কামিনস্কি আর হান্টারের বেলায়ও একই ব্যাপার ঘটেছে। সে তাদের কখনোই ভালমতো চিনত না, আর চিনতে পারবে না কখনোই।
ডেভ বোম্যান এখন একটা বায়ুহীন, আংশিক অকেজো শিপে পৃথিবী থেকে সব যোগাযোগের বাইরে এমন একজন মানুষ যার সাত আট কোটি মাইলের মধ্যে দ্বিতীয় কোনো প্রাণী নেই।
কিন্তু সে আসলে এখনো একদম একা হতে পারেনি। কাজের ফাঁকে কোনো এক সময় পুরোপুরি একা হয়ে নিতে হবে।
.
বোম্যান এর আগে কখনোই স্পেসস্যুট পরে সেন্ট্রিফিউজের ভিতর দিয়ে যায়নি। কাজটা একটু স্পষ্ট। কিন্তু মোটেও সহজ নয়। ভেসে বেড়ানো টুকরাগুলো কাজে খুব সমস্যা করবে।
সামনে একটা প্যানেলের উপর আঠালো লাল তরল দেখা যায়। ফুড ক্যান আর অন্যান্য জিনিস দেখে বুঝতে পারে যে কোনো এক ডিস্পেন্সার থেকে জিনিসটা পড়েছে। জেলি বা জ্যাম হতে পারে। পাশ কাটিয়ে গেল। সাথে সাথে বিশ্রীভাবে জিনিসটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
ধীরে ঘুরতে থাকা ড্রামটা থেকে বেরিয়ে কন্ট্রোল ডেকের দিকে ভেসে যেতে হবে। একটা ছোট সিঁড়ি দেখে সে উঠতে শুরু করে। স্যুটের আলো নড়েচড়ে পড়ছে মইটার উপর।
বোম্যান এর আগে খুব কমই এসেছে এখানে, কারণ এর আগে এখানে তার তেমন কোনো কাজ ছিল না। এবার সে একটা ছোট গোলাকার দরজার কাছে এসে পড়েছে যেখানে লেখা আছে:
যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যতিরেকে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
আপনি সার্টিফিকেট এইচ, নাইনটিন পেয়েছেন কি?
পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন এলাকা। স্যুট অবশ্যই পরিষ্কার থাকতে হবে।
দরজাটা লক করা না থাকলেও সেখানে তিনটি সিল লাগানো আছে। প্রতিটিতেই এক একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির চিহ্ন। তার মধ্যে একটা অ্যাস্ট্রোনটিক্স এজেন্সির। কিন্তু যদি এখানে স্বয়ং প্রেসিডেন্টের সিলও থাকত, বোম্যান তা ভাঙতে একবিন্দু দ্বিধাও করত না।
সে এখানে মাত্র একবার এসেছিল যখন কাজ শেষ হয়নি। ভুলেই গিয়েছিল যে এখানেও একটা ছোট্ট লেন্স আছে যেটা ভিশন চেম্বারকে দেখাশোনা করে। এই ভল্টের ভিতরে অনেক কলাম আর সারিতে কঠিন কঠিন লজিক ইউনিট আছে। চেম্বারটা দেখতে ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট ভল্টের মতো।
সে মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারে যে সেই চোখটা তার উপস্থিতিতে হতচকিত হয়ে পড়েছে। শিপের লোকাল ট্রান্সমিটারটা কেউ অন করেছে, কারণ একটা হিসহিসানি শুনতে পেয়েছে সে। তারপর স্যুটের স্পিকারে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে:
‘লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে কোনো একটা গণ্ডগোল হয়েছে, ডেভ।‘
বোম্যান কোনো উত্তর দেয় না, সে যে কথাটা শুনেছে এমন ভাবও দেখা যায় না। সে মন দিয়ে লজিক ইউনিটের ছোট্ট লেবেলগুলো পড়ে দেখছে। কার্যনীতি দেখছে মনোযোগ দিয়ে।
‘হ্যালো, ডেভ।’ এবার হাল বলল। ‘তুমি কি সমস্যাটা খুঁজে পেয়েছ?’
এক প্রচণ্ড কৌশলী অপারেশন সারতে হবে, কারণ এখানে হালের পাওয়ার সাপ্লাই কাটার কথা নয়, আরো বেশি কিছু জড়িত। সে এরপর পৃথিবীর কোনো আত্নঅসচেতন কম্পিউটারের সাথে যোগাযোগ করবে। হালের ক্ষেত্রে ছয়টির উপর আলাদা পাওয়ার সিস্টেম আছে যার মধ্যে একটা নিউক্লিয়ার আইসোটোপ ইউনিট। সেটা শিন্ডের ভিতরে থাকে। সে সাধারণভাবে, ‘প্লাগ তুলে ফেলতে’ পারে-যদি করেও, সেটা শুধুই ধ্বংস ডেকে আনবে।
হাল ছিল শিপের নার্ভাস সিস্টেম। তাই তার দেখাশোনা ছাড়া ডিসকভারি একটা মেকানিক্যাল আবর্জনায় পরিণত হবে। যা করতে হবে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। এই অসুস্থ কিন্তু চমৎকার ব্রেনের নিজস্বতার অংশটুকুকে অকেজো করে দিয়ে তার সাধারণ কাজ চালানোর দিকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বোম্যান অন্ধভাবে কাজটা করতে চায় না, কারণ তার ট্রেনিংয়ের সময় এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু তখন কেউ কল্পনাও করেনি যে বাস্তবে সমস্যাটা দেখা দিতে পারে। তার জানা আছে, ঝুঁকিটা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে যদি একটাও ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হয় তাহলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সব ফুরিয়ে যাবে।
‘আমার মনে হয় পোড বে ডোরের কোথাও গণ্ডগোল আছে। হাল যেন চিরাচরিত কোনো কথা বলছে। ভাগ্য ভাল যে তুমি মারা পড়নি।’
এই হল শুরু-ভাবল বোম্যান-আমি কখনোই ভাবিনি যে বৃহস্পতির অর্বিটেরও পেছনে কোনোদিন আমি একজন হাতুড়ে ব্রেন সার্জেন্ট হয়ে মাথার অপারেশন করব।
সে কগনিটিভ ফিডব্যাক লেবেলআঁটা সেকশনটার লকিং বার খুলে ফেলল। এরপরই প্রথম মেমোরি ব্লক টেনে তোলে। এই অসাধারণ ত্রিমাত্রিক ছোট্ট জিনিসটায় লাখ লাখ সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে। ব্লকটা আকারে এত ছোট যে মানুষের হাতেই জায়গা করে নিতে পারে। মুক্ত হয়েই ভাসা শুরু করল পুরো ভল্ট জুড়ে।
‘হেই, ডেভ। কী করছ?’
আমার সন্দেহ হয় শালা ব্যথা পায় নাকি। হয়তো পায় না। কারণ মানুষের মতো তার কোনো নার্ভাস সিস্টেম নেই। মানুষের মাথা অবশ করা ছাড়াও অপারেশন করা সম্ভব।
সে তুলে ফেলা শুরু করল। একের পর এক। ইগো রিইনফোর্সমেন্ট’ লেখা ব্লকগুলোকে এরপর মুক্তি দিল। প্রতিটি ব্লকই হাত থেকে মুক্তি পেয়ে দেয়ালে ধাক্কা খাবার আগ পর্যন্ত উড়ে যাচ্ছে।
‘দেখ, ডেভ, আমার ভিতরে বহু বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত আছে। ডেভ। আমাকে গড়তে অনেক অনেক শ্রম প্রয়োজন ছিল। বোঝার চেষ্টা কর।‘
কয়েক ডজন ইউনিট উপড়ে ফেলা হলেও কম্পিউটারটি এখনো খেই হারিয়ে ফেলেনি। এর ভিতর মানুষের দক্ষতা আছে, আছে অতিমানবীয় মস্তিঙ্ক।
