সে কেবিনের ছোট্ট জানালায় লাগানো পর্দাটা জোরেসোরে সরিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়, তাকায় নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে, মোটামুটি জানা আছে ঠিক কোনদিকে শিপের মুখ থাকার কথা-যদি ব্যতিক্রমটা মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ ডিগ্রি হয় তবু দুটো সম্ভাব্য ব্যাপার ধরে নেয়া যায়।
গ্যালাক্সির ভেক্টর বদলে যাবে হয় বাড়ানোর জন্য, নয়তো কমানোর জন্য। ইউরোপায় নামার পথে এগুলোই হওয়ার কথা।
দরজায় বেশ অধৈৰ্য্য টোকা পড়ার শব্দ পেয়ে ক্যাপ্টেন বুঝতে পারল এক মিনিটেরও বেশি সময় ধরে কেউ আসার চেষ্টা করছে। চিকন প্যাসেজওয়েতে সেকেন্ড অফিসার ফ্লয়েড আর দুজন ক্রু ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।
দ্য ব্রিজ ইজ লভ, স্যার রিপোর্ট করল ফ্লয়েড, রুদ্ধশ্বাসে, ভেতরে যেতে পারছি না। চ্যাঙও কোনো সাড়া দেয়নি। কী হল, জানিনা কিছুই…
ভয় হচ্ছে, আমি বোধহয় জানি। সোজাসাপ্টা জবাব দিল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস, কোনো না কোনো পাগল এ কাজ করতই, আজ অথবা কাল। আমরা হাইজ্যান্ড হয়েছি। কিন্তু কেন? যদি জানতে পারতাম!
সে দ্রুত ঘড়িতে চোখ বুলিয়েই একটা ছোট্ট হিসাব কষে নিল।
এই থ্রাস্ট লেভেলে আমরা মিনিট পনেরোর মধ্যে অর্বিট ছেড়ে যাব। দশ মিনিট হলে নিরাপদ হতো। শিপের কোনো ক্ষতি না করে মূল ড্রাইভকে অকেজো করার কোনো উপায় আছে নাকি?
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেকেন্ড অফিসার যুকে বেশ অসন্তুষ্ট লাগছে, কিন্তু সাথে সাথে জবাব দিয়ে সে সাহায্য করল।
পাম্প মোটর লাইন থেকে সার্কিটগুলো তুলে ফেলা যায়, সেক্ষেত্রে প্রোপ্যাল্যান্ট সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে।
ওদের কাছে যাওয়ার কোনো উপায়?
হু-ডেক থ্রিতে সেগুলো সাজানো।
তাহলে চলুন।
“আরে… তখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্যাকআপ সিস্টেম দায়িত্ব তুলে নিবে। নিরাপত্তার জন্য সেটা ডেক ফাইভের একটা লক করা বাল্কহেডের পেছনে লুকানো থাকে। একটা কাটার দরকার পড়বে, না… সময় মতো শেষ করা সম্ভব নয়।
এই ভয়ই পাচ্ছিল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস। গ্যালাক্সির ডিজাইনার মেধাবী লোকগুলো শিপটাকে সব রকমের সম্ভাব্য দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচানোর পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করেছিল। কিন্তু মানব-শত্রুর হাত থেকে পুরোপুরি বাঁচানো কখনোই সম্ভব নয়।
কোনো বিকল্প?
এখন নেই, যতটুকু বুঝতে পারছি।
তাহলে চলুন, ডেকের দিকে যাই। চ্যাঙ আর তার সাথে যে-ই থাক না কেন, কথা বলার চেষ্টা করতে হবে।
এবং কে হতে পারে? তার নিয়মিত ক্রুদের কারো এমন মতিভ্রম হওয়া অসম্ভব। বাকী থাকে… হু, এখানেই জবাব লুকিয়ে আছে। পাগল বিজ্ঞানীদের অ্যাচিভমেন্টের শেষ চেষ্টা যেমন হয়…
ঠিক, ড. অ্যান্ডারসন নোবেল প্রাইজটা লুফে নেয়ার শেষ চেষ্টা করছে।
ধারণাটা ভেঙে গেল হাঁপাতে থাকা বিজ্ঞানীর কণ্ঠ শুনে, খোদার কসম, ক্যাপ্টেন, কী হল! ফুল থ্রাস্ট চলছে! কোনদিকে যাচ্ছি? উপরে না নিচে?
নিচে। বলল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস, দশ মিনিটের মধ্যে ইউরোপাকে ক্রস করছে এমন একটা অর্বিটে পৌঁছে যাব। একটাই আশা, কন্ট্রোলে যে আছে সে যদি যা করছে তার মানেটা বুঝতে পারে…
তারা এখন ব্রিজে, বন্ধ দুয়ারের অপর পাশে।
ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস তার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, সর্বশক্তিতে। দিস ইজ দ্য ক্যাপ্টেন! লেট আস ইন!
সে এরপরই ব্যাপারটা বুঝল, অবশ্যই অমান্য করা হবে এমন কোনো আদেশ জোরগলায় দেয়াটা বোকামী। কিন্তু এমন অবস্থায় সাধারণত একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় অপরাধী, এবং কোনো না কোনো জবাব দিয়ে বসে। ঠিকই, সে জবাব পেল।
বাইরের স্পিকার হিসহিসিয়ে উঠেছে, তারপরই ভেসে এল একটা কণ্ঠ, বোকার মতো কিছু করে বসবেন না, ক্যাপ্টেন। আমার হাতে একটা গান আছে, আর মি. চ্যাঙ আমার আদেশমতোই কাজ করে যাচ্ছেন।
কে রে? ফিসফিস করে উঠল একজন ক্রু, মহিলার কণ্ঠ মনে হল!
অবশ্যই। বলল কাপ্তান। আর সব সন্দেহ ঝেড়ে ফেলা গেলেও মূল সমস্যার কোনো সমাধা হচ্ছে না।
কী করতে পারি আমরা? তুমি কী আশা কর? এ শিপটা নিয়ে তুমি সম্ভবত বেরিয়ে যেতে পারবে না, জানতো? একটু কর্তৃত্বের সুর ফুটিয়ে তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা তার গলায়।
ইউরোপায় নামতে যাচ্ছি আমরা। আর, আবার কখনো টেক অফ করার ইচ্ছা থাকলে আমাকে থামানোর চেষ্টা করবেন না।
তার রুম পুরোপুরি পরিষ্কার। ত্রিশ মিনিট পর সেকেন্ড অফিসার ক্রিস ফ্লয়েড রিপোের্ট করল। এতোক্ষণে থ্রাস্ট থেমে গেছে, কিন্তু বাকীটা ভবিতব্য। বাঁকা কক্ষপথ ধরে শিপ সোজা ইউরোপায় ঢুকবে। এখন ইঞ্জিন নষ্ট করা সম্ভব-কিন্তু কাজটা আত্মহত্যার শামিল। বরং জিনিসপাতি ঠিকঠাক থাকলে পরে কখনো ওড়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
রোজি ম্যাককোলেন! কে বিশ্বাস করবে এ কথা! আপনার কী মনে হয়, ও নেশা-টেশা করেনিতো?
জবাব দিল ফ্লয়েড, না। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একাজ করা অসম্ভব। খুব সূক্ষ্মভাবে প্ল্যান করা হয়েছে। শিপের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো লুকানো রেডিও পাওয়া যাবে। সেটা খুঁজে পেলেই বরং ভাল হবে আমাদের জন্য। কু পেতেও পারি…
আপনার কথাবার্তা ঠোলাদের মতো লাগছে। জানেন তো, পুলিশের অজনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়?
যথেষ্ট হয়েছে, ভদ্রমহোদয়গণ! বলল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস। ধৈৰ্য্য টলে যাচ্ছে সবার। তার উপর কেউ কন্ট্রোলের সাথে কথা বলতে পারছে না। সে আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকালো।
