বলা বাহুল্য, আফ্রিকানরা ব্যাপারটাকে হাল্কা করে নেয়নি। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তারাও নিজেদের অফিশিয়াল কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস গঠন করে। তাদের কাজের ক্ষেত্র যথারীতি স্বাধীন; এর জন্য তেমন একটা জবাবদিহিতা করতে হয় না অপারেটরদের। এবং জ্ঞানী লোকের মতো আফ্রিকানরাও তাই শাকার ব্যাপারে কিছু জানে না। তারা হয়তো সি আই এর সেই বিখ্যাত অস্বীকার নীতিকে নিজেদের আদর্শের ভেতরে নিয়েছে। এ-ও হতে পারে, তা কথা সত্যি।
এক উৎসের মতে, শাকা আসলে একটা কোডওয়ার্ড। তারপর হয়তো এ নাম জনপ্রিয় এবং কার্যকর হয়ে যাবার পর কাজ শুরু হয়ে গেছে সাথে সাথে। একটা বিষয় গোয় ধরার মতো, কেউ কোনোদিন ধরা পড়ার পর বলেনি যে সে শাকার এজেন্ট বা অপারেটর।
এ কথার অন্যরকম ভয় ধরানো ব্যাখ্যাও থেকে যায়, হয়তো তারা ধরা পড়তে জানে না। জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাবনা দেখা যাবার সাথে সাথে নিজেদের ধ্বংস করে ফেলার মতো মন-মানসিকতা সিক্রৈট এজেন্টের এম্নিতেও থাকে, তার উপর মানসিকভাবে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তুললেতো কথাই নেই।
সত্যি যাই হোক না কেন, কেউ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি যে দুশ বছর আগে জীবন দেয়া সামান্য কিন্তু বীর সেই জুলুর নামে সারা দুনিয়ায় এমন শত শত জুলু ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং একইভাবে কাজ উদ্ধারের আশায় জীবন লুটিয়ে দিতে পারে।
সেই উপজাতীয় লোকটাও নিশ্চই ভাবেনি।
২৫. কফিনে মোড়ানো ভুবন
বিস্ফোরণের পর পর এক-দু দশক বৃহস্পতির সেই শ্বাসরুদ্ধকর নিষেধাজ্ঞার কথা মনে করে কখনোই ইউরোপাকে ঘটানো হয়নি। এরপর চীনারা মেঘের উপর দিয়ে দ্রুত উড়ে যায় একবার; শুধু তাদের সেই জিয়াং এর ধ্বংসাবশেষকে একটু চিনতে পারার আশায়।
শিপটাকে তারা পায়নি, কিন্তু তাদের হাতেই প্রথমবারের মতো উপগ্রহটার দিবা ভাগে বরফের আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠা নতুন নতুন মহাদেশের একটা মোটামুটি চিত্র ধরা পড়েছে।
এমনকি একটা নিরেট, দু কিলোমিটার জুড়ে থাকা বস্তুর সন্ধান পেয়েছে সেখানে; ঠিক যেন চীনের দেয়ালের মতো নিরেট। এমন গঠনের কারণেই সেই মনোলিথটার মতো মনে হয় জিনিসটাকে, কিংবা সেই লাখো মনোলিথের জোড়া ভাই-যারা বৃহস্পতি ভেঙে লুসিফার গঠন করেছিল।
যাই হোক, কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। না ছিল বুদ্ধিমত্তার কোনো সংকেত। অবশ্য সুস্থির ভারী মেঘের নিচ থেকে সভ্যতার চিহ্ন দেখতে হলে অন্তত ছ হাজার বছর আগে মানুষ যতটুকু সভ্য ছিল-প্রাণীদের ততটুকু সভ্য হতে হবে। তাহলেই পিরামিড আর রাজমহল দেখে বোঝা সম্ভব। কিন্তু বিপদ দেখা দেয়নি। সুতরাং স্থায়ী সার্ভে স্যাটেলাইট বসানোয় কোনো বাধা ছিল না। বাতাসের ধরন দেখার জন্য দু একটা বেলুন পাঠানোও দোষের নয়। বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখে ইউরোপার মধ্যখানে একটা সুন্দর সাগর জেগে উঠছে, চারপাশে জাগছে ভূমি, আর আছে একটা স্থির সূর্য-যেমনটা দেখা যায় বাচ্চাদের টেক্সট বুকে।
এবং, তখন থেকেই শুরু ইউরোপান রোলেট। প্রশাসনের লোকেরা ব্যাপারটাকে নিষ্ঠুর জুয়া খেলা বলেই মনে করে বিজ্ঞানীরা একটু একটু করে কাছে যাচ্ছে, একটু একটু করে সাহস বাড়াচ্ছে, সেই সাথে বাড়ছে ঝুঁকি।
পঞ্চাশটা ঝুঁকিহীন বছর পেরিয়ে আসার পর ব্যাপারটা বেশ বোরিং হয়ে গেল। ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস আশা করে ব্যাপারটা তেম্নি থাকবে, আর তার উপর ড. অ্যান্ডারসনের নিশ্চয়তা তো আছেই।
পার্সোনালি নিতে গেলে, বলল ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস, আমি ব্যাপারটাকে একটু অ-বন্ধুসুলভ বলে ধরে নিব। বিশেষত যদি টনখানেক এক্সপ্লোসিভসহ একটা জিনিস হাজার কিলোমিটার গতিতে আমার বুকে নেমে আসে তো কথাই নেই। ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল যে আপনাকে অনুমতি দিয়েছে দেখেশুনে আমি বেশ অবাক হলাম।
ব্যক্তিগতভাবে ড. অ্যান্ডারসনও কম অবাক হয়নি। কিন্তু ব্যাপারটা এসেছে অন্যভাবে। এক শুক্রবারের অলস বিকালে বিশাল সায়েন্টিফিক লিস্টের নিচের দিকে একটু অবহেলা আর অসম্পূর্ণ করে ব্যাপারটাকে তুলে ধরা হয়। তবু চোখ এড়ানোর কথা নয়, কীভাবে এড়ালো আল্লা মালুম।
“আমিও একই কথা বলি, ক্যাপ্টেন। কিন্তু আমাদের কাজকর্ম অনেক শক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ঘটছে। এবং আসলে ঐ… কী বলে… ইউরোপানদের দিনযাপনে নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই, তারা যা-ই হোক না কেন। আমরা সি লেভেলের পাঁচ কিলোমিটার উপরে একটা টার্গেটে এইম করব।
ও, বুঝলাম। মাউন্ট জিউস নিয়ে মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই।
জিনিসটা আগাগোড়া রহস্যে মোড়া। এমনকি মাত্র কয়েক বছর আগে সেখানে ছিলই না। বুঝতেই পারছেন, কেন ভূগোলবিদরা এমন পাগল হয়ে গেছে এটা নিয়ে।
এবং আপনাদের ঐ দূতটা নেমে যেতে যেতে পর্বতকে বিশ্লেষণ করবে, এইতো?
ঠিক তাই। আপনাকে বলা ঠিক হচ্ছে না, তবু, আমাকে সমস্ত রিপোর্ট গোপন রাখতে হবে। কোড করা অবস্থায় পাঠাতে হবে পৃথিবীর বুকে। আর কেউ একজন বেশ বড় একটা আবিষ্কারের পথে আছে, সে চায় না প্রকাশনার কাছে হেরে যেতে। আপনার বিশ্বাস হয়, বিজ্ঞানীরা এতো চাপা স্বভাবের হতে পারে…
ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস বেশ সহজেই ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারে। যত সময় যাচ্ছে ততই কাপ্তান দেখছে, বেচারা ড. অ্যান্ডারসন মিশন সম্পর্কে খুব একটা জানে না।
