স্যরি। হঠাৎ বুঝতে পারল সেকেন্ড অফিসার, হুঁশ ফিরে পেয়েই বলল, তোমাকে আটকে রাখাটা ঠিক হয়নি।
ও, না! ব্যাপারটা দারুণ ইন্টারেস্টিং। বলে যান, প্লিজ।
না-না। অবশ্যই নয়। অন্য এক সময় বাকীটা বলব। গুডনাইট রোজি… আর, থ্যাঙ্কস ফর দ্য কফি।
গুডনাইট, স্যার।
স্টুয়ার্ড থার্ড ক্লাস রোজ ম্যাককোলেন ভেসে চলল (খুব একটা দক্ষতার সাথে নয়) খোলা দরজার দিকে। বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনে চ্যাঙ ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না।
কিন্তু একটু পরই একেবারে অপরিচিত কণ্ঠ শুনে চমকে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তার। নারীকণ্ঠ, সন্দেহ নেই, এবং রোজিরই কন্ঠ, কিন্তু কেমন যেন কাঠ কাঠ।
মি. চ্যাঙ, অ্যালার্ম বাটন চাপার কষ্টটা করবেন না। ডিসকানেক্ট করে দেয়া হয়েছে অনেক আগেই। ল্যান্ডিং কো অর্ডিনেট দেখাচ্ছি, শিপ নামিয়ে নিন।
ধীরে, যেন কোনো দুঃস্বপ্নে চেয়ার ঘোরালো চ্যাঙ। মনে হচ্ছে দৃশ্যটা কোনো শ্বাসরুদ্ধকর অ্যাকশন মুভির অংশ-সে এখুনি পপকর্ন চিবুতে চিবুতে চেয়ার ছেড়ে উঠবে, তারপর মুভি দেখা বন্ধ করে গ্যালাক্সির পরবর্তী ফ্লাইটের খবর নেবে।
গোলাকার হ্যাঁচওয়ের পাশে রোজি ম্যাককোলেন নামে পরিচিত মেয়েটা ভাসছে দরজার লকিং লিভারে হাত রেখে নিজেকে স্থির করে রেখে। মেয়েটার সবকিছুই যেন বদলে গেল মুহূর্তের মধ্যে। এক পলকেই তাদের পদাধিকারও যেন পাল্টে গেছে। লজ্জাবনত স্টুয়ার্ড, যেম কখনো সরাসরি চ্যাঙের চোখের দিকে চোখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত সেই কিনা এমন ঠাণ্ডা, নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যে চ্যাঙের নিজেকে সেই ইঁদুরের মতো মনে হল যেটা সাপের শিকারে পরিণত হবে জেনেও নড়তে পারছে না, কারণ সাপ তার দৃষ্টি এবং মাথার দোলা দিয়ে সম্মোহিত করে রেখেছে খেয়ে ফেলার ঠিক আগ মুহূর্তটায়। তার হাতের ছোট্ট কিন্তু কার্যকর অস্ত্রটাকে একেবারে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল, এটা না থাকলেও তার কথা এবং ব্যক্তিত্ব পরিবেশের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিত। চ্যাঙের কোনো সন্দেহ নেই মেয়েটা চাইলে এ অস্ত্র ব্যবহার না করেই তাকে নিশ্চিন্তে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
অনন্তর, তার আত্মসম্মান আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ঠিক করল, যাই হোক-বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র-মেদিনী। আর কিছু হোক না হোক, কিছুটা সময় বের করে নেয়া যায় ।
রোজ, সে বলল, এবং হঠাৎ বেখাপ্পা নাম উচ্চারণে ঠোঁট কেমন যেন অকেজো হয়ে আসে, কী অদ্ভুত ব্যাপার! এইমাত্র তোমাকে যা বলেছি, কথাগুলো মোটেও সত্য নয়। নিজে নিজে আমার পক্ষে আর যাই করা সম্ভব হোক না কেন, শিপ ল্যান্ড করানো অসম্ভব। সঠিক অর্বিট হিসাব করে বের করতেই ঘণ্টার পর ঘন্টা লেগে যাবার কথা। সেই সাথে সাহায্যকারীর দরকার পড়বে, অন্তত একজন কো পাইলট।
অস্ত্রের মুখ একটুও নড়ল না।
“আমি বোকার হদ্দ নই, মিস্টার চ্যাঙ। পুরনোদিনের রকেটের মতো এ শিপ মোটেও এনার্জি-লিমিটেড নয়। ইউরোপা থেকে উঠে আসার জন্য সেকেন্ডে মাত্র তিন কিলোমিটার স্পিড দরকার। মেইন কম্পিউটার নষ্ট অবস্থায় ল্যান্ড করাটা আপনাদের বেসিক ট্রেনিংয়ের অংশ। আপনি এখন ভালোয় ভালোয় সেটা প্র্যাকটিস করতে পারেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরিবর্তন দেখতে চাই, ব্যস।
এ ধরনের কাজে, মনটাকে যথাসম্ভব মিষ্টি রাখার চেষ্টা করল চ্যাঙ, নয়তো মিষ্টি কথা বেরুবে না, ব্যর্থতার সম্ভাবনা পঁচিশ পার্সেন্ট। সত্যিকার হারটা আসলে শতকরা দশভাগ, আর ব্যাপারটার চর্চা নেই আমার অনেক বছর হল।
সেক্ষেত্রে, বলল রোজি ম্যাককোলেন, আমার আপনাকে আক্ষরিক অর্থে নির্জীব করে ক্যাপ্টেনের সহায়তা আশা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ব্যাপারটা বিরক্তিকর, কারণ আমরা এই জানালাটা হারাব, আর পরবর্তী সুযোগের জন্য আরো ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে। চার মিনিট বাকী।
সেকেন্ড অফিসার চ্যাঙ জানতো, খেল খতম। কিন্তু শেষ চেষ্টা করতে দোষ নেই।
কো-অর্ডিনেটগুলো দাও…
২৭. রোজি
অ্যাটিচ্যুড কন্ট্রোল জেটের প্রাথমিক ধাক্কার শব্দেই ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস জেগে উঠল। শব্দটা তেমন জোরালো নয়, যেন কোনো কাঠঠোকরা দূর থেকে গাছ ঠুকে চলেছে একটু একটু করে। প্রথমেই মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু না-শিপ এগিয়ে যাচ্ছে স্পেসের ভিতর দিয়ে, পরিবর্তন করছে দিক।
সম্ভবত কোনো একদিক একটু বেশি গরম হয়ে যাওয়ায় থামাল কন্ট্রোল সিস্টেম আপনাআপনি ছোটখাট কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট করে নিচ্ছে। এমনটা ঘটে খুব কম, এবং ঘটলে ধরে নেয়া হয় অফিসার অন ডিউটি ব্যর্থ হয়েছে, কারণ তাপীয় ইনভেলাপ পরিবর্তনটা তার চোখে পড়ার কথা।
ইন্টারকম বাটনে চাপ দিয়ে জানতে হবে কে এমনটা করছে… মি. চ্যাঙ ব্রিজে আছেন… তার হাত কখনোই কাজটা শেষ করেনি।
ওজনহীনতায় অনেক অনেক দিন কাটানোর পর সাধারণ মাধ্যাকর্ষণের দশভাগের একভাগই বেশ আঘাত হিসেবে আসে। ক্যাপ্টেনের মনে হল ব্যাপারটা বেশ কমিনিট ধরে ঘটছে যদিও এতোক্ষণ লাগার কথা নয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। কিন্তু সেফটি হার্নেস থেকে গা ছাড়িয়ে নিতে নিতেও ব্যাপারটা থামছে না কেন? এবার বাটনটা পেয়েই সে চেপে ধরল, কিন্তু কোনো জবাব নেই।
জিনিসপত্র এমিতে বেঁধেছেদে রাখা হলেও ওজনহীনতার দিনগুলোতে ব্যাপারটা একটু ঢিলেঢালাভাবে এবং অন্যপথে করা হয়। জিনিসপত্র বেশ ধীরে ধীরে পড়ছে, কিন্তু চমকে যাবার মতো ব্যাপার হল-আসল ড্রাইভ তার মূল জেটটায় প্রজ্বলন ঘটিয়েছে, পূর্ণ শক্তিতে….
