গবেষণা কাজের সময় বেশিরভাগ স্বীকারকারীই মানসিক রোগীতে পরিণত হয়, কোনো কোনো সময় অদ্ভুত বাধা আসে আবার কখনো নানা ধরনের হুমকির সম্মুখীন হতে হয় গবেষকদের। এমনকি এর ফলাফলও শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এইচ জি ওয়েলসের[৪২] ওয়্যার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস বইয়ের কল্যাণে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে[৪৩] তার কারণেও ফলাফল বাধা পায়।
আরো একটা ব্যাপারে তার সন্দেহ দানা বাঁধে। গোপনীয়তার কারণ হিসেবে সাংস্কৃতিক আঘাতকে আসল সমস্যা দেখানো হলেও ঘাপলাটা অন্য কোথাও। আমেরিকা-রাশিয়া আঁতাত হয়তো অন্য বুদ্ধিমত্তার সাথে সবার আগে যোগাযোগ করার সুবিধা নিতে চাচ্ছে। এমনকি এর ফলে পৃথিবী থেকে ‘দেশ’ প্রথাটাও তুলে দিতে হতে পারে। তখনো নিয়ন্ত্রক থাকার ইচ্ছা স্বভাবতই জাগবে ক্ষমতাবান দেশগুলোর মনে। এতদূর থেকে ছোট্ট নক্ষত্রের মতো দেখতে সেই গ্রহটা। তাই মহাকাশের অসীম শূন্যতায় ব্যাপারটাকে চরম স্বার্থপরতা বলে মনে হয়।
সে এখন হালের এই অদ্ভুত আচরণের সাথে ব্যাপারটাকে মিলিয়ে দেখার তালে আছে। এখন আর সত্যিটা জানার উপায় নেই, কিন্তু একই সাথে তিন তিনটি নাইন থাউজ্যান্ড কম্পিউটার কী করে মানসিকভাবে অকেজো বা পাগলাটে হয়ে যায় সে ব্যাখ্যা উদ্ধার করা নিতান্ত কষ্টসাধ্য। হালের স্রষ্টারাই যদি তার এই হঠাৎ আচরণকে ব্যাখ্যা করতে না পারে তো কী করে দূর পৃথিবীর বাসিন্দাদের সাথে মানিয়ে নিবে?
বোম্যান ডক্টর সিমনসনের ব্যাখ্যাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিল। হাল তার অপরাধবোধ আর প্রোগ্রাম বৈপরীত্যের কারণে গাড্ডায় গেছে, কিন্তু সে পোলকে কেন খুন করবে? আর সব আতঙ্কিত অপরাধীর মতো সেও আস্তে আস্তে অপরাধের জালে জড়িয়ে গেছে।
আর আতঙ্ক যে কী জিনিস তা বোম্যান জানে। কারণ এর সর্বোকৃষ্ট উদাহরণ সে এক জীবনে দুবার দেখেছে। ছেলেবেলায় আগাছায় পা জড়িয়ে যাবার সময় যখন ডুবছিল তখন একবার, আরেকবার জ্যোতির্বিদের ট্রেনিংয়ের সময়। নষ্ট একটা গজের রিডিং দেখিয়েছিল যে সে নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার আগে অক্সিজেন ফুরিয়ে যাবে।
সেই মুহূর্তগুলোয় সে তার সমস্ত যৌক্তিকতা খুইয়ে বসে। কিন্তু অন্য যে কেউ হলে সব বিচারবুদ্ধির ধার না ধেরে পাগলামি শুরু করত।
এ ব্যাপারটা মানুষের ক্ষেত্রে হলে হালের বেলায়ও হতে পারে।
এসবই এখন অতীত, ডেভিড বোম্যানের চিন্তা-চেতনা ঘুরপাক খায় ভবিষ্যৎ নিয়ে।
অধ্যায় ৩২. অবাক করা অপার্থিব
খাবার ভালই পাওয়া যায়, মূল ফুড ডিস্পোরগুলো যে নষ্ট হয়নি তাও সৌভাগ্য বলতে হবে। এখন বোম্যান মূলত বাস করে কন্ট্রোল ডেকে। নিজের সিটটাও এখানে এনে নিয়েছে। খাবারের জায়গা কাছে, কাজের জায়গাতো এটাই।
মিশন কন্ট্রোলের কথামতো সে ডিসকভারির মোটামুটি ঠিকমতো চলতে থাকা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমও বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ, বোঝাই যায় সে শনি পর্যন্ত যেতে যেতে বেঁচে থাকবে। ডিসকভারি সেখানে যাবেই, জীবিত বা মৃত ডেভ বোম্যানকে সঙ্গী করে।
তার হাতে দৃশ্য দেখার মতো তেমন বাড়তি সময় নেই, মহাকাশের দৃশ্যও তেমন মনোহর নয়, তার উপর সে কাজের চাপে নিজের খাবার কথাই ভুলে যায়-আর দৃশ্য দেখা! তারপরও মিল্কি ওয়েস্ট দেখে তার চোখ যেন বিভোর হয়ে পড়ে; এর নক্ষত্রের মেঘ বিবশ করে দেয় চোখকে। সেখানে স্যাগেটাসের সেই চিরকালীন রহস্য ঘুমিয়ে আছে, অজস্র নক্ষত্র চিরকাল নীহারিকাটার কেন্দ্রবিন্দু ঢেকে রাখে সযত্নে, সেখানে মুখ ঘুরিয়ে আপন আপন সৌরজগৎ নিয়ে পাক খায়। সেখানেই সেই চির অমানিশার দেশ-সেখানে কোনো তারকা আপন দীপ্তি নিয়ে জ্বলে। আর এইতো আলফা সেন্টোরি-সবচে কাছের নক্ষত্র, নক্ষত্রলোকের দরজা।
সিরেয়াস ও ক্যানোপাসের চেয়েও আলফা সোন্টোরির আবেদন তার কাছে অনেক অনেক বেশি। এর আলোকমালা কয়েক বছর সময় নেয় এই জগতে পৌঁছতে, পৃথিবী সবসময় এক ধরনের যন্ত্রণায় সময় কাটায়-সবচে কাছের নক্ষত্রেও না যেতে পারার যন্ত্রণা।
শনি-জগৎ আর টি এম এ-ওয়ানের সাথে যে কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে তা নিয়ে এখন আর কারো কোনোরকম সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে চান না যে সেখান থেকেই টি এম এ-ওয়ানের স্রষ্টাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। জীবনদায়িনী হিসাবে শনি বৃহস্পতির চেয়েও ব্যর্থ, তার বেশিরভাগ উপগ্রহই কোটি বছরের কুম্ভকর্ণ-নিদ্রায় শুয়ে আছে, ঘুমটা সহজে ভাঙাও সম্ভব নয়-শূন্য থেকে তিন হাজার ডিগ্রি নিচে সেখানকার উত্তাপ। বায়ুমণ্ডলের মালিক শুধু টাইটান-তাও টেনেটুনে দূষিত মিথেনের একটা চাদর বলা চলে সেটাকে।
সুতরাং যে প্রাণীরা ত্রিশলাখ বছর আগে ঘুরে গেছে তারা শুধু অপার্থিব নয়, অসৌরজাগতিক। তারার দেশের পরিব্রাজকদল যেখানে সুবিধা সেখানেই একটা ঘাঁটি গেড়ে নিয়েছে-এমনি মনে হয়। কিন্তু জ্বালা ওঠানো সমস্যাটা অন্য কোথাও। পৃথিবী থেকে শনিতে সূর্যের আলো যেতে লাগে কমবেশি দেড়-দু ঘন্টা, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে প্রয়োজন প্রায় আট মিনিট; অর্থাৎ পৃথিবী-শনির দূরত্ব দুই আলোক ঘণ্টার কাছাকাছি। সেখানে যেতেই দু-বছর লাগলে কয়েক আলোকবছরের পথ যেতে মানুষের কত প্রজন্ম কেটে যাবে? এজন্য কতটুকু উন্নত প্রযুক্তির কাছে ধর্ণা দিতে হবে?…এবং আদৌ কোনো প্রাণীর পক্ষে তা করা কি সম্ভব?
