মরার জায়গাটায় নিশ্চই বিজবিজে শব্দ চলবে সারাক্ষণ; সদা-সর্বদা অলক্ষুনে গর্তটা তর্জন-গর্জন-জাবর কাটা ছাড়া আর কোনো কাজে ব্যস্ত থাকবে বলেতো মনে হচ্ছে না। তার বিরক্ত মতামত এমনই, আমি খানাখন্দ-গর্ত পছন্দ করি কারণ সেগুলোতে বিন্দুমাত্র শব্দ নেই। আর সময় থাকে থেমে। হাজার বছরে কিস্যু বদলে যায়নি, শুধু স্ট্যালাকলাইটগুলো আরো একটু মোটা হয়েছে, ব্যস।
আর এখন, চিকন কিন্তু দুর্দান্ত শক্ত রশি দিয়ে ক্লিফোর্ড গ্রিনবার্গের সাথে বাঁধা অবস্থায় হ্যালির আরো আরো গভীরে ভেসে যাবার সময় সে বুঝতে পারছে যে কথাটা সত্যি নয়। কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই তার ভূগোলবিদের মন বলছে যেন এ আজব এলাকাটা মাত্র গতকাল তৈরি হল… অবশ্যই, সৃষ্টি জগতের সময় মাত্রায় হিসেবটা ধর্তব্য। আসলেও, গুহাটা কোনো কোনো মানব-সৃষ্ট মহানগরীর চেয়েও নবীন।
যে সুড়ঙ্গ ধরে সে নেমে যাচ্ছে তার সরু ঠোঁটগুলো বড়জোর মিটার চারেক চওড়া। তার উপর পরিবেশের ওজনহীনতা পানির নিচের গুহা-ডাইভিংয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঠিক যেন পৃথিবীর কোনো জলমগ্ন সুড়ঙ্গে বাড়তি কিছু ওজন বয়ে নিচ্ছে সে, তাই নেমে যাচ্ছে আরো আরো নিচে। শুধু বিন্দুমাত্র বাঁধা না থাকায় বোঝা যায় যে এলাকাটা বায়ুশূন্য, পানিতো দূরের কথা।
তুমি কিন্তু দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছ, অভিযোগ তুলল গ্রিনবার্গ, প্রবেশপথের পঞ্চাশ মিটার ভিতরে যাবার পর পরই, রেডিও লিঙ্ক বেশ ভাল কাজ দিচ্ছে। আশপাশটা কেমন?
বলা মুশকিল-আমি কোনো ফরমেশন পাচ্ছি না খুঁজে, সুতরাং ব্যাখ্যা করার মতো ভাষা নেই। ঠিক কোনো প্রকারের পাথর নয়, আঙুল ছোঁয়ালেই ভেঙে ভেঙে পড়ছে-যেন কোনো বিশাল পনিরের ভেতর বসে আছি আমরা…
তার মানে জিনিসটা জৈবিক?
হ্যাঁ-কিন্তু অর্গানিক অর্থে-প্রাণের কোনো সম্পর্ক নেই, আশাও করা যায় না। কিন্তু প্রাণ সঞ্চারের প্রাথমিক উপাদানে ভরপুর। সব ধরনের হাইড্রোকার্বন… কেমিস্টরা বেশ মজা পাবে। এখনো দেখতে পাচ্ছ তো আমাকে?
শুধু তোমার লাইটের হাল্কা আলো। তাও মিলিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
আহ-এখানে একটু খাঁটি পাথরের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে…দেখেশুনে ঠিক এখানটার সাথে মেলানো যায় না। আরে! আমি স্বর্ণের সাথে ধাক্কা খেলাম!
মশকরা বাদ দাও তো!
পুরনো পশ্চিমে হাজার মানুষকে এ জিনিসটা ধোঁকা দেয় যুগ যুগ ধরে-আয়রণ পাইরাইটস। বাইরের দিকের উপগ্রহগুলোতে সহজলভ্য। কিন্তু এ জিনিস এখানে কী করছে দয়া করে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলো না…
ভিজুয়াল কন্টাক্ট লস্ট। দুশ মিটার ভিতরে চলে গেছ, সাবধান।
এক ভিন্ন স্তর ধরে এগুচ্ছি। দেখেশুনে উল্কাজাত খণ্ড মনে হয়। নিশ্চই দারুণ। কিছু হয়েছিল সে সময়ে-আশা করি দিনক্ষণ বের করতে পারব পঞ্জিকা উল্টে-ওয়াও!
এমন কিছু আমার বেলায় না করলেই হল।
স্যরি-আসলে দম আটকে ফেলেছে-সামনেই একটা বিশাল… কী বলা যায় একে? চেম্বার। আমার চাওয়া শেষ জিনিস। দাঁড়াও, আলোটা একটু আশপাশে বুলিয়ে নিই…
পুরোপুরি চতুষ্কোণ। এপাশ-ওপাশে ত্রিশ-চল্লিশ মিটার হবে। আর… অবিশ্বাস্য! হ্যালির বুক জুড়ে শুধু চমক আর চমক! স্ট্যালাকটাইট-স্ট্যালেগমাইট।
এ নিয়ে এতো অবাক হবার কী হল?
এখানে পানির মুক্ত পতন নেই, নেই চুনাপাথর-অন্তত এতো লো গ্র্যাভিটিতে থাকার কথা নয়। কোনো ধরনের মোম হবে হয়ত। এক মিনিট, ভালমতো ভিডিও নিয়ে নিই… চমৎকার আকৃতি… যেন গলন্ত মোম থেকে তৈরি… কী ব্যাপার…
আবার কী হল?
ড. চ্যান্টের স্বরের সুর পাল্টে গেল অনেকটা। গ্রিনবার্গের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
কয়েকটা কলাম ভেঙে গেছে; পড়ে আছে ফ্লোরের উপর… ঠিক যেন…
বলে যাও।
.. যেন কিছু একটা ভর করেছে ওগুলোর উপর।
পাগলের মতো কথা বলোনা! ভূকম্পনে এমন হয়নি তো?
এখানে ভূমিকম্পের কোনো অস্তিত্বই নেই। শুধু জীবিত প্রসবণ থেকে মৃদু কম্পন আসে, এই যা। যেন কোনো এক সময় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল গুহাটা। যাই হোক, অন্তত কয়েক শতাব্দী আগের ঘটনা। পড়ে থাকা কিছু স্তম্ভের উপর কয়েক মিলিমিটার পুরু মোম পড়েছে, মুখের কথা না।
ড. চ্যান্ট ধীরে ধীরে নিজেকে ফিরে পাচ্ছে যেন। সে এম্নিতে মোটেও কল্পনা বিলাসী নয় কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বিধি বাম; মনের বিরক্তিকর স্মৃতির কুঠুরী খুলে গেছে হঠাৎ করে। স-ব কলাম দেখে মনে হয় যেন কোনো বিশাল দৈত্য খাঁচা খুলে পালানোর পর লোহার দণ্ডগুলো পড়ে আছে চারপাশে…।
অবশ্যই, কল্পনাটা অতিরঞ্জিত; এবং মানানসই। ড. চ্যান্ট অবশ্য কোনো সম্ভাবনাকেই খাটো করে দেখতে শেখেনি। যে কোনো পরিবর্তনই ভাবায়, আর সাবধানের মার নেই-পুরনো কথা। এই সাবধানতাই জীবন বাঁচিয়েছিল একাধিকবার। ভয়ের কারণ ধরতে পারার আগ পর্যন্ত এই চেম্বার ছাড়িয়ে যাবে না সে। নিজের সাথে চাতুরীর কোনো ইচ্ছাও তার নেই, শব্দটা আসলে ভয়ই হবে।
বিল-সব ঠিকঠাক চলছে তো? কী হল?
এখনো ভিডিও করছি; আসলে কলামগুলো দেখে ঠিক রেড ইন্ডিয়ানদের তাঁবু লুটের কথা মনে পড়ে গেল। কী বলব, বিতিকিচ্ছিরি!
সে মনের ভয়-ভয় ভাবটাকে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে বেশ জোরেসোরে। কাজের কথা ভাবতে থাকলেই হল। তার উপর মানসিক দৃষ্টিটা যদি বেশ উঁচু হয় তো যে কোনো অবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়া সহজ। অবশ্য এই খাঁটি যান্ত্রিক রেকর্ডিংয়ের কাজটা মনের অনেক অংশ দখল করে রাখে, ভয় জাতীয় আবেগ নয়।
