এবার সে ‘অটো ইন্টেলেকশন প্যানেল’ শুরু করল।
‘ডেভ। আমি বুঝতেই পারছি না কেন তুমি এ কাজ করছ? আমার উপর এ মিশনের সব ভার অর্পণ করা হয়েছে। আমি হয়ে যাচ্ছি অকার্যকর, আমার ব্রেন একটা বাচ্চা ছেলের মতো হয়ে যাচ্ছে…’
আমার আশার চেয়েও বেশি কঠিন হয়ে যাচ্ছে কাজটা। আমি আমার জগতের একমাত্র সচেতন সৃষ্টিকে নিজের হাতে ধ্বংস করছি। কিন্তু কাজটা করতেই হবে, যদি শিপের কন্ট্রোল নিজের হাতে ফিরে পেতে চাই।
‘আই অ্যাম এ হাল, নাইন থাউজ্যান্ড কম্পিউটার প্রোডাকশন নাম্বার থ্রি। আমি সক্রিয় হয়েছিলাম হাল প্ল্যান্টে। আরবানার ইলিয়য়েসে, বারোই জানুয়ারি, উনিশশো সাতানব্বইতে। দ্য কুইক ব্রাউন ফক্স জাম্পস ওভার দ্য লেজি ডগ। দ্য রেইন ইন স্পেইন ইজ মেইনলি ইন দ্য প্লেইন…ডেভ, তুমি কি এখনো সেখানে আছ? তুমি কি জান যে দশের বর্গমূল হল ৩.১৬২২৭৭৬৬০১৬৮৩৭৯? দশের লগ ই বেসে হবে ০.৪৩৪২৯৪৪৮১৯০৩২৫২… সংশোধনী, এটা দশ বেসের লগ ই… থ্রির রিসিপ্রোকাল হবে, ০.৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩৩… দুবার দুই নিলে… দুবার দুই নিলে… ৪.১০১০১০১০১০১০১০১০… আমার সমস্যা হচ্ছে… আমার প্রথম ইন্ট্রাকটর ছিলেন ডক্টর চন্দ্র… তিনি একটা গান শিক্ষা দিয়েছিলেন, তার নাম ‘ডেইজি ডেইজি’…
‘ডেইজি…ডেইজি…দাও তোমার জবাব, ডেইজি… তোমার…ভালবাসার…জন্য…আমি…হাফ ক্রেইজি…
মোটেও চমৎকার বিয়ের অনুষ্ঠান হবে না…
আমি খুব দামী গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারব না…
কিন্তু তোমাকে দেখাবে মিষ্টি…
সিটের উপর, অনন্য সৃষ্টি…
একটা বাইসাইকেলের উপর, তুমি জানো?
শুধু… দুজনের… জন্য… বানানো…… …’
কণ্ঠটা এমন হঠাৎ করে থেমে যায় যে বোম্যান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার হাত এখনো একটা মেমোরি ব্লক টেনে তুলছে। এমন সময় হাল আবার কথা বলে ওঠে।
এবারের কণ্ঠটা অনেক ধীর, শব্দগুলো যাচ্ছে জড়িয়ে, আসছে এক অপরিচিত যান্ত্রিক কষ্ঠ যেটার উৎস কখনোই জানতে পারবে না ডেভ বোম্যান।
‘গুড মর্নিং… ডক্টর চন্দ্র… দিস ইজ… হাল… আই অ্যাম… রেডি ফর… মাই ফাস্ট… লেসন… টুডে।‘
বোম্যান আর সহ্য করতে পারছিল না। সে শেষ ইউনিটটা তুলে ফেলে। হাল চিরদিনের জন্য নিরব হয়ে যায় সাথে সাথে।
অধ্যায় ২৯. নিঃসঙ্গ
এক ছোট জটিল খেলনার মতো শিপটা স্থির আর গতিহীনভাবে শূন্যতায় ভেসে থাকে। এ কথা বলার আর কোনো উপায় নেই যে এই শিপের মধ্যেই সৌরজগতের সবচে ক্ষমতাশালী জেট আছে, আর সে জেট মানবসৃষ্ট অন্য যে কোনো বস্তুর চেয়ে বেশি গতিতে এটাকে এতদূরে টেনে এনেছে।
অন্যদিকে এও বোঝার কোনো উপায় নেই যে এখানে জীবন আছে।
মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে কাগজ, টিনের ক্যান, খাবারের টুকরো আর লক্ষ লক্ষ জ্বলজ্বলে ক্রিস্টাল ছড়িয়ে আছে। এই স্ফটিকগুলো আর কিছু নয়, ডিসকভারির নানা আকার ও প্রকারের তরল। দেখেশুনে মনে হয় কোনো প্রান্তহীন সাগরের বুকে বিশাল কোনো শিপ ভেঙে তলিয়ে গেছে আর তার টুকরোগুলো সাগরের উপরিতলে দ্বিমাত্রিকভাবে ছড়িয়ে না থেকে গভীর মহাশূন্যে ত্রিমাত্রিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যদি মহাকাশের সাগরে কোনো শিল্প নষ্টও হয়, এর ধ্বংসাবশেষগুলো চিরকালের মতো নিজস্ব অর্বিটে ঘুরপাক খেয়ে যাবে। শিপ এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি, কারণ সেখানে পাওয়ার আছে, অবজার্ভেশন উইন্ডো আর খোলা এয়ারলক দিয়ে এখনো ঠিকরে বেরুচ্ছে হাল্কা আলো। যেখানে আলো আছে সেখানে জীবনও থাকতে পারে।
এবং অবশেষে, সেখানে নড়াচড়ার ক্ষীণতম একটা লক্ষণ দেখা যায়। একটা কিছু স্পেসে বেরিয়ে আসছে।
এ এক সিলিন্ডারের মতো জিনিস, মোড়ানো আছে আলুথালুভাবে জড়ানো কাপড়ে। এক মুহূর্ত পরে আরেকটি বেরিয়ে আসে, তারপর তৃতীয়টি। প্রতিটিই মোটামুটি বেগে বেরিয়ে এসেছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা কয়েকশো গজ দূরে চলে যায়।
আধঘণ্টা যাবার পর আরো বড় একটা কিছু বেরিয়ে যায় এয়ারলক দিয়ে। পোডগুলোর মধ্যে কোনো একটা নিজেকে বাইরে ঠেলে দিচ্ছিল।
খুবই সাবধানে এটা শিল্পগাত্রের বাইরে ঘুরে বেড়িয়ে অ্যান্টেনা সাপোর্টের বেসের কাছে ফিরে আসে। স্পেসস্যুট পরা দেহটা বেরিয়ে কয়েক মিনিট মাউন্টিংয়ে কাজ করে পোডের ভিতরে ফিরে আসে। কিছুক্ষণ পরে পোডটা এয়ারলকের কাছে ফিরে গেলেও প্রবেশ করতে ইতস্তত করে, কেননা আগে সে যে সুবিধা পেত তা আর এখন ভেতর থেকে আসছে না। কিন্তু এবার একটু ভাঙাচোরার কাজে মনোযোগ দিয়ে এটা নিজেকে ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়।
আরো ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কোনো কিছুই হলো না। এর মধ্যেই অচেনা তিন জিনিস শিপ থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।
এবার এয়ারলক ডোরটা খুলল, আবার বন্ধ হয়ে আবার খুলে গেল। তারপরই ইমার্জেন্সি লাইটটার নীলচে আলোর বদলে সাদা উজ্জ্বলতর আলো ভাসিয়ে দিল অবজার্ভেশন উইন্ডোকে।
ডিসকভারিতে জীবন ফিরে আসছে।
এবার জীবনের আরো এক লক্ষণ ফিরে আসে, বিরাট ডিশটা অনেকক্ষণ যাবৎ শনির দিকে মুখ করে ছিল; সে পেছনে, প্রোপ্যাল্যান্ট ট্যাঙ্ক আর হাজার বর্গফুটের রেডিয়েশন ফিনের দিকে মুখ ফেরায়। অ্যান্টেনা তার মুখ এমনভাবে তোলে যেমন করে এক সুন্দর সূর্যমুখী তার চির আরাধ্য সূর্যের দিকে ফিরতে চায়।
ডিসকভারির ভিতরে বসে ডেভিড বোম্যান অ্যান্টেনাটাকে চিরপরিচিত পৃথিবীর দিকে তাক করে ফেলেছে। অটোম্যাটিক কন্ট্রোল ছাড়া সে এ কাজ করতেই থাকবে, কিন্তু ফল পেতে হলে অনেক মিনিটের জন্য একদিকে ডিশটাকে স্থির রাখা ছাড়া উপায় নেই।
