আমি গ্র্যাভিটির নিকুচিও করি না। অবশ্য আকর্ষণটা চলাচলে সাহায্য করছে। বলা যায়। পুরো চক্রটাকে আবার চালিয়ে দিতে পারলে ডিসকভারির স্পিন বাঁধা পড়ে যাবে। এমনকি ঘোরাঘুরি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। ফলে এয়ারলকগুলো জুড়ে দিয়ে ই ভি এ বাদ দিতে পারব সহজেই। কাজ করাটা শতগুণ সহজ হয়ে যাবে।
ভাল আইডিয়া, ওয়াল্টার, কিন্তু তুমি কিছুতেই আমার শিপের সাথে ঐ কী বলে ইংরেজিতে… উইন্ডমিলকে মিলিয়ে ফেলতে যেও না। ধর কোনো একটা গণ্ডগোল হল আর ঐ অর্বিট চক্রটায়ও কোনো বিপদ এল নেমে…পরে কাজটা আমাদের সবাইকে কাঁদাবে।
মানলাম। আমরা ব্রিজের কাছে আসার আগে পেরুনোর চেষ্টা করব না। তাড়াতাড়িই যোগাযোগ করতে যাচ্ছি লিওনভের সাথে।
.
পরের দুদিন কেউ তেমন বিশ্রাম পায়নি। সময়টা কেটে যাবার পর কার্নো আর ব্রেইলোভস্কি ঘুমিয়ে পড়ে নিজেদের স্যুটেই। কিন্তু তার আগেই চষে ফেলেছে ডিসকভারি। মন খারাপের কিছুই পায়নি।
দেশ দুটোর স্পেস এজেন্সি আর স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রাথমিক রিপোর্টের পর স্বস্তি র নিঃশ্বাস ফেলল। ঠিক হওয়ার ফলেই মার্কিন সংস্থাগুলো তাদের পুরনো রাজনৈতিক চাল চালতে পেরেছে… ডিসকভারি কোনো কালেই পরিত্যক্ত ছিল না, বরং, সাময়িকভাবে অকার্যক্ষমকৃত যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ যান। আর এখনি শুরু হতে যাচ্ছে সেটার রিকন্ডিশনিংয়ের কাজ।
পাওয়ার নিয়ে সমস্যা নেই। পরের সমস্যাটা হল বাতাস। কারণ সব হাউজ ক্লিনিং যন্ত্রপাতিই ফেল মেরেছে এই মরার গন্ধটাকে সরানোর কাজে। কার্নোর কথাই ঠিক। গলিত খাবার। যখন রেফ্রিজারেশন সিস্টেম কিছু করতে পারেনি তখনই এগুলো পচতে থাকে। মহাকাশযানে জীবাণু কম বলে আস্তে-ধীরে গলেছে, তার উপর বিশাল ফ্রিজ থেকে একটু একটু করে গন্ধ বেরিয়ে এসেছে দেখে স্থায়িত্বও বেশি। কার্নোর কাছে অবশ্য এ ব্যাপারটাকে মোটেও বিরক্তিকর মনে হয়নি। বরং রোমান্টিক।
আমার শুধু চোখটা বন্ধ করতে হবে, সে বর্ণনা করছে, আর মনে হয় যেন অনেক আগেকার তিমি শিকারী কোনো জাহাজে চলে এসেছি। তুমি কি বাসী তিমির আসল গন্ধটা সম্পর্কে জানো, অথবা সারারাত শিকারের পর জাহাজ একদিন পরিষ্কার না করলে যে গন্ধ আসবে চেন সেটা?
ডিসকভারিতে একটা ভ্রমণ শেষ করে সবাই মেনে নিয়েছে যে এখানটাকে বুঝে নিতে খুব কম কল্পনাশক্তির প্রয়োজন। শিপের গুমোট বাতাসের সমস্যার সমাধান হয় বেশ ভালভাবে-অন্তত ম্যানেজ করে নেয়ার মতো অবস্থায় এখন ডিসকভারি। ভাগ্য ভাল যে এখনো রিজার্ভার ট্যাঙ্কে প্রচুর বাতাস পাওয়া যাচ্ছে। বড় সুসংবাদের একটা হল, প্রপেলারের নব্বইভাগ কার্যক্ষম। হাইড্রোজেনের বদলে এমোনিয়া বেছে নেয়ার পরও প্লাজমা ড্রাইভ ভালই কাজ করছে।
হয়ত কয়েক বছরের মধ্যে হাইড্রোজেনের বেশিরভাগ উবে গেছে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আর বাইরের ভয়াল ঠাণ্ডা থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু এমোনিয়ার সবটাই তরল। আর সেটুকুই পৃথিবীর কোনো এক নিরাপদ অর্বিটে নির্বিঘ্নে ফিরিয়ে নিতে যথেষ্ট-নিদেনপক্ষে রূপালী চাঁদের চারদিকে।
সম্ভবত ডিসকভারির প্রপেলারের মতো বনবনানিই শিপটাকে কজা করার পথে সবচে বড় বাঁধা। শাসা কোভলেভ কার্নো আর ব্রেইলোভস্কিকে তুলনা করল ডন কুইক্সোট আর শ্যাঙ্কো পাঞ্জার সাথে। তাদের উইন্ডমিল কজার কসরৎ সার্থক হবে এমন আশার কথাও শোনালো সবাইকে।
অবশেষে পরীক্ষার জন্য অনেকগুলো বিরতি নিয়ে ওরা শক্তি দিল করোসেলকে। বিশাল ড্রামটা দীর্ঘ দশ বছর পর নড়াচড়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। ডিসকভারি স্টার্ট করার জন্য খুব জটিল এক ধারা পেরিয়ে এসেছে তারা। আস্তে আস্তে প্রান্ত থেকে প্রান্তে ঘোরাটা বন্ধ হয়। এবার স্পিনিংয়ের শেষ চিহ্নটাও এটিচ্যুড কন্ট্রোল জেটের কারণে গায়েব হয়ে গেছে। ঘূর্ণন গতিহীনভাবে পাশাপাশি চলার আগ পর্যন্ত বেঁটেখাট লিওনভকে তাড়া করে বেরিয়েছে ডিসকভারি-লম্বা আকারের এক রহস্যময় স্পেসশিপ।
এখন একটা থেকে আরেকটায় যাতায়াত একদম সোজা। কিন্তু ক্যাপ্টেন অর্লোভা এখনো সরাসরি কোনো সংযোগ গড়তে দিতে রাজি নয়। প্রত্যেকেই তার সাথে একমত। কারণ ছোট দৈত্য আইও এগিয়ে এসেছে আরো। তাদের হয়ত এখনি এ যানটাকে ছেড়ে দিতে হবে। ছাড়তে হতে পারে স্পেসশিপ ডিসকভারি-যেটাকে বশ মানাতে ওরা এত কষ্ট করল।
তারা এখন ডিসকভারির অর্বিট ক্ষয়ের কারণ জানে, কিন্তু কোনো কাজেই আসবে না তথ্যটা। যতবার শিপটা বৃহস্পতি আর আইওর মাঝামাঝি এসেছে, ততবার এ দু দানোর অদৃশ্য প্রবাহ নলের কারণে সরে গেছে একদিকে। বিশ্ব থেকে বিশ্বে বয়ে চলা বিদ্যুতের এ মহানদী জাহাজকে একের পর এক আঘাতে আঘাতে ঠেলে দিয়েছে আইও নরকের দিকে। প্রতিবার।
প্রভাবের শেষ মুহূর্ত রুখে দেয়ার আর কোনো উপায় নেই। বৃহস্পতির একান্ত নিজের এক নিয়ম চলে এ এলাকায়। সেই অপ্রতিরোধ্য নিয়মের জন্যই চওড়া প্রবাহটা এতে প্রভাব ফেলবে। আইওর চারদিকের ভয়াবহ মেরুজ্যোতি-ঝড়ের সাথে সাথে মাঝে মাঝেই তাদের চমকে দেয়া চমক দেখা দেয়। তখুনি আমেরিকান যানটা অনেক কিলোমিটার নিচে নেমে যায় আর নিজের তাপ ঠিক রাখার সিস্টেম চালু হওয়ার আগেই দারুণ তাপদাহ জ্বালিয়ে দিতে চায় ডিসকভারিকে। কোনো কোনো সময় সেই বিদ্যুৎ নদী থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকার কারণে এ শিপ শুধু উত্তপ্ত হয়।
