‘কী কিম্ভুত অনুপাত! এর কোনো ব্যাখ্যা আমরা পাই না-উপগ্রহের কক্ষপথ কেন একদিক থেকে আরেকদিকে ছ’গুণ বড় হবে? পিচ্চি এই উপগ্রহ প্রস্থে মাত্র আটশো কিলোমিটার। চান্দ্র টেলিস্কোপেও জিনিসটাকে কোনোমতে দেখা যায়-এই। কিন্তু এর মুখমণ্ডলে একটা আয়তাকার বিন্দু চোখে পড়ে। সেটাও কালো। এর সাথে টি এম এ একের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। দেখেশুনে মনে হয় জ্যাপেটাস গত তিনশ বছর ধরে আমাদের সামনে একটা মহাজাগতিক হুমকিস্বরূপ বিরাজ করছে, কিন্তু আমরা নিতান্ত বোকা বলেই এর মানে ধরতে পারিনি…
‘তো, এবার তুমি তোমার আসল কাজ চিনতে পেরেছ। আশা করি এই মিশনের অশেষ গুরুত্বও এবার বুঝবে। আমাদের সবার একটাই প্রার্থনা-তুমি যেন আমাদের এ নিয়ে একটা প্রাথমিক ধারণা দাও। রহস্যটা চিরদিনের জন্য ধামা চাপা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
‘এখন আর আমরা জানি না ভয় পেতে হবে, না আশা জাগাতে হবে মনের ভিতর। জানি না তুমি শনির কক্ষপথে কার সাথে দেখা করবে; ভাল, মন্দ নাকি ট্রয়ের চেয়েও লাখোগুণ পুরনো কোনো ধ্বংসাবশেষ…’
৫. শনির শশীর দেশে
পঞ্চম পর্ব : শনির শশীর দেশে
অধ্যায় ৩১. বাঁচা
কাজই যে-কোনো মানসিক আঘাতের জন্য সবচে বড় প্রতিষেধক। এখন বোম্যানের হাতে অনেক অনেক কাজ। তাকে সবার আগে ডিসকভারির জীবন ফিরিয়ে আনতে হবে।
সবার আগে লাইফ সাপোর্টের ঝক্কি। অনেক অনেক অক্সিজেন হারিয়ে গেছে, তাতে কী? রিজার্ভেশনে একজনের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জীবন-বাষ্প মজুদ আছে। প্রেশার আর টেম্পারেচার রেগুলেশন ইউনিট যথেষ্ট শক্তিমান। এগুলোর সাথে হালের নাক গলাবার কোনো প্রয়োজন পড়ে না, পড়লেও খুব কম। পৃথিবীর কম্পিউটার বেশিরভাগ কাজই করতে পারে, শুধু বিশাল সময়-পার্থক্যটা ভোগাবে। শিপের গায়ে কোনো সমস্যা থাকলে বা ছিদ্র হয়ে গেলেও সে খবর পেতে পেতেই তিন ঘণ্টা কেটে যাবে।
শিপের পাওয়ার, নেভিগেশন, প্রপেল্যান্ট সিস্টেমগুলো এখনো অক্ষত আছে। বড় কথা হল, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এর শেষ দুটির প্রয়োজন পড়বে না। শিপের কোনো পরিপূর্ণ কম্পিউটার না থাকায় পৃথিবী এই মিশনের উপর ছড়ি চালাবে।
একটা কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় বোম্যান, ভাগ্যিস, হাইবারনেশনের তিনজন তার সহকর্মী ছিল, তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়। তাহলে পাগল না হয়ে আর উপায় থাকত না। তারা মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য ট্রেনিংয়ের সময় একত্রে ছিল।
শেষবারের মতো হাইবারনেকুলাম বন্ধ করার সময় তার অনুভূতি হল এক মিশরীয় মমি চোরের মতো। সেই তিনজনই তার আগে শনিতে পৌঁছবে, কিন্তু পোলের আগে নয়। কী এক অদ্ভুত কারণে যেন সে এই ভাবনায় তৃপ্তি পায়।
পাঁচজনের খাবার আছে সাপ্লাই সেকশনে। এমনও হতে পারে-উদ্ধার পর্যন্ত সে হাইবারনেশনে না গিয়েই শনির বুকে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
সে এত লম্বা লম্বা চিন্তা বাদ দিয়ে সাম্প্রতিক ভাবনায় মশগুল হতে চাচ্ছে। সময় নিয়ে শিপের জঞ্জাল পরিষ্কার করে, সব যন্ত্রকে ঠিকমতো কাজ করতে দেখে অবাক হয়, পৃথিবীর সাথে টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো নিয়ে মাথা ঘামায়, ঘুমায় আরো কম। সে প্রথম সপ্তাহগুলোয় আসতে থাকা রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাতো-তাও অবসর সময়ে। মহাকাশ অভিযানের জন্য বাছাইকৃত সেরা জ্যোতির্বিদদের নেয়া হয়, এবারও কথাটার প্রমাণ মিলছে।
অবশেষে শিপের সমস্যা একটু একটু করে কমে এলে বোম্যান শিপকে অটোম্যাটিক রুটিনে দিয়ে পৃথিবী থেকে পাঠানো খবর আর কাগজ ঘাঁটার সময় বের করে নিল। টি এম এ-১ এর সেই চিৎকারের সময় তোেলা ভিডিওটা বারবার দেখা শুরু করেছে।
সেই একবারই। তারপর কালো কঠিন জিনিসটা আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। এরপর আর তাকে কেটে ফেলার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি, এর পেছনে যেমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ কাজ করেছে তেমনি কাজ করেছে ভয়।
চিৎকারের পরপরই চৌম্বকক্ষেত্রটা বিলীন হয়ে যায়। কেউ বলে এটা মাটি থেকে শক্তি সঞ্চয় করে, আবার কেউ বলে অভ্যন্তরীণ শক্তিকেন্দ্রের কথা।
একটা অবাক করা ব্যাপার সবাইকে ভাবায়। ব্যবহারিক বিজ্ঞানীরা সেটাকে তেমন পাত্তা না দিলেও অন্যেরা ছেড়ে কথা বলছে না। এর উচ্চতা এগারো ফুট। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচচতার মাপ নিতে গিয়ে একটা বিষম খেতে হয়, মাপ দাঁড়ায় ১:৪:৯–প্রথম তিন অবিভাজিত সংখ্যার বর্গমূল। এটা কাকতালীয় ব্যাপার হতেই পারে না। কারণ এর সঠিকত্ব অসীম। এত সুন্দর কিন্তু সরল আকারে এমন একটা জিনিস পুরো পৃথিবীর তাবৎ বিজ্ঞানকে এক করলেও বানানো সম্ভব নয়।
পৃথিবী থেকে এখন কেমন যেন গা বাঁচিয়ে চলা খবর আসছে। মিশন কন্ট্রোল পুরো ব্যাপারটা গোড়া থেকে খতিয়ে দেখতে চায়। ওরা একটু আত্মরক্ষামূলক কাজে বেশি আগ্রহী। তবে পাঠানো নজিরগুলো মজার, প্রতিরক্ষা বিভাগ কোনো এক গোপন কার্যক্রম চালিয়েছিল যার নাম প্রজেক্ট বারসুম। হার্ভার্ড স্কুল অব সাইকোলজির সেরা সেরা মনোবিজ্ঞানীরা ঊনআশিতে মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছে, অন্য সভ্য প্রাণী আছে এবং তারা মানুষের সাথে যোগাযোগ করে। এ কাজ মামুলী জিজ্ঞাসাবাদ বা অনুরোধে থেমে থাকেনি; সম্মোহন, ড্রাগ আর ভিজুয়াল ইফেক্টও ব্যবহার করা হয়েছে যত্রতত্র। এ তিন ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই মানুষের পক্ষে মিথ্যা বলা সম্ভব নয়।
