থিতিয়ে পড়া
সেকেন্ড অফিসার চ্যাঙ কন্ট্রোল প্যানেলের সাথে কুস্তি লড়ে যাচ্ছে তখন এ থেকেই যখন সে অবিশ্বাসের সাথে সাথে স্বস্তির দৃষ্টি দিয়ে দেখল যে গ্যালাক্সি ভালভাবেই ট্রান্সফার অর্বিটে চলে এসেছে। পরের ঘণ্টা দুয়েক শিপটা সৃষ্টিকর্তার হাতে ছিল, অন্তত স্যার আইজ্যাক নিউটনের হাতে; ফাইনাল ব্রেকিং আসার পর ডিসেন্ট ম্যানুভার শুরু না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
সে রোজিকে বোকা বানানোর একটা ছোটখাট চেষ্টা করেছিল, উপগ্রহের সবচে কাছাকাছি এসে ভেক্টর বদলে আবার ঘুরে যাবার চেষ্টা আর কী! সেক্ষেত্রে শিপটা অন্য কোনো স্থিত কক্ষপথে বসে যেত, অন্তত গ্যানিমিড থেকে উদ্ধার শিপ আসার একটা সম্ভাবনা থেকে যেত তখন। কিন্তু এ কাজ করতে গেলে একটা মৌলিক সমস্যা থেকেই যাচ্ছে সব সময়, সেই উদ্ধারপর্যায়ে আর যাই হোক, সে উদ্ধার পাবার জন্য বেঁচে থাকবে না। চ্যাঙ মোটেও কাপুরুষ নয়, তারপরও গাধার মতো মহাকাশ হিরো হবার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।
ঘণ্টাখানেক ঘুরেফিরে দেখতে পারলেও একটা সুযোগ নেয়া যেত। কিন্তু সোজাসাপ্টা বলে দেয়া হয়েছে, এক হাতে তাকে পুরোপুরি অজানা এলাকায় তিন হাজার টনের একটা যানকে নামাতে হবে যে যানের ভারী কোথাও নামার কথা নয়। এমনকি পরিচিত চাঁদে হলেও (এবং চাঁদ মহা এবড়োথেবড়ো হলেও সে কাজটা করতে ভয় পেত না।
আপনার ব্রেকিং শুরুর কত মিনিট বাকী?
প্রশ্ন, নাকি আদেশ? সে সম্ভবত স্পেস টেকনোলজির প্রাথমিক সব ব্যাপারই জানে। আর চ্যাঙ তাকে নিয়ে যে বোকাটে ভাবনা ভেবেছিল তা নিয়ে বেশ লজ্জায় পড়তে হল তাকে, মনে মনে।
পাঁচ । আমি কি বাকী শিপকে শক্তি হতে বলব? জাস্ট এ ওয়ার্নিং।
আমিই বলছি। মাইকটা দিন… দিস ইজ দ্য ব্রিজ। উই স্টার্ট ব্রেকিং ইন ফাইভ মিনিটস। রিপিট, ফাইভ মিনিটস। আউট।
ওয়ার্ডরুমে জড়ো হওয়া বিজ্ঞানী আর ক্রুদের কাছে তথ্যটা পুরোপুরি জানা। তাদের একটা সৌভাগ্য আছে বলা যায়, এক্সটার্নাল ভিডিও মনিটরটা বন্ধ করা হয়নি। হয়তো রোজ ভুলে বসেছে। কিংবা হোড়াই পরোয়া করে। এখন, রোজির এই বদান্যতায় তারা বন্দী হিসেবে… আক্ষরিক অর্থেই বন্দী হিসেবে,.. তাদের মৃত্যুদূতকে উঠে আসতে দেখছে।
ব্যাপারটা যেন ফাঁসির আসামীর সাথে তুলনীয়, যমটুপি না পরানো আসামী তার দড়ির ফাঁসের দিকেই চেয়ে থাকবে সারাক্ষণ।
ইউরোপার নতুন চাঁদের মতো ক্ষীণ-বাঁকা তনু মেঘে মেঘে ছাওয়া; ভরে তুলছে রিয়ারভিউ ক্যামেরা। এই অতি ঘন বাষ্পধারে কোনো হাল্কা এলাকা নেই; সবই ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। ল্যান্ডিংটা রাডার নিয়ন্ত্রিত হবে, তাই এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তবে ব্যাপারটা দর্শকদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, যারা চর্মচক্ষুর উপর নির্ভর করে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উপগ্রহটাকে আঁতিপাতি করে খুঁজছে যে বিজ্ঞানী তার মতো করে আর কেউ রহস্য-দুনিয়াটার উঠে আসার ব্যাপার লক্ষ্য করছে না; যদিও চোখ খুলে দেখছে সবাই। র্যালফ ভ্যান ডার বার্গ মোলায়েম গদি আঁটা নন গ্র্যাভিটিক চেয়ারে নিজেকে বেল্ট দিয়ে আটকে রেখে বসে আছে। সে এতোই তন্ময় হয়ে ইউরোপার দিকে চেয়ে আছে যে ওজন বাড়ার ব্যাপারটা টেরই পায়নি।
সেকেন্ড পাঁচেকের মধ্যেই তারা ফুল ব্রাস্টে চলে গেল। সব ক্রু যার যার কমসেটে হিসাব কষতে শুরু করে দিল, কিন্তু কারোটাই নেভিগেশনের সাথে যুক্ত নয়। ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস শুধু চূড়ান্ত সময়টার অপেক্ষায় আছে।
