তারপরও অনেকে মনে করত রাজনৈতিক চাপ বাদবাকীদের ফায়দা লোটা যাবে না, পুরনো কারাগার গড়ে তোলা আর সম্ভব নয়। অনেকে বেশ জানতো, ইতিহাসের পাতাগুলো নূতন করে লেখা যায় না। কিন্তু প্রতিশোধ না নিয়ে ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয় আরো অনেকেই।
এই দু শ্রেণীর আশপাশে গজিয়ে উঠল রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক খেলার পাল্টাপাল্টি চাল।
ডার বান্ড সবচে বড় না হলেও সবার চেয়ে শক্তিমান এবং অবশ্যই সবচে বেশি ধনী। হারানো প্রজাতান্ত্রিক দেশটার সম্পদ লোপাট করার কাজে বান্ডদের একটা নেটওয়ার্ক এবং কয়েকটা হোল্ডিং কোম্পানিই যথেষ্ট ছিল। আর আজ, সময়ের অদ্ভুত নদী বেয়ে চলতে চলতে তাদের বেশিরভাগই পুরোপুরি আইনসম্মত, শুধু আইনসম্মত হলেও হত-বরং শ্রদ্ধার পাত্র।
সুং এ্যারোস্পেসে অন্তত আধ বিলিয়ন বান্ড-মানি খাটছে, বার্ষিক খতিয়ানে কী সুন্দরভাবে পরিমাণটা দেখা যায়! দু হাজার উনষাটে স্যার লরেন্স আরো পঞ্চাশ কোটি গ্রহণ করতে মোটেও কার্পণ্য করেনি-হাজার হলেও তার ছোট্ট নৌবহরে আরো একটু জাঁকজমক বাড়বে।
কিন্তু তার সেই বিখ্যাত ব্যবসাবুদ্ধিও বান্ড এবং সুং এ্যারোস্পেসের শেষ চার্টার্ড মিশনটার সাথে সম্পর্কের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। এম্নিতেই তখন হ্যালি এগিয়ে আসছিল মঙ্গলের দিকে, তার নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে ইউনিভার্সকে শেষ সাজে গড়ে নেয়ার কাজে। অন্য সিসটার শিপটার রুটিন অপারেশনে চোখ না পড়ারই কথা।
লন্ডনের লয়েডস অবশ্যই যথারীতি গ্যালাক্সির প্রস্তাবিত রুটিন খতিয়ে দেখেছে, কিন্তু তেমন কোনো ফারাক পড়েনি। সৃষ্টি জগতের চারধারে বাড়দের লোক বসে আছে; অবশ্যই ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোয়।
ব্যাপারটা ইনস্যুরেন্স দালালদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হলেও মহাকাশ আইনবিদদের জন্য পোয়াবারো হয়ে দাঁড়ায়।
২২. ঝুঁকিপূর্ণ মালামাল
প্রতিনিয়ত লাখ লাখ কিলোমিটার বদলে যাওয়া দূরত্বের দুটো লক্ষ্যে শিপিং লাইন চালানো চাট্টিখানি কথা নয়। তার উপর আবার গতীয় দিক দিয়ে প্রতি মুহূর্তেই শত কিলোমিটার হিসাব উড়ে এসে জুড়ে বসে। নিয়মিত কর্মতালিকা থাকার প্রশ্নই নেই। তাই সৌর জগতের আগাগোড়া বদলে মানবজাতির জন্য নতুন খোলনলচে নিতে নিতে যে কেউ বন্দর বা কক্ষপথগুলোয় থেকে থেকে হয়রান হয়ে যেতেই পারে-এতে অবাক হবার কিছু নেই।
সৌভাগ্যক্রমে এই পালাবদলগুলো বেশ কবছর আগে থেকেই হিসাব করে বের করা যায়। তাই নিয়মিত যানগুলোও সুযোগমতো মেরামতি করিয়ে নেয়, ক্রুদের নামিয়ে দেয় একটু আরাম আয়েশে ছুটি কাটানোর কাজে। এবং ভাগ্যক্রমে মাঝেমধ্যে অতি ধরাধরি করে কেউ কেউ ব্যক্তিগত কাজে ভাড়া করে বসতে পারে এসব যাত্রার রথ এবং রথীদের। আগের দিনে ব্যক্তিগত সমুদ্রভ্রমণে জাহাজ ভাড়া করার মতো বিলাস আর কী!
ক্যাপ্টেন এরিক ল্যাপ্লাস যখন জানল যে গ্যানিমিডের বাইরে কাটানোর সেই তিনটা মাস একেবারে জলে যাচ্ছে না তখন খুশি না হয়ে উপায় থাকে না। প্ল্যানেটারি সায়েন্টিফিক ফাউন্ডেশন একটা উদ্যোগ নিয়েছে। বৃহস্পতীয় উপগ্ৰহজগৎ ছুঁড়ে ফেরার নতুন মওকা দেবে তারা দিচ্ছে আর্থিক সুবিধা। (এখনো কেউ এটাকে লুসিফারীয় জগৎ বলে না, বৃহস্পতীয় জগই বলে।) তারা বিশেষ দৃষ্টি দেবে অবহেলিত ডজনখানেক ছোট উপগ্রহের দিকে। চাঁদগুলোর কোনো কোনোটা ঠিকমতো সার্ভে করা হয়নি; বাকীগুলো দায়সারাভাবে ঘোরা হয়েছে অতীতে।
মিশনের খবর পাবার সাথে সাথেই রালফ ভ্যান ডার বার্গ সুং শিপিং এজেন্টকে ডেকে এনে অভিযানের আগাপাশতলা জেনে নেয়ার জন্য জেরা শুরু করে দিল।
হ্যাঁ-প্রথমে যাব আইওর দিকে। তারপর ইউরোপার আশপাশদিয়ে একটু উড়ে যাওয়া…
শুধু উড়ে যাওয়া? কত কাছ দিয়ে?
এক মিনিট, ব্যাপারটা বেখাপ্পা। ফ্লাইট প্ল্যানে বিস্তারিত কিছু লেখা নেই। কিন্তু অবশ্যই যানটা নিষিদ্ধ অঞ্চলে যাবে না।
শেষ আইনে নিষিদ্ধ দূরত্ব ছিল দশ হাজার কিলোমিটার। পনের বছর আগের কথা। যাই হোক, আমি মিশন প্ল্যানেটোলজিস্টের পদে স্বেচ্ছাসেবী হতে চাই। আমার বায়োডাটা পাঠিয়ে দেব…
না-না। সেসবের দরকার নেই, ড, ভ্যান ডার বার্গ। তারা এরই মধ্যে আপনার নাম মনোনয়ন করে আপনাকে অনুরোধের চিন্তাভাবনা করছে।
.
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে–চিরাচরিত রীতি। বুদ্ধি বাড়ার পর মানুষ যখন পেছনে তাকায় (পরে তাকানোর অনেক সময় থাকে। তখন অনেক ভুল চোখে পড়ে। পরে, ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস চার্টারে অনেকগুলো অসঙ্গতি দেখতে পেল। দুজন ক্রু অসুস্থ ছিল, একেবারে হন্তদন্ত হয়ে তাদের বদলে অন্যদের বসানো হয়েছিল তখন। তখন বদলি ক্রু পেয়েই সে আহ্লাদে আটখানা-তাদের কাগজপাতি খুঁজে দেখার জন্য তেমন একটা গা করেনি-অথচ করার কথা ছিল। (অবশ্য আঁতিপাতি করে খুঁজেও কোনো গরমিল পাওয়া যেত না…)
এরপরই কার্গো নিয়ে ভ্যাজাল শুরু। ক্যাপ্টেন হিসেবে শিপের প্রতিটা জিনিস খুঁটিয়ে দেখার দায়িত্ব তার এক্তিয়ারেই পড়ে। যে যাই বলুক, খুঁটিনাটি সব আসলে দেখা যায় না-তবু কারণ থাকলে সব দেখতে কোনো আপত্তি নেই তার। কুরা সাধারণত নিখুঁত হয়ে থাকে, অন্তত শারীরিক দিক দিয়ে। তবু লম্বা মিশন বিরক্তিকর হতে পারে, তাই গা-ঝাড়া দেয়ার পানীয় নিয়ে নেয়া হয় সাথে করে। এমিতে পৃথিবীতে পুরো বৈধ হলেও মহাকাশ অভিযানে স্নায়ু উত্তেজক তরল যথাসম্ভব এড়িয়ে চলাই নিয়ম।
