আরে, উল্টা-পাল্টা কিছু নেই; সে নিজেকে জানিয়ে রাখল, স্বাস্থ্যবান ভয়কে সাথে নিয়েই। তার জানা আছে, ভয় বাড়তে বাড়তে আতঙ্কে পরিণত হলে মানুষ এম্নিতেই মরে যেতে পারে। আতঙ্ক কাকে বলে, কত প্রকার ও কী-কী, প্রত্যেক প্রকারের সংজ্ঞা সহ উদাহরণ দিতে পেরেছে সে, জীবনে দুবার। একবার পাহাড়ের উপর, আরেকবার পানির নিচে। এখন-ভাগ্যকে হাজার ধন্যবাদ-সে আতঙ্ক থেকে যোজন যোজন দূরে। কেন কে জানে, মনে একটু ভরসা ভরসা পাওয়া যাচ্ছে হঠাৎ । এই পরিবেশের ঠিক কোথায় যেন হাস্যরসাত্মক কিছু একটা লুকিয়ে আছে।
আর তারপরই বলা নেই, কওয়া নেই, সে হাসা শুরু করল-হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে নয়, বরং স্বস্তিতে।
পুরনোদিনের স্টার ওয়র্স ছায়াছবিগুলো দেখেছ নাকি কখনন? গ্রিনবার্গের দিকে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সে।
অবশ্যই-অন্তত আধ ডজনবার।
“যাক, এবার বোঝা গেল কোন দুঃখে এমন অস্বস্তিতে ছিলাম। একটা দৃশ্যে লিউকের স্পেসশিপ গ্রহাণুর গায়ে আছড়ে পড়ে। তারপর এক দানবীয় সাপ জাতীয় প্রাণীর দিকে এগিয়ে যায়। প্রাণীটা সেই গ্রহাণুর গর্তে বাস করত।
লিউকের শিপ নয়-হ্যান্স সোলোর মিলেনিয়াম ফ্যালকন। আমি সারাক্ষণ ভেবে মরতাম বেচারা প্রাণী কী করে এমন জীবন্ত জিনিসকে হজম করল। ওটা নিশ্চই সাংঘাতিক ক্ষুধায় ছিল, স্পেস থেকে কোনো খাবার আসবে সে আশায় মুখ ব্যাদান করে থাকা ছাড়া আর কোনো যুক্তিতো মনে পড়ে না। আর প্রিন্সেস লিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কথা না, কী বল?
এখানে, হ্যালির ধূমকেতুতে, ছিয়াত্তর বছরে যেখানে এক বছর হয়, এবং মাত্র একবার সামান্য সময়ের জন্য অকল্পনীয় তাপে ফুটতে থাকে পুরো হ্যালি, অন্য সময়টুকু অবিরত হিম-সেখানে কোনো প্রকার জীবন-ঝর্নার অস্তিত্ব অসম্ভব নয় কি?
সে প্রাণ থাকার কথা ভাবতে ভালবাসে; কিন্তু শুধু ভালবাসা দিয়েই সব হয় না। তার ফিরে গিয়ে কিছু এক্সপ্লোসিভ নিয়ে আসতে হবে, আর অন্য করিডোরটা এদিকে…
এই রুট ধরে আর বেশিক্ষণ যেতে পারব না। গ্রিনবার্গকে বলল সে, বরং অন্যটায় একটু ঢু মেরে যাই। জংশনে ফিরে আসছি আবার, অন্য ফিতা উল্টো পেঁচিয়ে নিয়ে।
সে আর রহস্যময় আলোটার কথা তুলল না। আলো জ্বালতেই হারিয়ে গেল সেটা।
গ্রিনবার্গ সাথে সাথেই জবাব দেয়নি। ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক। সম্ভবত শিপের সাথে কথা বলছে; চ্যান্ট এ নিয়ে ভাবে না। নিয়মানুযায়ী, জবাব না দেয়া পর্যন্ত সে কথাটা বলেই যাবে।
বিরক্ত হবার সুযোগ নেই, গ্রিনবার্গ একটু মাফ চেয়ে নিল সাথে সাথে ।
ফাইন-ক্লিফ-আমি অবশ্য তোমাকে মিনিটখানেকের জন্য হারিয়ে বসেছিলাম। চেম্বারে ফিরে এসেছি, যাচ্ছি অন্য টানেলটায়। আশা করি সেখানে কোনোকিছু পধরোধ করে দাঁড়াবে না।
এবার গ্রিনবার্গ সাথে সাথেই জবাব দিল ।
“স্যরি, বিল। শিপে ফিরে এসো। একটু ইমার্জেন্সি পরিস্থিতি দেখা দিল-না, ইউনিভার্সে নয়। কিন্তু আমাদের এক্ষুনি পৃথিবীতে ফিরতে হতে পারে।
.
ড. চ্যান্ট সেই ভাঙা কলাম আবিষ্কারের কয়েক সপ্তাহ পরের কথা…
সূর্যের কাছাকাছি আসার সাথে সাথে প্রতিবারই যেহেতু এই বিখ্যাত ধূমকেতু বেশ অনেকটা ভর উগড়ে দেয় স্পেসের বুকে-সেহেতু এর ভর-বিন্যাস বদলে যায় প্রতিনিয়ত। এবং এমন হতে হতে কয়েক সহস্র বছর অন্তর অন্তর ঘূর্ণনের আগাপাশতলা আমূল পরিবর্তিত হয়। বদলে যায় মধ্যবিন্দু, বেশ নিষ্ঠুরভাবেই কেঁপে ওঠে পুরো হ্যালি। শক্তিক্ষয়ের অপরিবর্তনীয় এ খেলায় যে ভূকম্পনটা হয় তার মাত্রা রিখটার স্কেলে পাঁচের কম হবে না কোনোমতেই। এজন্য স্ট্যালাকলাইটগুলো পড়ে ছিল।
কিন্তু সে আর কখনোই সেই রহস্যঘেরা আলোর কোমল বিচ্ছুরণ-রহস্য ভেদ করতে পারেনি। আর এখনকার নূতন নাটকের যবনিকাপাত হবার পর পরই এ ব্যাপার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু এ নষ্ট সুযোগের কষ্ট সারা জীবন তাকে জ্বালিয়ে যাবে।
ব্যাপারটা যে সে দেখেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই মনে। কেন যেন কলিগদের আর বলা হয়নি। ভিডিও ক্যামেরায় যা ওঠেনি, অন্ধকারে সামান্য সময় তা দেখার দাবী খুব একটা গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তাও যথেষ্ট সন্দেহজনক।
কিন্তু তার পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই পরবর্তী অভিযানের জন্য একটা সিল করা নোট ছেড়ে যাচ্ছে।
সে নোটটা ছেড়ে যাচ্ছে ২১৩৩ সালে ভোলা হবে, এই আশায়।
২০. অবির পড়েছে ডাক
ভিক্টরকে দেখেছ নাকি? আনন্দে মাইকেলোভিচের দাঁত বেরিয়ে পড়ছে। এদিকে ফ্লয়েড কাপ্তানের ডাকে সাড়া দিচ্ছিল। কথা শেষ করল প্রশ্নকর্তা, ওর মনটা ভেঙে গেল যে!
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ধাক্কা কাটিয়ে উঠবে। কাটছাট জবাব দিল ফ্লয়েড, খোঁচাখুঁচি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই, অন্য ব্যাপারে সে ব্যস্ত, কী হল সেটা খতিয়ে দেখছি…
ক্যাপ্টেন স্মিথ এখনো স্থাণুর মতো গোঁজ হয়ে বসে আছে নিজের কেবিনে। সত্যি যদি স্মিথ মনে করত শিপের কোনো ঝুঁকি আছে-সাথে সাথেই নিজের এনার্জি-ঝড়টাকে ডানে-বামে আদেশ-নিষেধের স্রোতে ছড়িয়ে দিত। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তার কিছু করার নেই, বসে বসে পৃথিবী থেকে আসতে থাকা পরবর্তী মেসেজের আশায় মাছি মারতে হবে ।
ক্যাপ্টেন ল্যাপ্লাস তো আজকের বন্ধু নয়-অনেক পুরনো, সে কেমন করে এমন তালগোল পাকালো কে জানে! গোনায় ধরার মতো কোনো দুর্ঘটনা নেই, না আছে পরিচালনায় কোনো ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটি। তাহলে কেন এই গ্যাড়াকলে ফেলারে বাবা! ইউনিভার্সেরও অন্য কোনো পথ ছিল না। অপারেশন্স সেন্টার ঠিকঠাক কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল পালাক্রমে। মহাকাশের সেই চিরাচরিত ইমার্জেন্সির মতো লাগছে দেখেশুনে-খবর পাঠানো আর নেয়া ছাড়া কিছু করার নেই। কিন্তু ফ্লয়েডের কাছে রিপোের্ট দেয়ার সময় সে অসন্তুষ্টির বিন্দুমাত্র আভাস দেয়নি।
