এখনো ফ্লয়েড তাকিয়ে আছে, হারিয়ে যাচ্ছে জিনিসটা। কে জানে কোথায় হারালো, নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, আবার চলেও যেতে পারে অনেক অনেক দূরে। উপরের তেজস্ক্রিয়তার ঝড়ে বেশিক্ষণ টিকবে না, তাতে কী, কজন মানুষ নিজের বানানো ধূমকেতু নিয়ে বাহাদুরি করতে জানে?
১৮. ওল্ড ফেইথফুল
ইউনিভার্স মেরু এলাকায় থাকতে থাকতেই সাবধানে সব অভিযাত্রা শুরু হয়ে ১ গেল। প্রথম প্রথম এক মানুষবাহী ই এম ইউগুলো এখনো অনেকে জানে না যে ই এম ইউ মানে এক্সটার্নাল ম্যানুভারিং ইউনিট) দিন-রাত সব এলাকাই চষে বেড়ালো, আগ্রহ জাগানো সব বিষয়ই টুকে নিল সতর্কভাবে। প্রাথমিক নিরীক্ষা একটু ঝিমিয়ে আসতেই সর্বোচ্চ পাঁচ বিজ্ঞানীর দল ঝাঁপিয়ে পড়ল স্পেসশিপের শাটল নিয়ে। কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে বিদঘুঁটে সব যন্ত্রপাতি পেতে আসাই মূল উদ্দেশ্য।
লেডি জেসমিন হল ডিসকভারি যুগের প্রাচীন স্পেস পোডের অতি আধুনিক বিবর্তিত রূপ। শুধু গ্র্যাভিটি বিহীন এলাকায় রাজত্ব চালানো এর কাজ। আসলে ছোটখাট একটা স্পেসশিপ। চাঁদের, মঙ্গলের বা বৃহস্পতীয় উপগ্রহ থেকে ইউনিভার্সে হাল্কা-পষ্কা মাল সামান অথবা মানুষ পারাপারের কাজ এর কাঁধে ন্যস্ত। ওর গর্বিত চিফ পাইলট ওকে সামান্য একটা ধূমকেতুতে কাজে লাগানোর পক্ষপাতী নয়।
হ্যালির বহিরঙ্গে কোনো বিশেষ চমক নেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ক্যাপ্টেন স্মিথ মেরুদেশ ছেড়ে উড়ল। মাত্র ডজনখানেক কিলোমিটার যেতে না যেতেই ইউনিভার্স নতুন এক জগতে উপস্থিত। মাসের পর মাস অন্ধকারে পড়ে থাকা এলাকা ছেড়ে ছন্দিত দিবা-রাত্রির সাথে পরিচিত অঞ্চলে হাজির হল এই সর্বাধুনিক স্পেসশিপ। এখানে সূর্যোদয়ের পর পরই ধীরে ধীরে ধূমকেতুর গায়ে নূতন প্রাণের সঞ্চার হয়।
সূর্যের কিরণ সরাসরি পড়ার সাথে সাথে জ্বলজ্বল করে উঠবে সব পর্বতচূড়া। বেশিরভাগই স্তব্ধ হয়ে থাকবে, তাদের সরু কণ্ঠনালী বেয়ে খনিজ নুন উঠতে উঠতে এখন একেবারে বুজে গেছে স্বর।
তারপরও, সূর্য এবার হ্যালির বুকে রঙের খেলা দেখাবে। জীববিদরা চিৎকার শুরু করে দিল, এখানে প্রাণ জন্ম নিচ্ছিল ঠিক প্রাচীন পৃথিবীর মতো। কেউ কেউ সে আশা ছেড়ে দেয়নি, কিন্তু হাতে কোনো প্রমাণ নেই।
অন্য জ্বালামুখগুলো থেকে বাস্পের রেখা উঠে যাচ্ছে উপরে। অতিপ্রাকৃতভাবে শুধু সোজা উপরে উঠে যাচ্ছে, কারণ বাঁকা করে দেয়ার মতো কোনো বাতাস নেই চারপাশে। যথারীতি প্রথম দুয়েক ঘণ্টায় আর তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু সূর্যের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে এসব ঘটনার তেজও বাড়বে, আড়মোড়া ভাঙবে ভিতরের জমাট যৌগ। ভিক্টর উইলিস একেই বলে, তিমির জলোচ্ছাস।
মোটামুটি চিত্রিত করা গেলেও কথাটা দিয়ে আসল উদাহরণ টানা যায় না। হ্যালির পানি ছোঁড়া সামান্য সময় ধরে হয় না, বরং ঘন্টার পর ঘণ্টা চলতেই থাকে। তার উপর, কখনো বেঁকে আবার সারফেসে ফিরে আসে না, বরং উঠতেই থাকে সেই কুয়াশার দিকে যার সৃষ্টিতে ওরা অবদান রেখে যাচ্ছে।
প্রথম প্রথম বিজ্ঞানীরা এমনভাবে উষ্ণ প্রসবণগুলো নিয়ে পরীক্ষা করছিল যেন তারা অগ্নিগিরি বিশেষজ্ঞ, এগুচ্ছে এটনা অথবা ভিসুভিয়াসের দিকে, অতি সাবধানে। একটু পরই ভুল ধরা পড়ল। না, মাঝেমধ্যে এক-আধটু বেয়াদবি করলেও তারা আসলে তেমন হিংস্র নয়। সাধারণ আগুন নেভানোর হোজ থেকে যেভাবে পানি বেরোয় ঠিক সেভাবেই বিচ্ছুরণ ঘটে। পানিটা বেশ গরম। আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার থেকে বেরিয়েই মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প আর ক্রিস্টাল বরফের মিশ্রণরূপে লুটিয়ে পড়ে উপরের বিশাল সাদা অঞ্চলে। উপরের দিকে পড়তে থাকা তুষারঝড়ে আবৃত এক ধূমকেতুর নাম হ্যালি। এমনকি সবচে দ্র বেগে বেরুনো জিনিসগুলোও আর ফিরে আসছে না আপন উৎসের বুকে। প্রতিবার সূর্যের কাছাকাছি এসে আবার ফিরে যাবার পথে হ্যালি তার জীবন অমৃতের অনেকটা হারিয়ে বসে মহাশূন্যের নিঃসীম শূন্যতায়।
যথেষ্ট সময় ধরে অপেক্ষা করার পর ক্যাপ্টেন স্মিথ ইউনিভার্সকে ওন্ড ফেইথফুলের শত মিটারের মধ্যে নিতে রাজি হল। দিবা-ভাগের সবচে বড় উষ্ণ প্রসবণের নামটা মন্দ হয়নি। ধোঁয়াশার এক স্থূল স্তম্ভ, যেন কোনো অতি ক্ষুদ্র মূলের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বপু গাছের গা। ধূমকেতুর অন্যতম প্রবীণ জ্বালামুখটার ব্যাস তিনশো মিটার। বিজ্ঞানীরা আরো আগেই এর আশপাশ চষে বহুরঙা বীজ নিয়ে এসেছে। হায়, নিষ্ফল বন্ধ্যা বীজ! যথারীতি থার্মোমিটার আর স্যাম্পলিং টিউব দাবিয়ে দেয়া হয়েছে চারপাশে, এমনকি স্তম্ভের গায়েও।
যদি আপনাদের কাউকে এটা উপরে ছুঁড়ে দেয়, সাবধান করেছিল ক্যাপ্টেন, তাড়াতাড়ি উদ্ধার পাবার আশা করবেন না আশা করি । অপেক্ষা করতে হবে, অন্তত নিজে নিজে ফিরে আসা পর্যন্ত।
কী বলল ব্যাটা? কী বোঝাতে চায়? ধাঁধায় পড়ে দিমিত্রি মাইকেলোভিচ প্রশ্ন তোলে।
ভিক্টর উইলিস জবাব দিতে তেমন দ্বিধা করেনি, মহাজাগতিক বিদ্যায় ব্যাপারগুলো আমাদের আশা অনুযায়ী বা কল্পনা অনুযায়ী ঘটে না। হ্যালি থেকে নির্দিষ্ট গতির চেয়ে জোরে ছুঁড়ে দেয়া যে কোনোকিছু মোটামুটি নিয়মানুযায়ী অর্বিট ধরেই ঘুরতে থাকবে। বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য প্রচুর গতি দরকার। সুতরাং, একবার আবর্তন শেষ হইলে কক্ষপথদুইটি পরস্পরকে ছেদ করিবে; এবং তুমি আবার আগের জায়গাতেই ফিরে আসবে। বয়েস বাড়বে ছিয়াত্তর বছর, ব্যস।
