অনেক বিজ্ঞানী সোজা মাখা নাড়েন। না। তারা দেখিয়েছেন যে মানুষের দ্রুততম যান ডিসকভারির আলফা সেন্টোরিতে পৌঁছতে মাত্র বিশ হাজার বছর সময়ের দরকার। আর নীহারিকা ওরফে গ্যালাক্সির হিসাবের কাছে এ-তো নস্যিরও অধম। এমনকি আগামী শতাব্দীগুলোতে প্রপালশন সিস্টেম বা মহাকাশযান জ্বালানী-ব্যবস্থা অকল্পনীয় উন্নয়ন করলেও তাদের সামনে একটা বাধার অটল হিমালয় দাঁড়িয়ে যাবে। তা হল আলোর গতি। আলোর গতিকে পেছনে ফেলা কোনো বস্তুর কম্ম নয়, বরং তার ফলে বস্তু শক্তিতে রূপান্তরিত হবে-এমন কথাও আইনস্টাইনীয় গবেষকরা বলে বেড়ান। সেই আলোই যদি সবচে কাছের নক্ষত্র থেকে আসতে প্রায় আধযুগ লাগিয়ে দেয় তো দু-চারটি নক্ষত্রের ওপার থেকে ভিনগ্রহীদের আসতে কীরকম ভোগান্তি পোহাতে হবে তা বলাই বাহুল্য। এমন অনেক নক্ষত্র আবিস্কৃত হয়েছে যেখান থেকে আলো আসতেই কোটি কোটি বছর লেগে যাবে।
সুতরাং, টি এম এ-ওয়ানের নির্মাতারা অবশ্যই একই সূর্যের আলো পোহাতো-আর যেহেতু ঐতিহাসিক কালের মধ্যে তাদের কোনো দেখাই মেলেনি, তারা হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
আবার কয়েকজন একথা মানতে রাজী নন। শত-শত বছর লাগলেও নক্ষত্রান্তরের পথচারীরা যে আসেনি তারইবা নিশ্চয়তা কোথায়? হাইবারনেশনের প্রযুক্তি এখনি মানুষ ব্যবহার করতে পারলে তারা কেন অত উন্নত অবস্থায় পারবে না? তার উপর, তাদের জীবনকাল আমাদের সাথে তুলনা করার মানে কী? কোনো ব্যাক্টেরিয়া বাঁচে তিন ঘণ্টা (যদি ভাগ হওয়াকে মৃত্যু ধরা হয়) আবার কচ্ছপ বাঁচে সাড়ে তিনশো বছর, আবার কোনো কোনো গাছ কয়েক হাজার বছর বাঁচে-এমন কথাও বলা হয়। এ-তো পৃথিবীর পরিবেশের হিসাব। তাদের পরিবেশ হবে আলাদা, জীবনের মূল অণুও ভিন্ন হতে পারে, সুতরাং হাজার হাজার বছর বেঁচে মহাকাশ অভিযান করা কোনো ধর্তব্য বিষয় নয়।
তার উপর, স্ববাহিত কৃত্রিম জগতের কথাও মাথায় রাখতে হবে। একটি স্পেসশিপে যদি নিজেদের জগতের সবকিছু নিয়ে একটা ছোট্ট পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, সেটাই তাদের জগতে পরিণত হবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে যাবার পর লক্ষ্যে পৌঁছতে পারলেও চলবে।
টি এম এ-ওয়ান যে নিজেই খবরটা নক্ষত্রজগতে পাঠিয়ে দিয়েছে তা না ভাবলেও চলে। কারণ তার এই তরঙ্গ পৌঁছতেও অনেক সময় প্রয়োজন। কারণ এ গতিতে সংবাদ গেলে সাথে সাথে ঐ পক্ষ থেকে সাড়া আসলেও তা এখানে হাজির হতে হতে শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। অনেকের কাছেই এ এক স্বস্তির খবর।
স্বস্তিটা উবে যায় একথা শুনলে, শনি থেকে আসল খবর প্রচারিত হয়ে থাকতে পারে, অন্য গতিতে। কিন্তু স্বস্তি উবানোর মতো আরো কথাবার্তা বলে কিছু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানবিদ্বেষী বিজ্ঞানী, আমরা কি শিওর যে আলোর গতি একটা অসম্ভব বাধা, একে ভাঙা যাবে না?
এ কথা সত্যি যে আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বকে নির্ভরযোগ্য ধরা হয়। কিন্তু এ তো সত্যি যে শত বছর পেরুনোর আগেই এর গায়ে কিছু ভাঙন দেখা দিয়েছে।
যারা এসব চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয় তাদের আরেক তত্ত্ব হল আন্ত:মাত্রিক তথা ইন্টার ডাইমেনশনাল ভ্রমণ। স্থানকে একইভাবে রেখে একপাশ থেকে আরেকপাশে চলে যাওয়া-যেমন করে সুই দিয়ে কাঁথা সেলাই করা হয়, সুই কাঁথার নিচ দিয়ে কথাকে একটু মুড়ে নেয়, ফলে যায় অল্প একটু, কিন্তু কাঁথার হিসাবে তা কয়েকগুণ বেশি, কুঁড়ে ওঠে অন্যপাশে। হাইপারস্পেসিয়াল কানেক্টিভিটিও বলা হয় একে। প্রিন্সটনের গণিতজ্ঞরা একে বলতেন মহাকাশে পোকার গর্ত।
যারা এসব কথাকে মেনে নিতে পারে, আবার ভোগে দ্বন্দ্বে, তাদের জন্য আছে নিলস বোরের[৪৬] সেই হৃদয়ছোঁয়া কথা, যে কথা হাজারো পাগলাটে বিজ্ঞানীকে তাদের থিওরিতে অটল থাকার পেছনে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে, ‘তোমার থিওরি পাগলাটে, বড়ই পাগলাটে, কিন্তু বাস্তব যতটা পাগলাটে তত্ত্বটা ততো পাগলাটে নয়।’
কিন্তু পদার্থবিদরা কথা গুছিয়ে আনতে আনতেই জীববিজ্ঞানীদের কচকচি শুরু হয়ে যায়, ‘অপার্থিব প্রাণীরা দেখতে কেমন হবে?’
সাথে সাথেই তারা নিজেদের দুই বিপরীত দলে ভাগ করে ফেলে, একদল চিৎকার করে বলতে থাকে যে তারা অবশ্যই মানুষের মতো দেখতে-আরেকদল সমস্বরে উত্তর দেয়, ‘না। কক্ষনোই নয়।’
প্রথম দলের একটা ভাল দিক আছে, দ্বিপ্রতিসম প্রাণী আমরা। অর্থাৎ শরীরের ঠিক মাঝখান দিয়ে লম্বালম্বি ভাগ করলে দু-পাশে প্রায় সমস্ত অঙ্গই সমপরিমাণে এবং বিপরীতমুখীভাবে আছে। ফলে সব কাজেরই উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয়েছে প্রায় প্রতিটি অংশের বিকল্প থাকাতে, বেড়েছে গতি, যে কোনো একাংশ নষ্ট হয়ে গেলেও কাজ থামেনি, এসেছে উন্নয়ন। লম্বা দ্বিপ্রতিসমতার পা, পায়ের উপর হাত, হাতের কাছে হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, দেহের সবচে উপরে নার্ভাস সিস্টেম ও ব্রেন থাকাতে এবং সীমিত বিশালত্বের কারণে যে সুবিধা পাওয়া যায়, তাকে তারা সর্বোৎকৃষ্ট প্রাণীজ দেহ গঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অবশ্যই, এক আধটু পার্থক্য থাকবে-পাঁচের বদলে দু আঙুল, কিম্ভূতরঙা চামড়া আর চুল-এমনকি চেহারার সংগঠন ভিন্ন হওয়াতেও কিছু এসে যায় না। কিন্তু অপার্থিব বা এক্সট্রাটেরিস্ট্রিয়াল বা ই. টি. রা মানুষের সাথে এত বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হবে যে তারাও কম আলোয় দেখতে পারবে না বা খুব বেশি দূরত্ব থেকে স্পষ্ট দেখবে না।
