সব প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেয়া হয়েছে-এমন বোঝার পরই ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস সায়েন্টিফিক টিমের কাছে মাফ চেয়ে নিল। বলল, তার সবটা সতর্কতাই শুধু শিপ ও যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নেয়া হয়েছে, আর বেচারা কী করবে, তাদের এমনভাবে ট্রেনিং দেয়া হয় যে সহজাত প্রবৃত্তির জোরেই হাজারটা প্রশ্ন করে বসে, খুঁতখুঁতে ভাব যায় না।
সে একটু আশ্বস্ত বোধ করছে, ড. অ্যান্ডারসনের কথা হয়তো সত্যি। কিন্তু এরই মধ্যে মিশন নিয়ে ঘাপলা বসে গেছে মনে। স্পেস ক্যাপ্টেনদের মনকে ঘষে ঘষে এমন করে তোলা হয় যে তারা বাতাস থেকেই বিপদের গন্ধ শুঁকতে জানে।
কিন্তু ঠিক কতটা বেখাপ্পা যে হবে তা সে এখন কল্পনাও করতে পারছে না।
২৩. নরকের আগুন
বিস্ফোরণের আগে সৌরজগতে শুক্রের পর আইওই দোজখের সবচে কাছাকাছি এলাকা ছিল বৃহস্পতি। কিন্তু বৃহস্পতির নবরূপ লুসিফার এখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথম নির্বাচিত, অবশ্যই সৌরজগতপতি সূর্যকে হিসাবের বাইরে রাখতে হবে।
লুসিফারের জন্মের পর আইওর ক্ষমতা বেড়ে গেছে কয়েকশো ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে। এখন এর সাথে শুত্রু মোটেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। সালফার আগ্নেয়গিরি আর উষ্ণ প্রসবণগুলো তাদের কার্যক্ষমতা কয়েকগুণ করেছে। আজকাল এর চেহারা দশকে দশকে বদলায় না, বরং বছরখানেক সময়ই যথেষ্ট। ম্যাপ বানানোর কোনো চেষ্টাই করে না এখন আর গ্রহবিদের দল। বরং কয়েকদিন পর পরই অর্বিটাল ফটোগ্রাফ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের। এ থেকে তারা নরক-আগুনের পালা বদল টাইপের সিনেমাও বানাতে পারে ইচ্ছা করলে।
এই মিশনের জন্য লন্ডনের লয়েডস বেশ মোটা অঙ্কের প্রিমিয়াম বাগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু দশ হাজার কিলোমিটার দূর দিয়ে উড়ে যেতে থাকা শিপের জন্য আসলে আইও কোনো হুমকি নয়।
দূর থেকে আসতে থাকা কমলা-হলুদ রঙা গ্রহটাকে দেখে ক্রিস ফ্লয়েড অর্ধশত বছর আগের কথা মনে না করে পারে না। এ পথেই তার দাদু চলেছিল সদর্পে। এখানে, ঠিক এখানেই বিখ্যাত শিপ লিওনভ মিলিত হয়েছিল পরিত্যক্ত ডিসকভারির সাথে। এখানেই ড. চন্দ্রশেখরামপিল্লাই তার পাগলা কম্পিউটারকে জাগিয়ে তোলে দু হাজার দশে। তারপর দু শিপই এল-১ এ ভাসতে থাকা বিশাল কালো মনোলিথের আগাগোড়া দেখে বেড়িয়েছিল।
এখন আর কোনো মনোলিথ নেই। নেই জুপিটার বা বৃহস্পতি বলে কোনো গ্রহ। এই ছোট্ট সূর্যটা ফিনিক্স পাখির মতো বৃহস্পতির ছাই থেকে উত্থিত হয়ে নিজের উপগ্রহজগৎকে পরিণত করেছে এক নতুন সৌরজগতে। শুধু ইউরোপা আর গ্যানিমিডের পরিবেশ এক-আধটু মিলে যায় পৃথিবীর সাথে, তাপমাত্রার দিক দিয়ে। ব্যাপারটা এভাবে কদ্দিন এগুবে তাও কেউ জানে না। জীবন বিকাশে হাজার হাজার থেকে লাখ লাখ বছর লেগে যেতে পারে, যদি কোটি কোটি বছর না লাগে।
গ্যালাক্সির বিজ্ঞানীদল আশা নিয়ে এল-১ এর দিকে তাকায়। যাওয়াটা মুখের কথা নয়। এখানে চিরকালই বৃহস্পতি-আইওর আগুন নদী বয়ে যেত, এখন লুসিফার তৈরি হওয়ার পর তাড়িতিক প্রবাহটার শক্তি বেড়েছে কয়েকশ গুণ। এমনকি মাঝেমধ্যে শক্তি-তটিনী খালি চোখে বেশ ভালভাবেই দেখা যায় । আয়োনিত সোডিয়ামের বৈশিষ্ট্যধারী উজ্জ্বল হলুদ রেখা। গ্যানিমিডের বিজ্ঞানীদের কী আফসোস, এই অসীম গিগাওয়াট যদি নিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু কাজটা করার কোনো বাস্তব উপায় দেখা যাচ্ছে না।
প্রথম পেনিট্রোমিটারটা ক্রুদের নানা সন্দেহের মুখে বেরিয়ে যায়, তার দু ঘণ্টা পর হাইপোডার্মিক সুচের মতো বিদ্ধ হয় উপগ্রহের গায়ে ।
প্রায় পাঁচ সেকেন্ড টিকে ছিল পরীক্ষা-বাণটা, ডিজাইন করার সময় যেখানে প্রত্যাশিত সময়ের পরিমাণ মাত্র টেনেটুনে আধসেকেন্ড। এবং দশগুণ বেশি টিকে থাকার কারণে লক্ষ লক্ষ অজানা ডাটা পাঠিয়ে গেল অবিরত। আশপাশের প্রতিটি মৌল-যৌগ-উপাদানের নাড়ী-নক্ষত্র মানুষের জানা হয়ে গেল এক পলকে। তারপর, আইওর সর্বগ্রাসী মুখ নিয়ে নিল বাণটাকে, মিশিয়ে দিল নিজের সাথে।
বিজ্ঞানীরা যার পর নাই খুশি। ভ্যান ডার বার্গ আরো এক কাঠি বাড়া। আইও মোটামুটি সহজ লক্ষ্য-এখানে কাজ হবে, এটাই সবার আশা ছিল। কিন্তু ইউরোপা নিয়ে তার সেই ভয়ংকর আবিষ্কার যদি ঠিক হয়ে থাকে তো পরের যন্ত্রটা নিশ্চই ব্যর্থ হবে।
তবু, প্রমাণ হবে না কিছুই। ডজনখানেক শক্তিশালী কারণে জিনিসটা ব্যর্থ হতে পারে। এবং ব্যাপারটা এমন হলে ল্যান্ডিং ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।
কাজটা পুরোপুরি নিষিদ্ধ-শুধু মানুষের আইনে নয়…
২৪. আমি ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন
অ্যাস্ট্রোপোল-তার এই বিশেষ টাইটেল থাকা সত্ত্বেও স্বীকার করে না যে আশাকার অস্তিত্ব থাকতে পারে। ইউ এস এস এ ও একই কথা বলে সব সময়। এবং এই আফ্রিকান দেশটার রাষ্ট্রদূতরা বেশ বিব্রত হন যদি কেউ এ নিয়ে মাতামাতি করতে থাকে।
কিন্তু নিউটনের তৃতীয় সূত্র জগতের আর সবকিছুর সাথে সাথে রাজনীতিতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটা সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে। জগৎ কাঁপানো সূত্র। বান্ড সব সময়ই তার ভেতরে বেশ কয়েকজন কট্টর দক্ষিণ আফ্রিকা বিরোধী মানুষকে ক্ষমতায় রাখে। সাধারণত তারা আর্থিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। তবু মাঝেমধ্যেই বাস্তব বিস্ফোরণ আর হত্যাকাণ্ড যে হয়না তা নয়।
