সেকেন্ড অফিসার ক্রিস ফ্লয়েড যখন নিজের সন্দেহের কথা তুলল তখন ক্যাপ্টেন তেমন গা করেনি। বলেছে শিপের ক্রোমাটোগ্রাফিক পরীক্ষায় উচ্চ স্তরের ওপিয়াম পাবার আরেক খনি আবিষ্কার করেছে যা চীনা কুরা ব্যবহার করে মাঝেমধ্যেই। কিন্তু এবার ব্যাপারটা সিরিয়াস-খুবই সিরিয়াস। মহাকাশরথে নেশার আফিম!
কার্গো হোল্ড থ্রি, আইটেম ২/৪৫৬, ক্যাপ্টেন। তালিকায় লেখা আছে, সায়েন্টিফিক এ্যাপারেটাস। কিন্তু ভিতরে বিস্ফোরক ঠাসা।
কী!
অবশ্যই, স্যার। এইযে, ইলেক্ট্রোগ্রাম।
আমি আপনার মতামত নিব এ ব্যাপারে, মি. ফ্লয়েড। দেখেছেন নাকি জিনিসগুলো?।
না, স্যার। একটা সিল করা ক্রু কেসের ভিতরে রাখা আছে। আধ মিটার বাই এক মিটার বাই পাঁচ মিটার… প্রায়। সায়েন্টিফিক টিমের আনা সবচে বড় প্যাক গুলোর অন্যতম। লেবেল আঁটা আছে, সুর-সাবধানে নাড়াচাড়া কন্য। ভুলে যাওয়া যাবে না, বাকী সবকিছুই কিন্তু ভঙ্গুর, সাবধানে নাড়াচাড়া করা উচিত।
ক্যাপ্টেন নিজের ডেস্কের বিশেষায়িত প্রাস্টিক কাঠের গায়ে আঙুল দিয়ে তাল ঠুকতে লাগল। সে অভ্যাসটাকে ঘৃণা করে, আর ছাড়ার চেষ্টা করে অনেক-কিন্তু কাজ হয় না।) এই সামান্য কাজই তাকে চেয়ার থেকে ঠেলে তুলল, তারপর বিগড়ে গেল মন-মগজ আরো! এই গাধাটে কাজ কী করে সে করে একজন স্পেস ক্যাপ্টেন হয়ে! পা দুটোকে চেয়ারের সাথে বেঁধে নিয়ে তাকালো তরুণ ফ্লয়েডের দিকে।
এম্নিতে সে ব্যক্তিগতভাবে ফ্লয়েডের রিপোর্টের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করে না। তার নতুন সেকেন্ড অফিসার দারুণ কর্মক্ষম। সে সবচে বড় কথা, কখনোই নিজের ভুবনখ্যাত দাদার কথা তোলে না। ব্যাপারটার এক সরল ব্যাখ্যা থাকতে পারে। হয়তো পরীক্ষণের সময় অন্যান্য কেমিক্যালের সাথে দুর্বল আণবিক বলের সম্পর্ক ধরা পড়েছে, এমন সম্পর্ক অনেকটা টেলিপ্যাথির মতো, হতেই পারে। ফলে সংবেদী পরীক্ষার রেজাল্ট দেখা যাবে একটু ভীতিকর, যদিও বাস্তবে কোনো সমস্যা নেই।
তারা ইচ্ছা করলেই হোন্ডে গিয়ে প্যাকেজ খুলে দেখতে পারে। না, জোর করা ঠিক হবে না। তার উপর বিপদ হওয়া বিচিত্র নয়। সাথে সাথে লিগ্যাল প্রব্লেম হওয়া
খুবই সম্ভব। আইনি জটিলতা বড় খারাপ জিনিস। তারচে খবরটা উপরের সিঁড়িতে পাঠিয়ে দিলেই হল, পরে ঝামেলা নিজের ঘাড়ে পড়বে না। আজ হোক আর কাল, এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিলেও কেউ দুষতে পারবে না তখন।
প্লিজ, ড. অ্যান্ডারসনকে একটু ডেকে পাঠান-অন্য কারো কাছে এ নিয়ে কোনো কথা না বলাটাই ভাল।
ভেরি গুড, স্যার। ক্রিস ফ্লয়েড একটা সশ্রদ্ধ কিন্তু অপ্রয়োজনীয় স্যালুট করল, তারপর একেবারে সুড়ৎ করে ভেসে বেরিয়ে গেল ঘরটা থেকে।
সায়েন্টিফিক টিমের লিডার জিরো গ্র্যাভিটিতে মোটেও অভ্যস্ত নয়; বেচারার নড়াচড়া নিতান্ত আড়ষ্ট। আপনার সহজাত প্রতিভা এক্ষেত্রে তেমন কাজে দিচ্ছে না বরং দৃষ্টিকটুভাবে বেশ কবার ক্যাপ্টেনের ডেস্ক আঁকড়ে ধরতে হয়েছে তাকে।
এক্সপ্লোসিভ! অফ কোর্স নট! ম্যানিফেস্টটা দেখতে দিন তো… ২/৪৫৬…
ড. অ্যান্ডারসন তার পোর্টেবল কিবোর্ডে কথাটা তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পড়ে গেল, পঞ্চম মাত্রার পেনিট্রোমিটার। অর্থাৎ কিনা প্রবেশ-সম্ভাবনা মাপক। পরিমাণ-তিনটি। অবশ্যই-কোন সমস্যা নেই।
এবং ঠিক কী জিনিস এই পেনিট্রোমিটার বা প্রবেশ সম্ভাবনা মাপক? আড়ষ্ট একটা হাসি ঝুলে আছে ক্যাপ্টেনের মুখে।
“স্ট্যান্ডার্ড প্ল্যানেটারি স্যাম্পলিং ডিভাইস। আপনি শুধু ছেড়ে দিবেন, আর যে কোনো মূল্যে সে চলে যাবে দশ মিটার গভীরে। এমনকি পাথরের উপরিতল হলেও কোনো অসুবিধা নেই। তারপরই একটা পূর্ণ রাসায়নিক বিশ্লেষণ পাঠাবে। শুক্রের বা বুধের দিবা অংশে গবেষণা চালানোর উপযোগী একমাত্র জিনিস। একথা আইওর ক্ষেত্রেও চলবে। সেখানেই আমরা প্রথমটা ফেলতে যাচ্ছি।
ড. অ্যান্ডারসন। শীতল কণ্ঠ ক্যাপ্টেনের, আপনি একজন চমৎকার দক্ষ ভূগোলবিদ হতে পারেন, অবশ্যই আপনি সৌরজগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ। কিন্তু, শ্রদ্ধার সাথেই বলছি, আপনি মহাজাগতিক প্রকৌশলের ঘোড়াই জানেন। মরে গেলেও অর্বিট থেকে জিনিসপত্র ছুঁড়তে পারবেন না। সেগুলো বেকুবের মতো ঘুরতেই থাকবে জীবনভর।
সাথে সাথেই বিজ্ঞানীর চেহারায় অপমানের রেখা ফুটে উঠল ।
বেকুবের দলই কাজটা করবে… বলল সে, অবশ্যই। আপনার কথাটা যোগ করা উচিত ছিল।
“একেবারে ঠিক কথা। জিনিসটাকে ছুঁড়ে দেয়া যাবে না, বরং জিনিসটাই ধেয়ে যাবে। এবং তাতে সলিড রকেট ফুয়েল থাকলেই তা সম্ভব। সলিড রকেট ফুয়েলকে সরাসরি বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণ মালামাল। এবং এটাই এর ক্লাসিফিকেশন। আমি প্রস্তুতকারকের লিখিত ক্লিয়ারেন্স চাই এবং ব্যক্তিগতভাবে আপনার গ্যারান্টিও প্রয়োজন। আর যাই হোক, সেফটি সিস্টেম একেবারে পারফেক্ট না হলে চলবে না। যদি না হয় তো মালামাল নামানো ছাড়া অন্য কোনো গতি নেই। এখন, আর কোনো ছোট্ট সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে নাতো? আপনারা কি সিসমিক সার্ভের পরিকল্পনা করেছিলেন? আমার বিশ্বাস, ভূ-কম্পন বিষয়ক যন্ত্রপাতির মধ্যে যেগুলো গবেষণায় লাগে সেগুলোতে বেশ খানিকটা করে বিস্ফোরক ঢোকানো থাকে…
ঘণ্টা কয়েক পরে দেখা গেল ফুরিনের দুটো সিলিন্ডারও পাওয়া গেছে কার্গোতে। এগুলো অতি শক্তিশালী লেজার রশিকে হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিধ্বংসী করে রাখে । মানুষের কাছে সর্বভেদী লেজারও ছোঁয়াচে ভয়, এবং যথারীতি বিশুদ্ধ ফুরিন সেই লিস্টেই পড়ে। কিন্তু পেনিট্রোমিটারকে ঠিক জায়গামতো ফেলার জন্য লেসার গাইডেড রকেট ছাড়া তেমন কোনো সস্তা পথ নেই, তাই এটাও উতরে যেতে পারে।
