এদের আকার দম বন্ধ করে দিলেও বৃহস্পতির জীবস্তর একেবারে ভঙ্গুর। কুয়াশা আর ফেনার রাজ্য। কিছু জীবের সুন্দর রেশমী সুতা আর কাগজ-পাতলা টিস্যু ঘুরে ওঠে, কারণ উপরের বিদ্যুৎ চমক থেকে সূক্ষ জীবকণার তুষার ঝরছে অবিরাম। এখানে খুব কম জিনিসই সাবানের ফেনার চেয়ে ঘন। এর সবচে ভয়াল শিকারীও সবচে নিরীহ পার্থিব বিড়াল গোষ্ঠীর৫৩ প্রাণীর সামনে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
মোটা দাগে হিসাব করলে-ইউরোপার মতো এ গ্রহের বিবর্তনেও আশা নেই। সচেতনতা হয়ত কখনোই জন্মাবে না এখানে। আর যদি জন্মায়ও, এ জগৎটা উবে যাবে। জন্ম নেবে নতুন কৌশলী দুনিয়া। খাঁটি আকাশ সংস্কৃতি জন্মাবে হয়ত। তবু, যে পরিবেশে আগুন ধরানো অসম্ভব, খাঁটি কঠিন বস্তুর দেখা মেলা ভার, সেখানে মনে হয় কোনো দিনই প্রস্তর যুগ আসবে না।
এখন সে ভেসে আছে এক বৃহস্পতি-ঝড়ের মাঝখানে। তুফানটা আফ্রিকার সমান। আবারো ওর মনে পড়ে সেই অস্তিত্বের কথা যা নক্ষত্র সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করছে সব সময়। আবেগ আর ভাবনাগুলো তার নিজের সচেতনতার মাঝদিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। ঠিকমতো বোঝা যায় না চিন্তাগুলো কোথায়, কীভাবে, কেন, কতটুকু যায়। যেন ও শব্দ শুনতে পায় এক বন্ধ দরজার ওপাড় থেকে। একটা বিতর্ক চলছে অন্য কোনো অচেনা ভাষায়। কিন্তু সেই ঢাকা আওয়াজ স্পষ্টভাবে বয়ে আনে অসন্তুষ্টি, তারপর অনিশ্চয়তা, তারপর একটা নিশ্চয়তা কেন তা সে বলতে পারবে না। আবারও মনে হল যেন ও একটা পোষা কুকুর। প্রভুর মনোভাব বুঝবে, শুধু বুঝবে না কথাটুকু, বুঝবে না স্বয়ং প্রভুকে।
আর তখুনি সেই অদেখা কুকুর-দড়ি তাকে নিয়ে চলল বৃহস্পতির ভিতরে, একেবারে হৃৎপিণ্ডে। মেঘমালার মাঝ দিয়ে, সেইসব জীবন-স্তরের মধ্য দিয়ে নেমে যাচ্ছে ও।
দ্রুত এমন একটা জায়গায় পৌঁছল যেখানে দূরের সূর্য তার আলোকেও পাঠাতে পারে না। চাপ আর তাপমাত্রা মুহূর্তে মুহূর্তে অকল্পনীয় হারে বাড়তে থাকে। এরিমধ্যে পানির স্ফুটনাঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। দ্রুত আরো বেশি তাপমাত্রার ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেল, যেখানটায় অসম্ভব তাপে আটকে আছে বাষ্প। বৃহস্পতি একটা পেঁয়াজের মতো, ও একের পর এক খোসার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে আর যাচ্ছে। এর মধ্যে বৃহস্পতি কোরের কাছাকাছি একটু পথ মাত্র যাওয়া হল।
নিচে, এক জায়গায় বাষ্প একটা ডাইনির ক্রুর মতো দেখতে এলাকায় জমে থাকে। পেট্রোকেমিক্যালে ভরা। লাখ লাখ বছর পৃথিবীর সর্বকালে বানানো সব ইঞ্জিনের জ্বালানি হতে পারবে এটুকু। আরো ঘন হচ্ছে, আরো ভারি। তারপর মাত্র কয়েক কিলোমিটারের অনিয়মিত এলাকা শেষে হঠাৎ ফুরিয়ে গেল।
পৃথিবীর যে কোনো পাথরের চেয়ে ভারি আর ঘন একটা স্তর এল এরপর। সিলিকন ও কার্বনের যৌগ, এখনো তরল। পার্থিব কেমিস্টদের চিরকালীন চাহিদা মেটাতে পারে এ পরতটা। হাজার হাজার কিলোমিটার আসছে, আসছে একের পর এক স্তর। শত শত থেকে তাপমাত্রা বেড়ে হয় হাজার হাজার ডিগ্রী। নানা স্তর ছোট থেকে ছোট হচ্ছে। কোরের কাছে অর্ধেক যাবার পরের তাপমাত্রা রসায়নের জন্য অকল্পনীয়, সব যৌগ উধাও হয়ে টিকে আছে শুধু মৌল আকারে।
এরপর আসে হাইড্রোজেনের এক গহীন সাগর। কিন্তু হাইড্রোজেন কখনো, কোনোদিন কোনো পার্থিব ল্যাবে এক সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ও এ অবস্থায় থাকেনি। এ হাইড্রোজেন আর কিছু নয়, অসীম চাপের কারণে পরিণত হয়েছে ধাতুতে!
সে গ্রহের একেবারে কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু বৃহস্পতি তার গর্ভে আরো একটা চমক লুকিয়ে রেখেছিল। সেই ভারি ধাতব হাইড্রোজেনের স্তর এক সময় হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেলে অবশেষে বৃহস্পতির একটা কঠিন স্তরও বেরিয়ে পড়ে। ষাট হাজার কিলোমিটার গভীরে।
যুগে যুগে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সেদ্ধ হয়ে যাওয়া কার্বন ধীরে ধীরে নেমে এসেছে গ্রহের কেন্দ্রে। এখানে চুঁইয়ে পড়ে ক্রিস্টালাইজড হয়ে। লক্ষ লক্ষ এটমোস্ফিয়ার চাপে স্ফটিক হয়ে গেছে। কার্বনের স্বচ্ছ রূপ! সেখানে, প্রকৃতির চরমতম রহস্যের ভিতরে লুকিয়ে আছে মানব জাতির কাছে মহামূল্যবান কিছু একটা।
রত্নগর্ভা বৃহস্পতির গভীরে, যেখানে মানুষ আদৌ পৌঁছতে পারবে না, সেখানে মাত্র একটা বিশুদ্ধ, সর্বোচ্চ চাপে তৈরি হীরে লুকিয়ে আছে। পৃথিবীর সমান।
৩৯. পোড বে তে
ওয়াল্টার, আই অ্যাম অ্যাফ্রেইড অ্যাবাউট হেউড।
আমি জানি, তানিয়া, কিন্তু কী করতে পারি, বল? কার্নো কখনোই কমান্ডার
অর্লোভাকে এমন দোনোমনা করতে দেখেনি। এজন্য মেয়েটাকে আরো আকর্ষণীয় লাগছে তার চোখে। কার্নো অবশ্য ছোটখাট মেয়েদের নিয়ে একটু নাক সিঁটকায়।
ওকে খুব ভাল লাগে আমার। কিন্তু এ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে না। তার…আমার মনে হয় আঁধার ব্যবহার করা উচিত, তার জীবনের এ অন্ধকারটুকুর জন্যে সবার মনের অবস্থা করুণ। লিওনভ একটা আনন্দের তরী। আমি এটাকে এমনই রাখতে চাই।
তুমি ওর সাথে কথা বলছ না কেন? তোমাকে শ্রদ্ধা করে, আমি নিশ্চিত সে সব বাধা কাটিয়ে বেরুতে চেষ্টা করবে।
আমি ঠিক সেটাই করতে চেয়েছি। যদি কাজ না হয়…
তাহলে?
আর কোনো সরল সমাধান থাকবে না। এ যাত্রা আর কী করতে পারে সে? আমরা ফিরে যাওয়া শুরু করলে তাকে হাইবারনেশনেই রাখতে হবে। আমরা সব সময়ই যাতে-তুমি কী যেন বল ওটা…তার বুকে অস্ত্র ধরতে পারি।
