আর দু ঘণ্টাও বাকী নেই। বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ব। কেবিনে গেলাম। আমাকে ডেকে নেয়ার একটা সম্ভাবনা আছে এখনো। মি. য়ু, ব্রিজের দিকে দাঁড়ান, প্লিজ। কোনো উন্নতি দেখলে ডাকবেন।
জীবনে কখনো এতো অসহায় অবস্থায় পড়েনি সে। কিন্তু মানুষের জীবনে মাঝেমধ্যে এমন সময় আসে যখন কিছু না করাটাই একমাত্র করণীয় হয়ে দাঁড়ায়।
অফিসারদের কামরা ছেড়ে আসার সময় শুনতে পেল পিছনে কে যেন বলছে, আমার এক টিউব কফি হলেই চলবে। রোজির মতো এত সুন্দর কফি আর কাউকে বানাতে দেখিনি আমি।
হু, সে দারুণ সিরিয়াস। যে কাজই নিক না কেন, সুচারুভাবে করবে…
২৮. কথোপকথন
গ্যালাক্সিতে একজনই আছে যে পুরো ব্যাপারটাকে দুর্ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো হিসেবে নিতে জানে। আমি হয়তো মরতে বসেছি, কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে অমর হয়ে থাকার স্বর্ণদুয়ার খুলে গেল… নিজেকে বলছে ভ্যান ডার বার্গ। যদিও ব্যাপারটা বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব একটা কাজের কাজ হবে না, তবু এ ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকতে পারে!
ইউরোপায় আর কোনো গ্রহের সাথে তুলনা করার মতো কিছু নেই। ব্যাপারটা উল্টো হয়ে আসে তার কাছে, ইউরোপার সাথে তুলনা করার মতো আর কোনো গ্রহ-উপগ্রহ নেই…
এটাই তার তত্ত্ব-এবং এখনো ব্যাপারটাকে তত্ত্ব হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করে সে। কিন্তু খবরটা আর গোপন কোনো ব্যাপার নয়। বাইরে বেরুল কীভাবে কথাটা?
সে আঙ্কল পলকে বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করেছিল, তিনিই কি বিশ্বাসঘাতকতা করলেন? এমনো হতে পারে, কেউ রুটিনমাফিক তার কম্পিউটারের ডাটা পরীক্ষা করেছে। এমন কিছু হয়ে থাকলে বেচারা বুড়ো বিজ্ঞানীরও বিপদে থাকার কথা। যদি কোনোমতে তাকে সতর্ক করা যেত! কোনো একটা ইমার্জেন্সি ট্রান্সমিটার দিয়ে কমিউনিকেশন অফিসার গ্যানিমিডের সাথে যোগাযোগ করছে, সে জানে। পৃথিবীতেও যে কোনো মুহূর্তে খবরটা পৌঁছে যাবে, এক ঘণ্টারও আগে রওনা হয়ে গেছে সতর্কবাণী…
কাম ইন। নক করার শব্দ পেয়ে সে বলল, ও-হ্যালো! ক্রিস। কী করতে পারি আপনার জন্য?
সেকেন্ড অফিসার ক্রিস ফ্লয়েডকে দেখে সে বেশ অবাক হল। যদি কোনোমতে নামা যায় ইউরোপায়, সে ভাবল মন খারাপ করে, তাহলে প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে দেখতে পাবে আশপাশটা।
হ্যালো, ডক্টর। আমাদের মধ্যে আপনিই এ এলাকার বাসিন্দা। যদি কোনো সাহায্য করতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে কী করে কেউ কাউকে সহায়তা করে কে জানে! ব্রিজের শেষ খবর কী?
নতুন কোনো খবর নেই। য়ু আর জিলিংসকে ছেড়ে এলাম সেখানে। দরজায় একটা স্পিকার লাগানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কেউ কথা বলছে না ভিতরে। স্বাভাবিক। চ্যাঙ নিশ্চই মহাব্যস্ত।
সে কি নিরাপদে নামাতে পারবে?
সেই সেরা। কেউ যদি কাজটা পারে তো সে-ই পারবে। নামা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আবার উঠে আসাটাই আমার চিন্তার কারণ।
গড-এদ্দূর ভাবার দরকার নেই; এখন টিকে যাব, এই যথেষ্ট।
“টিকে যাব তার নিশ্চয়তা কোথায়? ভুলে যাবেন না, শিপটা অর্বিটাল অপারেশনের জন্য তৈরি হয়েছিল। কোনো বড় চাঁদের বুকে নামানোর কথা কখনো ভাবিনি আমরা। অ্যানাঙ্ক আর ক্যারমের সাথে যোগসূত্র বসানোর কথা মাথায় রাখা হয়েছিল তৈরির সময়, এই যা। তাই আকাশ থেকে ইউরোপার বুকে উতরে যাবার ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকে, তাও যদি চ্যাঙ ভাল জায়গার আশায় যথেষ্ট ফুয়েল নষ্ট করে, তাহলে।
কোথায় নামার চেষ্টা করবে জানেন নাকি? প্রশ্ন করল র্যালফ, অতি উৎসাহী সুর যাতে দেখা না দেয় সে ব্যাপারে সতর্ক সে। নিশ্চই লুকাতে পারেনি-কারণ ক্রিস তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে তার দিকে।
এখন বলার কোনো উপায় নেই। আপনিতো জানেন, অ্যারোব্রেকিং শুরুর আগে কিছু বলা যাবে না। আর এই চাঁদটাকে আমাদের চেয়ে অনেক ভাল জানেন আপনি। ঠিক কোথায় নামতে পারে?
একটাই ইন্টারেস্টিং এলাকা আছে। জিউস পর্বত।
সেখানে ল্যান্ড করতে চাওয়ার কারণ কি? শ্রাগ করল র্যালফ।
এ এলাকা নিয়েইতো আমাদের আগ্রহ জাগবে। দু দুটো দামী জিনিস খোয়াতে হল সেখানে।
দেখেশুনে মনে হচ্ছে আরো অনেক কিছু খোয়াতে হবে। আপনার কোনো আইডিয়া আছে নাকি?
আপনার বোধহয় পুলিশ বেশ পছন্দ.. সরল মনে বলে গেল ভ্যান ডার বার্গ। মজার ব্যাপার তো! একঘণ্টার মধ্যে দুবার কথাটা শুনতে হল আমাকে।
সাথে সাথেই কেবিনের পরিবেশ আমূল বদলে গেল। যেন লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের অবস্থা হেরফের হয়েছে কোনোভাবে।
“ওহ্-আমি ঠাট্টা করছিলাম, আসলেই?
যদি হয়েই থাকি, আর যাই হোক কখনো বলবো কি?
এটাতো কোনো জবাব হল না… আরে, অন্য অর্থে এটাই একটা জবাব…
সে পূর্ণদৃষ্টিতে তরুণ অফিসারের দিকে তাকালো-এই প্রথম নয়। তার গঠন গড়ন ঠিক পিতামহের মতো। কে যেন বলেছিল, ক্রিস ফ্লয়েড অন্য একটা শিপ থেকে গ্যালাক্সিতে জয়েন করে অন্য একটা মিশনে। অবশ্য সেই শিপটাও সুং নৌবহরের। ব্যাপারটা উৎসাহজনক। আবার স্পেস অফিসার হিসেবে ফ্লয়েডের কোনো সমালোচনা হয়নি কখনো। কিন্তু সেই দক্ষতার জোরেই অন্যান্য কাজে নিযুক্ত হওয়া অসম্ভব নয়। রোজি ম্যাককোলেনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। রোজির মতো সে-ও তো মিশনের আগ মুহূর্তে এখানে এসেছিল।
রালফ ভ্যান ডার বা প্রশ্নোত্তরের ক্ষেত্রে সরলমনা। সে একজন বিজ্ঞানী-আর বিজ্ঞানীরা প্রকৃতিকে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করে, উত্তর লুফে নেয়-মাঝখানে ঝোলাঝোলি তাদের কাছে সবচে অসহ্য বিষয়।
