সে বসুন্ধরার প্রতি তার কথা জানানো শুরু করল। আরো এক ঘণ্টার মধ্যে সেসব কথা সেখানে পৌঁছবে না, যে কোনো সাড়া ফিরে আসতে আসতে সময় নেবে দু ঘণ্টা।
আর সে ভেবে পাচ্ছে না কী জবাব আসতে পারে-কীই বা তারা বলবে? একটু কৌশলে মায়া-মায়া ভাব নিয়ে তারা বড়জোর বলবে, ‘বিদায়, বন্ধু।
অধ্যায় ৩০. সেই রহস্য
হেউড ফ্লয়েড এমন দৃষ্টিতে তাকায় যেন মাত্র ছোট একটা ঘুম দিয়ে উঠেছে। তার চেহারাটা তেমনি ভাবলেশহীন। সে সৌরজগতের অপর প্রান্তে এক একাকী মানুষকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করছে। ‘সবার আগে আমরা তোমাকে এই অসম্ভব কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি, ডক্টর বোম্যান। তুমি ঠিক কাজটা সঠিক মুহূর্তে করেছ।
‘আমার বিশ্বাস আমরা তোমার হাল নাইন থাউজ্যান্ডের নষ্ট হওয়ার কারণ ধরতে পেরেছি; কিন্তু এ নিয়ে একটু পরে আলোচনা করব, কারণ এখন আর তেমন পরিস্থিতি নেই।
‘সবার আগে তোমাকে আসল কথাটা বলা উচিত- ব্যাপারটা আমরা বহু ঝামেলা করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন রেখেছি। তুমি শনির কাছাকাছি চলে যাওয়ায় এখন সত্যি কথাটা বলার সময় এসেছে। ফুল ব্রিফিং টেপগুলো পরে পাঠানো হবে। এখন যা বলব তা সর্বোচ্চ গোপনীয় খবর।
‘দু বছর আগে আমরা মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা থাকার প্রমাণ পাই চাঁদের বুকে। টাইকো জ্বালামুখে একটা দশফুটি কালো স্তম্ভ পেয়েছিলাম। দেখে নাও…’
বোম্যানের মনে হয়, এ এক অসাধারণ জিনিস, কিন্তু তার সাথে জিনিসটার কী সম্পর্ক? চিন্তাটা বাধা পায় ফ্লয়েড আবার পর্দায় ফিরে এলে:
‘আমাদের পূর্বপুরুষরা বনমানুষ থাকাকালে এটা চাঁদে পুঁতে দেয়া হয়েছিল। এত বছর পর একশিলাস্তম্ভকে অকেজো মনে করায় কোনো দোষ নেই, কিন্তু চান্দ্র সূর্যোদয়ের পরপরই সে শক্তির এক মহাবিস্ফোরণ ঘটায়। আমাদের মতে এই শক্তি বিস্ফোরণ সামান্য এক পার্শ্ব-উৎপাদন, এক পেছন ধাক্কা। ব্যাপারটা আরো ভয়াল, এক অচেনা তেজস্ক্রিয়তা। একই সময়ে আমাদের বেশ কিছু স্পেস স্টেশন, স্যাটেলাইট আর গবেষণাকেন্দ্র জানায় যে এক অচেনা বিশৃঙ্খলা সৌরজগৎকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। আমরা দিকটা ঠিকমতো ধরতে পেরেছি। লক্ষ্য ছিল শনি।
‘গবেষণায় হাজার কাগজ নষ্ট করার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছি যে জিনিসটা কোনো সৌরশক্তির যন্ত্র-অন্তত সৌরনির্দেশিত সিগন্যালিং ডিভাইস। কারণ সূর্যোদয়ের পরপরই শক্তিটা বেরিয়ে পড়ে। ত্রিশ লাখ বছর পর সূর্যের আলো পেয়েই এ কাজ করেছে সে।
‘এতদিন জিনিসটা ভালমতো কবর দেয়া ছিল সেখানে, ত্রিশ ফুট গভীরে।
‘আমরা মনে করি ত্রিশ লাখ বছর ধরে সে আমাদের অপেক্ষায় ছিল; আমরা চাঁদে যাবার মতো ক্ষমতা পাব একদিন-সেটা খুঁজে বের করব একদিন-সূর্যের আলো ফেলব একদিন-সেদিন আমাদের এই অর্জনের খবরটা চিৎকার করে সে সারা নক্ষত্রলোককে জানিয়ে দেবে।
‘তুমি হয়তো ভেবে পাচ্ছ না কী করে এর সন্ধান আমরা পেলাম। লো লেভেল অবিটাল সার্ভে চালানোর সময়ই এর অদ্ভুত চৌম্বক ক্ষেত্রের খোঁজ পাই।
‘তুমি তখনই সূর্য-শক্তির কোনো জিনিসকে মাটির এত নিচে লুকিয়ে রাখবে যখন তোমার মতলব অন্য রকম। ঠিক কোনো সময় সেটা বের করা হল? যখন বের করা হবে তখন সেটা চেঁচামেচি শুরু করবে। অন্য কথায়, মনোলিথটা এক রকমের অ্যালার্ম, আর আমরা বোকার মতো একে বাজিয়ে বসে আছি।
‘ত্রিশ লাখ বছর পরও তাদের সমাজ টিকে থাকবে কিনা তা নিয়েও বহু জল্পনা কল্পনা হয়েছে। যারা ত্রিশ লাখ বছর ধরে টিকে থাকার মতো যন্ত্র বানায় তারা সভ্যতাকেও এতদিন টিকিয়ে রাখতে জানে। তারা ক্ষতিকর কিনা তা জানতে হবে। সবাই বলে বেড়ায় যে উন্নত প্রাণী নিশ্চয়ই সহনশীল-আমরা এর তোয়াক্কা করি না। কারণ মানুষ কতটা সহনশীল তা আম জনতার অজানা নয়। কোনো ঝুঁকি নেয়া কি সম্ভব?
‘আগের ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাই যে সব সময় অনুন্নত প্রাণীরা তাড়াতাড়ি মার খেয়ে যায়। তাছাড়া রাজত্ব দেখলেও একই দিক চোখে পড়ে। নৃতত্ত্ববিদরা কালচারাল শক’ এর কথা বলে, আমাদের হয়তো পুরো মানবজাতিকে এমন এক শকের জন্য তৈরি করতে হবে। কিন্তু সবার আগে তাদের সম্পর্কে কিছু একটাতো জানতে হবে।
‘তাই, তোমার মিশন হল…তোমার মিশন ডিসকভারি ভয়েজের চেয়েও বেশি কিছু। তুমি পুরো সাড়ে ছ’শ কোটি মানুষের প্রতিভূ। তোমার লক্ষ্য একেবারে অজানা অচেনা পরিবেশে একটা পরিদর্শন শেষ করা। ডক্টর কামিনস্কির টিম এজন্য পুরো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল, এবার তোমাকে একাই তা শেষ করতে হবে…
‘সবচে বড় কথা, শনিতে বা এর কোনো উপগ্রহে উন্নত জীবন থাকা বা কোনোকালে উন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনাও খুব কম। আমরা পুরো শনি-জগত্তা চষে দেখার পরিকল্পনা কষেছি। তুমি এর একটা সরলীকৃত কাজ শেষ করতে পারবে-এটুকু বিশ্বাস আমাদের আছে। কিন্তু এবার আমাদের লক্ষ্য অন্যদিকে ফেরাতে হবে। অষ্টম উপগ্রহ-জ্যাপেটাসের দিকে। তোমার গতির সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে এলে এদিক বিবেচনা করতে হবে।
‘সৌরজগতের মধ্যে জ্যাপেটাস অনন্য। আর সব জ্যোতির্বিদের মতো তুমিও এ নিয়ে পড়ালেখা করেছ, তবু একটু মনে করিয়ে দিই। ক্যাসিনি মোলশ একাত্তরে এটা আবিষ্কার করে এও দেখতে পান যে এর অর্বিটের এক পাশ থেকে অন্যপাশের আয়তন ছ’গুণ বড়।
