ধীরে ধীরে ক্যাপ্টেন স্মিথের সমাবেশ ফাঁকা গড়ের মাঠ হয়ে গেল। জুমটা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে, নিউক্লিয়াসটা আবারো পরিণত হয়েছে কালো, ছোট্ট বিন্দুতে ।
দেখা হবার চার ঘণ্টা আগেও শিপটা ধূমকেতুর দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল ঘণ্টায় পঞ্চাশ হাজার কিলোমিটার বেগে।
খেলার এই পর্যায়ে মূল ড্রাইভে যদি কোনো গণ্ডগোল হয়, তো হ্যালির বুকে যে কোনো জ্বালামুখ হার মেনে যাবে।
১৬. স্পর্শ
ল্যান্ডিংটা হল একদম ঠিকমতো; যেমনটা আশা করেছিল ক্যাপ্টেন স্মিথ। ঠিক কোনো মুহূর্তে যে ইউনিভার্স তার ভর ছেড়ে দিয়েছে তা কেউ বলতে পারবে না। স্পর্শেরও মিনিটখানেক পর সব যাত্রী বুঝতে পারল; তার পরই জয়ধ্বনি।
এক সরু উপত্যকার প্রান্তে, টেনেটুনে শত মিটার উঁচু পর্বতঘেরা এলাকায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে ইউনিভার্স। চান্দ্র-প্রকৃতি দেখার আশা যেই করে থাক না কেন-বেশ অবাক হতে হবে তাকে। চাঁদের প্রকৃতি হাজার বছরের মহাজাগতিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বোমাবর্ষণে মসৃণতা পেয়েছে। আর তার গঠন লাখো বছরের পুরনো।
অন্যদিকে হ্যালি চিরযুবা। চির পরিবর্তনশীল। এমনকি পার্থিব পিরামিডগুলোও এসব পাহাড় আর উপত্যকার চেয়ে পুরনো। এখানে হাজার বছরের পুরনো বলে কোনো কথা নেই। প্রতিবার সূর্যের চারধারে ঘোরার সময় নক্ষত্রটার কাছাকাছি এসে পেরিয়ে যেতে যেতে সৌর আগুনে আমূল বদলে যায় হ্যালির পুরো চেহারা। এমনকি ১৯৮৬ সালের হ্যালির সাথেও বর্তমানের কোনো মিল পাওয়া যাবে না। ভিক্টর উইলিসের মতো নির্জলা কন্ঠে বলতে গেলে, ৮৬ সালের বাদাম আকৃতি এখন সরু কোমর হয়ে গেল!
ঠিকই, বোঝা যাচ্ছে এভাবে আরো দু-চারবার চললে সূর্য একে প্রায় সমান দু ভাগ করে বসবে। আঠারোশ ছিচল্লিশের মহাকাশবিদদের মাথা খারাপ করে দিয়ে যেমন করে দুভাগ হয়ে যায় বিয়েলার ধূমকেতু, সেভাবে।
প্রায় না থাকা মাধ্যাকর্ষণও বোঝা যাচ্ছিল এই আজব ভূমিতে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কিম্ভূত বস্তু আর তার আরো কিতাকার গঠন। মাকড়শা-জালের মতো হাল্কা, ফাপা জিনিসের বহর দেখেই এখানটার আকর্ষণ ঠাহর করা যায়। এমনকি চাঁদের বুকেও এগুলো কয়েক মিনিট টিকবে না, মিশে যাবে।
ক্যাপ্টেন স্মিথ মহাকাশ যানটাকে আঁধার প্রান্তে ল্যান্ড করালেও চারপাশ দেখা খুব সহজ। গ্যাসের যে বিশাল মোড়ক নিউক্লিয়াসটাকে মুড়ে রেখেছে সেটা যথেষ্ট আলো দেয়। দেখে মেরুজ্যোতি মনে হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। আর তাও যেন দেখা যাচ্ছে অ্যান্টার্কটিকার বরফপ্রান্ত ছাড়িয়ে। এ-ও যথেষ্ট না হলে লুসিফারের দেয়া শত সূর্যের আলো তো আছেই।
সবাই আশা করেছিল রঙের কোনো খেলা দেখা যাবে না এর বুকে-তবু না পেয়ে বেশ হতাশ হতে হল ক্রুদের। যেন ইউনিভার্স কোনো খোলা কয়লাখনিতে বসে আছে। চারপাশের কালোকে গোনায় ধরলে তুলনাটা মন্দ নয় মোটেও। তুষার আর বরফের সাথে অঙ্গাঅঙ্গি মিশে আছে কার্বন আর কার্বনঘটিত যৌগের দল।
ক্যাপ্টেন স্মিথ, তার দায়িত্বানুযায়ী, ধীরে মূল এয়ারলক থেকে সাবলীলভাবে নিজেকে বের করে দিল। ভূমিতে পৌঁছতে পৌঁছতেই যেন বয়ে গেল অসীম সময়। তারপর গুঁড়োয় ঢাকা উপরিতল থেকে খানিকটা সে তুলে নিল মুঠো ভরে, গ্লাভস পরা হাতে রেখে খানিকক্ষণ পরীক্ষা করে দেখাও তার আগ্রহের অংশ।
আর এদিকে, ইউনিভার্সে বসে থাকা প্রত্যেকে অধীর আগ্রহ নিয়ে ইতিহাসের বুকে জায়গা করে নিবে যে কথাটুকু তার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে শুরু করল।
ক্যাপসিকামের বিচি আর নুনের দানার মতো দেখাচ্ছে। বলল ক্যাপ্টেন, ছিটিয়ে দিলে বেশ ফসল ফলবে বোধহয়।
* * *
মিশনের পরিকল্পনা একটু ভিন্ন। একটা পূর্ণ হ্যালির-দিন গবেষণায় কাটানোর কথা। পৃথিবীর হিসাবে পঞ্চান্ন ঘণ্টা। তারপর যদি কোনো সমস্যা না দেখা দেয় তো দক্ষিণ মেরু থেকে মাইল দশেক দূরে বিষুবীয় এলাকায় আরেকটা চক্কর দেয়া যেতে পারে। সুযোগ বুঝে সেখানে কোনো উষ্ণ প্রসবণ নিয়ে মেতে থাকা যাবে পুরো একটা দিবস-রজনী চক্র সাথে নিয়ে।
প্রধান বিজ্ঞানী পেভ্রিল সময় নষ্ট করায় বিশ্বাসী নয়। অপেক্ষারত প্রোবের বিকনের দিকে বেরিয়ে গেল সে একজন সহকারী সাথে করে নিয়ে দুজনের জেট স্নেডে করে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সগর্বে ফিরে এল তারা। সাথে বিভিন্ন স্যাম্পলের দঙ্গল। ডিপ ফ্রিজে রাখা হবে সেগুলো।
অন্য দলগুলো উপত্যকাজুড়ে তার-টারের একটা জাল বুনে ফেলেছে। খুঁটি দিয়ে বসানো সেসব, শেষপ্রান্ত ভাজা ভাজা কয়লার গহীনে। ফলে শুধু শিপের হাজারো যন্ত্রের সাথে সংযোগ হয়নি, বরং বাইরে চলাচলে বেশ সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে। ঝক্কিঝামেলার এক্সটার্নাল ম্যানুভারিং ইউনিট বাদেই চলাচল সহজ হল এবার। শুধু ক্যাবলগুলোতে দু হাত দিয়ে আড়াআড়ি ধরলেই চলবে, আপনিই ধীরে ধীরে চলাচল করা যায়। খটমটে ই এম ইউ ব্যবহার করার চেয়ে এ কাজ অনেক সহজ আর আনন্দদায়ক। আসলে কোনো যন্ত্র যখন বেশি পূর্ণতা পায় তখনি সেটার প্রতি মানুষের আসক্তি কমে আসে। এই ইউনিটগুলো এক মানুষের জন্য পূর্ণ স্পেসশিপের কাজ করে দেখেই হয়তো এ অনাসক্তি।
যাত্রীরা এসব দেখেশুনে বেশ উত্তেজিত; আর আবিষ্কারের সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টাতেও কোনো ত্রুটি নেই। এই উত্তেজনা খিতিয়ে আসতে আসতে প্রায় বারো ঘণ্টা কেটে গেল। সাবেক মহাকাশচারী ক্লিফোর্ড গ্রিনবার্গের মতে সময়টা অনেক কম। শিঘ্নি বাইরে যাওয়া নিয়ে কথা উঠল; শুধু ভিক্টর উইলিস কোনো কথা তোলেনি।
