তুলনাটা আসলেই… বেখাপ্পা লা জিওকন্ডাও রহস্যময়ী। কিন্তু সে তো অবশ্যই উত্তেজক নয়। ইভার ক্ষমতাটা ঠিক এখানে লুকিয়ে থাকে, এই দুয়ের মাঝামাঝি কোথাও-সাথে নিষ্পাপ সারল্যের একটা ছোঁয়া… এই আধ শতাব্দী পরও তার ভেতরে এই তিনের দারুণ সমাহার দেখা যায়; অন্তত বিশ্বাসীর চোখে।
শুধু একটা ব্যাপারেরই বেশ অভাব দেখা যাচ্ছে-এভাবে ভাবতে চায় না ফ্লয়েড, তবু না ভেবে উপায় নেই, একটা সত্যিকার ব্যক্তিত্বের বেশ অভাব তার ভিতরে।
ইভার উপর মনোসংযোগ করার জোর চেষ্টা করলে দেখা যায়, ওর পার্সোনালিটিটা আসলে ওর অভিনয় করা প্রতিটি চরিত্রের অদ্ভুত মিশেল। কোনো এক সমালোচকের সেই বিখ্যাত উক্তির সাথে একমত না হয়ে উপায় নেই, ইভা মারলিন আসলে সব মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন; কিন্তু একটা আয়নার কোনো নিজস্ব চরিত্র নেই।
এখন, হাজার বছরের রহস্যমাখা, সৌর জগতের সাময়িক অতিথি হ্যালির ধূমকেতুর বুকে, কালো তুষারের উপত্যকা জুড়ে একটা ক্যাবলে আটকানো অবস্থায় এই বিচিত্র সৃষ্টিই তার পাশে পাশে ভেসে চলেছে। উপত্যকাটাকে এ নামেই ডাকে সবাই, কেউ কোনোদিন কোনো স্থির মানচিত্রে একে দেখতে পায়নি। হুবহু দেখতে পাবেও না, কারণ পৃথিবীর ঋতু বদলের মতো করে এখানকার মানচিত্র বদলায়। সে ব্যাপারটাকে দারুণ উপভোগ করছে; এই চারপাশের দৃশ্যগুলো কোনো মানুষের চোখ কোনোকালে দেখেনি, সম্ভবত এমনভাবে কোনোকালে দেখবেও না। এদূর আসার সাহস হবে না সবার।
চাঁদের বুকে, অথবা মঙ্গলের বুকে, কোনো কোনো এলাকায় কিস্তৃত আকাশের কথাটা হিসাব থেকে বাদ দিলে মানুষ পৃথিবীর সাথে কিছু না কিছু মিল দেখতে পাবেই, অথবা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। এ অঞ্চলে সে আশায় গুড়ে বালি। প্রায় ভেসে থাকা কালো কালো ফেনা ফেনা তুষার দেখে বোঝাই যায় না যে এখানে বিন্দুমাত্র গ্র্যাভিটি থাকা সম্ভব। এমনকি সত্যি সত্যি ফেনার বিশাল বিশাল দঙ্গল ভেসে আছে চারদিকে। কখনো কখনো অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে উপর-নিচ নির্ধারণ করতে হয়।
তবে কালো তুষারের উপত্যকায় কাহিনী উল্টো। এর আকৃতি একেবারে কঠিন। পানি আর হাইড্রোকার্বনের বিচিত্র বরফ-সাগরের উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কঠিন কোনো রিফ। ভূতত্ত্ববিদরা এখনো এর উৎপত্তি নিয়ে হা-পিত্যেশ করে বেড়ায়। কারো কারো মতে এটা কোনো গ্রহানুপুঞ্জের অংশ, অজানা অতীতে ধূমকেতুটার বুকে আঘাত হেনেছিল, আজো নিজের ভিন্ন অস্তিত্বের কথা ভোলেনি। এর ভিতরে জৈব যৌগের বিচিত্র সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়, অনেকটা যেন জমাট কাঠকয়লা, যদিও এটুকু নিশ্চিত যে জীবন এখানে খেলা করেনি কোনোকালে।
ছোট্ট ভ্যালিটাকে ঢেকে ফেলা তুষার কিন্তু সত্যিকার অর্থে পুরোপুরি কালো নয়; ফ্লয়েডের ফেলা আলো লেগে এমনভাবে ঝিকিয়ে উঠল-যেন লাখ লাখ অতি খুদে হীরা দিয়ে তৈরি। কে জানে, ভাবল ফ্লয়েড, হ্যালিতে হীরা থাকতেও পারে, অন্তত কার্বনের কোনো অভাবতো নেই। আর এ-ও সত্যি যে হীরা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ বা চাপের কোনোটাই নেই এখানে।
হঠাৎ কথাটা ভাবতে ভাবতেই সে দু মুঠো ফেনা তুলে নেয়ার জন্য নিচু হল… কাজটা করার সময় একটু ভাড় ভাড় লাগছিল নাকি তাকে? অন্তত সার্কাসের দড়িখেলায় লোকগুলো যেভাবে শক্ত রশির উপর লাফায়-এগোয় অনেকটা সেভাবেই এগিয়েছিল সে, শুধু উপরের দিকটা নিচে, এই যা। ভঙ্গুর উপরিতলটা একটুও বাঁধা দিল না তার মাথা আর কাঁধকে। তারপর ভদ্রভাবে নিজের উর্ধ্বাঙ্গ উদ্ধার করল ফ্লয়েড, মুঠোভর্তি হ্যালি নিয়ে।
ব্যাপারটা হাতের গ্লাভসগুলো বেয়ে অনুভব করতে পারলে বেশ হত। এমনকি দলা করে একটা বলের মতো গোল চকমকে আকার দেয়ার সময়ও টের পাওয়া যায়নি। এইতো! মিশকালো বলটাও কী সুন্দর দ্যুতি ছড়ায় নাড়াচাড়া করার সময়!
আর সাথে সাথেই, কল্পনার রঙে রঞ্জিত হয়ে বলটা হয়ে গেল সাদা, দুধসাদা। আর সে যেন সেই ছোট্ট ছেলে, শীতের মাঠে খেলছে, হাতে বরফ, আর সামনে পেছনে-চারদিকে ভূত-প্রেত-ডাইনী। শুনতে পাচ্ছে খেলার সাথীদের চিৎকার, হুমকি; অনুভব করছে তাদের ছোঁড়া বলগুলোর আঘাত…
স্মৃতিটা ছোট্ট, কিন্তু বেশ বড়সড় ধাক্কা দিয়ে যাবার মতো। অসহ্য এক যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল তার মনে। আজ এই শত বছর পরে তার ভূত-প্রেত বন্ধুদের কারো কথাই মনে পড়ে না। ওদেরই কারো একজনকে সে ভালবাসত, কী ভালই না বাসত…
ফ্লয়েডের আঙুলগুলো মমতা নিয়ে অপার্থিব তুষারের গোলাটাকে আদর করছে, আর চোখ দিয়ে নামছে অবিরল জলধারা। এরপর দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে ওঠে; কেটে যায় ঘোর। এতো দুঃখের মুহূর্ত নয়, আনন্দের সময়।
মাই গড! চিৎকার করে উঠল হেউড ফ্লয়েড, তার শব্দগুলো স্পেসস্যুটের ছোট্ট, আঁটসাঁট জগতে প্রতিধ্বনিত হয়ে গুমরে মরছে, আমি হ্যালির ধূমকেতুতে দাঁড়িয়ে আছি, আর কী চাই! এখনি যদি কোনো উল্কার আঘাতে মরে যাই তো কী এসে যায়!
তারপর সে তুলে আনে হাত দুটো, বলটাকে ছুঁড়ে দেয় তারার রাজ্যে। একেবারে ছোট বলটা মুহূর্তেই হারিয়ে যায় কালো আকাশের গায়ে, তাতে কী, হেউড ফ্লয়েড একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সেদিকেই।
ঠিক তক্ষুনি এলোমেলোভাবে আলোর একটা ঝাক এসে পড়ল। অপ্রত্যাশিতভাবে, লুকানো সূর্য তার আলোর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ঐ বলটার গায়ে। লাখো প্রতিফলক কণার গায়ে পড়ে আধো আঁধারির আকাশে স্পষ্ট দেখা গেল সেটাকে।
