আমার শুধু একটাই আশা, ডক্টর-ইউরোপানরা যেন পর্বত বেয়ে উপরে না যায়। আমি তাদের স্থানীয় পর্বতের গায়ে পতাকা এঁটে দেয়ার পথে বিন্দুমাত্র বাঁধা দেখতে চাই না।
.
পেনিট্রোমিটার ছাড়ার পর পরই গ্যালাক্সি জুড়ে কেমন একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি অপ্রতিরোধ্য যে কৌতুকগুলোর চর্চা সর্বক্ষণ চলতেই থাকে, সেসবও কেমন থিতিয়ে এল হঠাৎ! আসলে পোব নামার এই লম্বা দুই ঘণ্টা ক্রুর সবাই একটা কাজের ছুতো পেয়ে উত্তেজনা ভোলার পথ পেল। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে কন্ট্রোল রুম আর ব্রিজের দিকে। পনেরমিনিট আগে ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস সবাইকে সরিয়ে দিল শুধু নতুন স্টুয়ার্ডেস রোজি আর তার আনা চমৎকার কফির টিউবের সেখানে থাকা বৈধ।
সব ঘটে গেল একেবারে ঠিকমতো। বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সাথে সাথে, এ্যারোব্রেকিং প্রযুক্তি চালু হয়ে গেল গতি একটু কমিয়ে আনার লক্ষ্যে। টার্গেটের রাডার ইমেজ দেখেশুনে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মাপার কোনো উপায় যেন নেই। বড় হচ্ছে, আরো আরো বড় হচ্ছে। তারপর মাইনাস ওয়ান সেকেন্ডে সব রেকর্ডারের কাজের গতি বেড়ে গেল হাজার গুণ…
কিন্তু রেকর্ড করার মতো কিছুই নেই।
এবার আমি বুঝলাম, বলল ড. অ্যান্ডারসন, বিমর্ষনে, প্রথম রেঞ্জাররা চাঁদের বুকে নিজেদের সবসুদ্ধ ভেঙে পড়ার সময় কী কষ্ট পেয়েছিল।
২৬. রাতের আকাশ
একমাত্র সময়ই সারা সৃষ্টিজগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাত আর দিন একেবারে স্থানীয় হিসাবের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা যায়। এই এলাকায় জোয়ারের সাথে ঘূর্ণনের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মানুষ তার ঘরের কোণা ছেড়ে যত দূরেই যাক না কেন, তার সেই চিরাচরিত দিন-রাতের হিসাব কখনো ভুলতে পারবে না।
তাই, সেকেন্ড অফিসার চ্যাঙ ইউনিভার্সাল টাইম রাত একটা পচে যখন ব্রিজে দাঁড়ানো তখন পুরো গ্যালাক্সি ঘুমিয়ে কাদা। তারও জেগে থাকার কোনো মানে হয় না। সে বুঝে ওঠার আগেই গ্যালাক্সির ইলেক্ট্রনিক সেন্সর টের পেয়ে যাবে যে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি। তবু, অপ্রত্যাশিতের সাথে লড়ার ক্ষেত্রে মানুষ সব সময় যন্ত্রের চেয়ে এক কাঠি বাড়া-সাইবারনেটিক্সের এক শতাব্দী এ কথাটা প্রমাণ করে বসেছে। আর এখন বা তখন-অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ঘটবেই।
কফি কোথায়? ভাবল চ্যাঙ বিরক্ত হয়ে, রোজির তো দেরি হবার কথা নয়। গত চব্বিশ ঘণ্টার ব্যর্থতায় ক্রু আর বিজ্ঞানীদের মনে যে দক্ষযজ্ঞ চলছে তার কোনো আসর স্টুয়ার্ডের উপরও পড়েনিতো!
প্রথম পেনিট্রোমিটারের ব্যর্থতার পর করণীয় নিয়ে দ্বিতীয় একটা মিটিং বসেছিল। পরের মিটারটা ক্যালিস্টোর জন্য ঠিক করা ছিল, তাতে কী? কোন্ মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে সেটা এখানে ব্যবহার করলে?
যাই হোক, যোগ করেছিল ড. অ্যান্ডারসন, আমরা কোনোমতে ক্যালিস্টোর উপর ল্যান্ড করতে পারি। সেখানে ভাঙা বরফের টুকরা ছাড়া আর কী পাব?
কোনো দ্বিমত ছিল না। ক্যালিস্টোর জন্য পেন-প্রোবের কোনো দরকার নেই, সেখানে নামা যাবে। এখানে তৃতীয়টা ফেলে দেয়া যায়।
ঘণ্টা কয়েক প্রস্তুতির পর শেষটা নিক্ষেপ করা হল ইউরোপার বুকে; সেটাও পূর্বপুরুষের অদৃশ্য পথ ধরে এগিয়ে গেল নিচের রহস্যঘেরা মেঘের দিকে।
এবার শিপের রেকর্ডার কিছু তথ্য পেল ঠিকই, এক মিলি সেকেন্ডের অর্ধেক সময়ের জন্য! অ্যাক্সিলারেটোমিটার বিশ হাজার জি তেও কাজ করার কথা, সেটা নষ্ট হয়ে যায় এবার। নিশ্চই একটা চোখের পলক পড়ার হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে সব ধসে গেছে।
পরে, সাথে সাথেই পৃথিবীতে খবর পাঠানো হল, জবাব আসার আগে উচ্চ অর্বিট ধরে ঘোরাফেরা করবে তারা। আরো কিছু করার ইচ্ছা তাদের আছে, তবু পৃথিবীর এক-আধটু নির্দেশনা জরুরী।
স্যরি স্যার, দেরি হয়ে গেল। বলল রোজি ম্যাককোলেন। (কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি যে তার হাতের কফির চেয়ে সামান্য বেশি কালো তার গায়ের রঙটা।)
আমি স্যার নিশ্চই অ্যালার্মটা ভুল করে সেট করেছিলাম।
আমাদের দুজনেরই ভাগ্য ভাল। একটু বাঁকা হাসি দিল চ্যাঙ, যে তুমি শিপটা চালাচ্ছ না।
আমার মাথায় ঢোকে না কী করে কেউ এটাকে চালায়… সাথে সাথে বেশ ভদ্রভাবে জবাব দিল সে, …জিনিসটা বড়ই জটিল।
দেখে যতটা মনে হয় আসলে কিন্তু ততটা খারাপ নয়, রোজি। তার উপর বেসিক ট্রেনিং কোর্সে সবকিছু জানিয়ে দেয়ার কথা, তাই নয় কি?
আ… হ্যাঁ। কিন্তু আমি বেশিরভাগই বুঝে উঠতে পারিনি কখনো। অর্বিট আর যত্তসব ফালতু কথা…।
চ্যাঙ বুঝতে পারছে সময় নষ্ট করা ছাড়া লাভের লাভ কিছু হবে না। তার উপর রোজ ঠিক তার টাইপের নয়। যেটা চ্যাঙের সারা জীবনের ভালবাসা, সেটারই মাথামুন্ডু কিছু বোঝে না এবং বুঝতেও চায় না মেয়েটা। এ নিয়ে আফসোসের কী আছে? সবারতো আর এক বিষয়ে আগ্রহ থাকবে না… তবু, মেয়েটা বেশ আকর্ষণীয়। না, বেচারিকে আটকে রাখার কোনো মানে নেই। হয়তো ও ঘুমাতে চাচ্ছে।
বিশ মিনিট পরে, সেকেন্ড অফিসার চ্যাঙ নেভিগেশন কনসোলের ব্যাপারগুলো দেখিয়ে কথা শেষ করল: তো, বুঝতেই পারছ, জিনিসটা আসলেই পুরোপুরি অটোম্যাটিক। তোমার শুধু দু-চারটা নম্বর টিপতে হবে, বাকীটা শিপের হাতে ছেড়ে দিলেই হল।
রোজকে বেশ বিরক্ত দেখাচ্ছে; সারাক্ষণ চেয়ে আছে হাতের ঘড়ির দিকে।
