আমার ধারণা ও ভয় পাচ্ছে, খুব। দিমিত্রি বলল ঝাঁঝের সাথে। এমিতেও সে ভিক্টরকে কক্ষনো পছন্দ করতো না; বিশেষত এই বরেণ্য লোকটার কানে সামান্য খাটো হবার কথা জানার পর। ভিক্টরের প্রতি এটা অতি অন্যায় অবিচার। কারণ সে নিজেরই অসীম কৌতূহল আর পরীক্ষায় নিজেকে গিনিপিগ বানানোর মতো সাহস দেখিয়েছিল। দিমিত্রি কথাটার সাথে আরো একটু যোগ করার লোভ সামলাতে পারল না, যে মানুষের ভিতরে নেই সংগীতের মূৰ্ছনা; তার থাকবে শুধু অতৃপ্তি, অনন্ত সংগ্রাম আর অপূর্ণতা।
এদিকে পৃথিবীর অর্বিট ছেড়ে আসার আগেই ফ্লয়েড সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ম্যাগি মবালা নিজেই যথেষ্ট, ধার করা উৎসাহের কোনো প্রয়োজন নেই তার ক্ষেত্রে। (হাজার হলেও, তার প্রিয় স্লোগান, একজন লেখকের কখনোই নূতন অভিজ্ঞতার সুযোগ হারাতে নেই। তার আবেগিক জীবনে অনেক অনেক বিখ্যাত প্রভাব পড়েছে)
ইভা মারলিন যথারীতি সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে; তাকে নিয়ে একটা ট্যুরের ইচ্ছা আছে ফ্লয়েডের মনে। সবার জানা, ফ্লয়েড তার একটু ভক্ত বটে; তার উপর প্যাসেঞ্জার লিস্টে ইভার নামটা উঠে আসার পেছনে ফ্লয়েডের যে হাত আছে তা নিয়েও কথা কম হয়নি। সেসব কথা বাড়তে বাড়তে এখন দারুণ একটা রূপ পেয়েছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে ব্যস্ত সবাই। ব্যাপারটায় একটু হিংসা করছে যেন দিমিত্রি আর শিপের ফিজিশিয়ান ড. মহিন্দ্র।
প্রথম প্রথম বিরক্ত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না; কিন্তু কিছু সময় কাটার পর ফ্লয়েডের তারুণ্যের কথা মনে পড়ে যায়। এখন আর তাই রসিকতাটুকু খারাপ লাগে না, বরং উপভোগ্য মনে হয় । কিন্তু এসব ঠাট্টায় ইভা কী মনে করে তা ফ্লয়েড জানে, জিজ্ঞেস করার মতো ঠিক সাহসও জোটানো যাচ্ছে না। এই এখানে, ছোট্ট সমাজে, যেখানে হাজার রহস্যময় ব্যাপারও ঘণ্টা ছয়েক গোপন থাকে না, সেখানেও ইভা তার সেই রহস্যগুলো অবগুণ্ঠনে সযত্নে ঢেকে রেখেছে-যে রহস্য দিয়ে তিন তিনটা প্রজন্মকে সে পাগল করে রেখেছিল বছরের পর বছর।
ভিক্টর উইলিস পড়েছে আরেক ঝামেলায়।
ইউনিভার্সে সর্বাধুনিক স্পেসস্যুট মার্ক এক্স এক্স সাজানো আছে; এর ভিতর আবার নন ফগিং, নন রিফ্লেক্টিভ এবং নিশ্চয়তা দেয়া থাকে যে মহাকাশের অসমান্তরাল দৃশ্য পাওয়া যাবে। হেলমেটগুলো বিভিন্ন আকার আর প্রকারের হলেও ভিক্টর উইলিস কোনোটাতেই মাথা গলাতে পারবে না বড়সড় অপারেশন করানোর আগ পর্যন্ত।
তার প্রতীক প্রতিষ্ঠিত হতে পনেরটা বছর চলে গেল।
এখন দাঁড়িই ভিক্টর উইলিস আর হ্যালির মাঝে বাঁধা; এ দুয়ের মাঝে যে। কোনোটাকে বেছে নিতে হবে এবার।
১৭. কালো তুষারের উপত্যকা
ক্যাপ্টেন স্মিথ ই ভি এর পক্ষে। তার মতে, ধূমকেতুর বুকে পা না ফেলাটাই উত্তম।
ইন্ট্রাকশন মতো চললে কোনো সমস্যাই দেখা দেবে না, তার সেই অপ্রতিরোধ্য ব্রিফিং চলছে, এমনকি আগে কোনোদিন স্পেসস্যুট না পরলেও কুছ পরোয়া নেহি-দূর জানি, কমান্ডার গ্রিনবার্গ আর ড. ফ্লয়েড এ ধরনের স্যুট গায়ে গলিয়েছিলেন-তবে আজকের স্যুটগুলো কিন্তু সে আমলের মতো নেই। পুরোপুরি অটোম্যাটিক, পরেও বেশ আরাম পাবেন। কোনো কন্ট্রোল বা অ্যাডজাস্টমেন্ট নিয়ে গলদঘর্ম হবার দরকার নেই, শুধু এয়ারলক দিয়ে বেরিয়ে যাবেন, ব্যস।
একটা স্থির নিয়ম মানতেই হবে, ই ভি এ দিয়ে একবারে মাত্র দুজন বেরুতে পারবেন। পাহারা কিন্তু থাকছেই, ভয় নেই। পাঁচ মিটার লম্বা দড়িতে বাঁধা থাকবে যানটা, প্রয়োজনে বিশ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো যাবে দূরত্ব। আরো অ্যাডভেঞ্চার চান? তো ভ্যালি জুড়ে যে ক্যাবলগুলো ঝুলিয়ে রেখেছি তার একটায় দুজনকেই বেঁধে দেয়া যাবে। চলাচলের নিয়মকানুন পৃথিবীর মতো-সবাই নিজের নিজের ডানদিক ধরে যাবেন। প্রয়োজনে একজন ছুটে যেতে পারেন, এমনকি দুজনে ছুটলেও অসুবিধা নেই, নিউক্লিয়াসের বাইরে ভেসে যাওয়াতেও ভয়ের কিছু দেখছি না। স্পেস থেকে ধরে আনতে জানি আমরা। কোনো প্রশ্ন?
কতক্ষণ বাইরে থাকা যাবে?
আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা, মিস মবালা। কিন্তু আমার মতে একটু অস্বস্তি হলেই ফিরে আসা উচিত। প্রথম আউটিংয়ে ঘণ্টাখানেকই ভাল। যদিও মনে হবে মিনিট দশেকের মধ্যেই সময় কেটে গেল…
ক্যাপ্টেন স্মিথের কথাটা অনেকাংশেই ঠিক। পেরুনো সময় ডিসপ্লেতে তাকিয়েই আৎকে উঠল ফ্লয়েড। কোন ফাঁকে চল্লিশ মিনিট উড়ে গেল কে জানে! অবশ্য এ নিয়ে এতো অবাক হবার কিছু নেই, শিপ এখান থেকে কিলোমিটার-টাক দূরে।
যে কোনো বিচারে সবচে জ্যেষ্ঠ যাত্রী হিসেবে সেই প্রথম ই ভি এ তে ওঠার সৌভাগ্য অর্জন করে। আর সহযাত্রীর ব্যাপারে কিছু বলার সুযোগ পায়নি ফ্লয়েড।
ই ভি এ উইথ ইভা! বলেছিল মাইকেলোভিচ, কী করে এই সম্মিলনকে হেলা করা যায় হে! এমনকি যদি, একটা বিস্তৃত মুচকি হাসি দিয়ে যোগ করল বাকী কথাটা, তুমি চাও-ও, তবু ওই খটমটে স্যুটগুলো তোমাদের বাড়তি যে কোনোকিছু করার চেষ্টায় বাধা দেবে।
ইভা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই রাজি হয়ে গেল; অবশ্য বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাসও প্রকাশ পেল না… এই ব্যাপারটা, বলল ফ্লয়েড মনে মনে, তার ক্ষেত্রে চিরায়ত । আর বিরক্তও হল বেশ। বিরক্তিটা ইভার উপর নয়, নিজেরই উপর। হাজার হলেও, ইভার সাথে মোনালিসার তুলনা হয়েছে বেশ অনেকবার; তাদের দুজনের কাউকেই আর যা-ই দেয়া যাক না কেন, দোষ দেয়া যায় না।
