সেন্ট্রিফিউজের গোল করিডোর ধরে সব বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে সাথে করে হালকা কাপড়চোপড়, কাগজের টুকরো, খাবারের প্লেট, গ্লাস ইত্যাদি নিয়ে। যা বাধা
নেই তাই উড়ে সেদিকে যাওয়া শুরু করেছে। এবার চারদিকে গর্জনরত অন্ধকার নেমে এল, মাত্র একবার বোম্যান দৃশ্যটা দেখার সুযোগ পেয়েছে, দ্বিতীয় সুযোগ দেয়নি হাল।
কিন্তু সাথে সাথেই আরো ভাল ইমার্জেন্সি লাইট জ্বলে ওঠে। এর নীলচে আলোয় দু:স্বপ্নটা এবার পূর্ণতা পাবে। এমনকি এই আলো ছাড়াও বোম্যান সর্বত্র যেতে পারবে, সে তার আশপাশটা ভালমতোই চেনে। তবু এই আলো এক আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে, তার নিজেকেই ভেসে বেরুতে হবে না।
সেন্ট্রিফিউজ এত ভর আর গতি সইতে না পেরে কাঁপছে, যে কোনো সময় এর বেয়ারিংগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমন হলে ঘূর্ণনরত চাকাটি শিপকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তাতেও কিছু এসে যাবে না যদি সে সময়ের মধ্যে নিজের সবচে কাছের শেল্টার হাউসে না পৌঁছায়।
এখনই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যেই প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে বায়ুচাপ এক থেকে দুই পাউন্ডে নেমে এসেছে। হ্যারিকেনের শব্দ হালকা হয়ে যাচ্ছে, কারণ বেরুনোর মতো বাতাস খুব একটা নেই। পাতলা বাতাস শব্দ পরিবহন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। বোম্যানের ফুসফুস এত বেশি পরিশ্রম করছে যেন সে এভারেস্টের চূড়ায় এখন দাঁড়ানো। আর সব ঠিকমতো ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোকের মতো সেও ভ্যাকুয়ামে এক মিনিট টিকে থাকতে পারবে-যদি সেজন্য প্রস্তুতির সময় মিলে যায়। কিন্তু সময় বেশি নেই। তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব আসার আগে সে মাত্র পনের সেকেন্ড সময় পেল।
এরপরও বোম্যান দু-এক মিনিট বায়ুহীন অবস্থায় পুষিয়ে নিতে পারবে যদি ঠিকমতো শুধু চাপটা ফিরিয়ে দেয়া হয়। শরীরের তরলগুলো ফোঁটা শুরু হতে অনেক সময় লাগে, কারণ সেসব থাকে বিভিন্ন নিরাপদ অঙ্গ আর তন্ত্রে। ভ্যাকুয়ামে টিকে থাকার সর্বোচ্চ সময় পাঁচ মিনিট। সেটা কোনো পরীক্ষা ছিল না, লোকটাকে সময় মতো বাঁচানো সম্ভব হয়। সে বেঁচে গেলেও প্যারালাইসিস থেকে কোনোদিন সুস্থ হতে পারেনি।
কিন্তু এসবে বোম্যানের কিছু এসে যায় না। ডিসকভারিতে এমন কেউ নেই যে তাকে চাপ ফিরিয়ে দিতে পারবে। চাপ না থাকলে শরীরের প্রতিটি তরল অণু বাষ্পে পরিণত হবে, পুরো শরীর বেলুনের মতো ফুলে উঠে ফেটে যাবে কিছুক্ষণ পরই। নাহ, তার নিজের চেষ্টাতেই নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। আর কোনো উপায় নেই।
এমনিতেই এখানে চাঁদের মতো অভিকর্ষ, তার উপর সৌভাগ্যবশত নড়াচড়া একেবারে সহজ হয়ে গেছে। এখন আর বাতাস চারদিক থেকে চাপ দিয়ে তাকে এক জায়গাতে আটকে রাখছে না, বরং উড়ন্ত প্রজেক্টাইলের মতো তার পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। করিডোেরের বাঁকের মাথায় হলুদ রঙা ইমার্জেন্সি শেল্টার লেখাটা জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে এগিয়ে যায়, হ্যাঁন্ডেল ধরে টানে, নামিয়ে আনে দরজা।
একটা ভয়াবহ মুহূর্তের জন্য সে মনে করেছিল দরজাটা আটকে আছে। এরপর দরজা ভিতরে পড়ে গেলে সে সাথে সাথে নিজের শরীর দিয়ে সেটাকে বন্ধ করে দেয়।
ছোট্ট কিউবিকলটায় কোনোক্রমে একজন মানুষ আর একটা স্পেস স্যুট এঁটে যাবে। ছাদের কাছাকাছি একটা ছোটখাট সিলিন্ডার দেয়ালে ঝুলছে, সেটায় লেখা, ‘ও টু-বন্যা’। বোম্যান তার শেষ শক্তিবিন্দু নিয়ে হ্যাঁন্ডেল ধরেই টেনে দেয়।
ঠাণ্ডা, বিশুদ্ধ অক্সিজেন তার ফুসফুসকে ভরে দেয় সাথে সাথে। প্রেশার বাড়ার সাথে সাথে অনেকক্ষণ ধরে সে হাঁপাতে থাকে। আরামে শ্বাস নিতে পারার সাথে সাথেই ভাটা বন্ধ করে দেয়, এটা পরে কাজে লাগবে। বড়জোর আর দুবার এই ঘর ভরে তোলা যাবে সিলিন্ডারটা দিয়ে। শিপ এখন খালি, কোনো বাতাস নেই, কোনো গর্জন নেই, নেই কোনো বায়ুচাপ।
পায়ের নিচের কাঁপন বুঝিয়ে দেয় এখনো শিপটা মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করে যাচ্ছে, সে কান পাতে দেয়ালে। বাইরে কী হচ্ছে তা জানতে হবে। এখন যে কোনো দৃশ্য দেখেই সে বিশ্বাস করবে। কারণ এখন সে অবাক হওয়া ভুলে গেছে।
কোনো শব্দ নেই। একটা বিশাল কম্পন বুঝতে পারে বোম্যান। একমাত্র স্পেসশিপের মূল প্রাস্টার চালু হলেই এ কম্পন ওঠা সম্ভব। ডিসকভারির পথ বদলে দেয়া হয়েছে!
সে চাইলে এখানে স্পেসস্যুট ছাড়াই ঘণ্টাখানেক বেঁচে থাকতে পারে। এই ছোট্ট চেম্বারের অব্যবহৃত অক্সিজেনটুকু অকারণে নষ্ট করতে তার কষ্ট হয়। তাছাড়া বসে বসে অপেক্ষা করে কী হবে? সে জানে এখন কী করণীয়, যত দেরি করবে কাজটা ততই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
স্পেসস্যুটে ঢুকে দরজা খুলে দিতেই অক্সিজেনটুকু ওপাশে হারিয়ে যায়, একই সাথে বেরিয়ে আসে ডেভিড বোম্যান। এখনো ডিসকভারির গ্র্যাভিটি ঠিক আছে দেখে সে মনে মনে সন্তুষ্ট বোধ করে। আরো একটা কথা ভেবে আরো আশ্বস্ত হয়। অভিকর্ষটা বাড়ানো হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে চিন্তা করার সময় নেই।
ইমার্জেন্সি লাইট এখনো জ্বলছে, তার উপর স্যুটের বাতিতো আছেই। সে বাঁকানো করিডোর ধরে হাইবারনেকুলামের দিকে এগিয়ে যায়।
প্রথমেই হোয়াইটহেড। তার ধারণা ছিল হাইবারনেটররা জীবনের কোনো চিহ্ন দেখায় না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, ধারণাটা ভুল। মৃত আর হাইবারনেটরের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক রয়েছে। সে যা ধারণা করেছিল তা এতক্ষণে চোখে পড়ে। সে ডিসপ্লে আর লাল বাতি দেখেছে।
