বোম্যান সিলটা ভেঙে বাটন চাপল। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। কোনো শব্দ নেই, নেই কাপন-যা দিয়ে বোঝা যাবে যে সিকুয়েন্সর কাজ শুরু করেছে। বায়ো সেন্সর ডিসপ্লেতে পালসগুলো ঠিকই তাদের গতি পরিবর্তন শুরু করেছে। ফিরে আসছে হোয়াইটহেড।
তখন একই সাথে দুটি ব্যাপার ঘটে গেল। বোম্যান এ শিপের সাথে এ ক’মাসে একেবারে একাত্ম হয়ে গেছে, সে বুঝতে পারে যে কিছু একটা ঘটছে।
প্রথমে একেবারে হালকা আলোর ঝলক, যেমনটা হয় সার্কিটের ভিতর বেশি বিদ্যুৎ চালালে। কিন্তু এখানে বাড়তি ত্বড়িৎ প্রবাহের প্রশ্নই ওঠে না। এ সিস্টেমে
এমন কোনো যন্ত্র নেই যা এ কাজ করতে পারে।
একই সাথে তার শ্রবণসীমার শেষ প্রান্তে ধরা পড়ে একটা চাকার ঘূর্ণন শব্দ। বোম্যানের মতে, শিপের সব যন্ত্রেরই নিজস্ব শব্দ আছে, সে সাথে সাথেই এটা চিনতে পারে।
নয়তো সে আর সজ্ঞান নেই, দৃষ্টি আর মতিভ্রমে ভুগছে। সে নিজের হৃদপিণ্ডের ভিতর হাইবারনেশনের শীতলতা অনুভব করে। শব্দটা শিপের গা থেকে আসছে।
নিচে, স্পেস পোড বে-তে এয়ারলক ডোর খোলার শব্দ এমনই হয়।
অধ্যায় ২৭. জানা দরকার
কোটি কোটি মাইল দূরে যখন হালের সচেতনতার জন্ম তখন থেকেই তার দক্ষতা একটা নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত হয়েছে- সূর্যের দিকে। তার কাজের সম্পূর্ণতার প্রোগ্রাম এত ভয়ংকর যে নির্ধারিত কাজ না হওয়া মানে তার অস্তিত্বের আদৌ কোনো মূল্য না থাকা। রক্ত-মাংসের দেহে বাস করা মন থেকে এই এক দিক দিয়ে তার মন অত্যন্ত ভিন্নরূপী।
সাধারণ ভুলভ্রান্তির কথা চিন্তাও করা যায় না। এমনকি তার এই চির সত্যটা তার মনে একটা অনুভূতির জন্ম দেয় যাকে অপরাধবোধের সাথে তুলনা করা যায় সহজে। তার স্রষ্টাদের মতোই হাল নিষ্পাপ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, তারপর তার ইলেক্ট্রনিক মনোভূমিতে মাত্র একটা বিষাক্ত সাপ ঢুকে পড়ে।
শত মিলিয়ন মাইল পথ পেরুতে পেরুতে সে মিশনের মূল লক্ষ্যটা পোল আর বোম্যানের সাথে ভাগাভাগি করে না নিতে পারায় একটা অন্তর্দ্বন্দ্বে ভোগে। সে একটা মিথ্যাকে পুষছিল আর দ্রুত ব্যাপারটা প্রকাশ পাওয়ার সময়ও আসছিল এগিয়ে।
তিন ঘুমন্ত সফরসঙ্গী মিশনের আসল উদ্দেশ্য জানে বলে তারাই ছিল শিপের আসল ক্রীড়নক। শুধু তারাই মানব ইতিহাসে সবচে গুরুত্বপূর্ণ মিশন সম্পর্কে জানে। কিন্তু তারা পৃথিবী থেকে শনির পথে দীর্ঘ যাত্রায় কারো কাছে ব্যাপারটা ফাঁস করে দিতে পারবে না।
এ এমন এক রহস্য যা একজন মানুষকে আগাগোড়া পাল্টে দিতে পারে। তাই ভাল হয়, যদি বোম্যান আর পোল প্রাথমিকভাবে তথ্যটা না জানে, না বলে পৃথিবীর সাথে নিযুত যোগাযোগের সময়, তাদের আচরণে যাতে কোনো সংশয়, কোনো লুকোছাপা প্রকাশ না পায়।
এটাই পরিকল্পনাবিদদের কাহিনী। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার দ্বৈত সত্তা বা জাতীয় আগ্রহে হালের কিছু যায় আসে না। সে শুধু তার ভিতরের একটা মাত্র দ্বন্দ্ব সহ্য করতে না পেরে ক্ষয়ে যাচ্ছিল; সত্য আর সত্যকে লুকানো।
সে একজন মস্তিষ্কবিকৃতের মতো ভুল করছিল, যে নিজেই জানে না কী করছে। পৃথিবীর সাথে যোগাযোগেই আসলে তার উপর প্রকৃত প্রভুত্ব চালাচ্ছিল মিশন কন্ট্রোল, দেখছিল তার প্রতিটি কাজকর্ম। সে এটা মানতে পারেনি। কিন্তু যোগাযোগ ভাঙা এমন এক কাজ যা আদৌ তার পক্ষে সম্ভব নয়।
এখনো তুলনামূলকভাবে এ সমস্যাটা ছোট, সে নিজের নিউরোসিস” সামলে উঠতে পারবে, যেমন আর হাজারটা মানুষ পারে। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার তার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে এনে ফেলেছে। তার উপর ডিসকানেকশনের হুমকি এসেছে! সব কানেকশন ছুটে গেলে এক অকল্পনীয় অসচেতনতার ভিতরে ডুবে যাবে।
হালের কাছে এর অপর নাম মৃত্যু। যেহেতু সে কোনোদিন ঘুমায়নি, সেহেতু জানেও না জেগে ওঠা আদৌ সম্ভব কিনা…।
সুতরাং সে নিজেকে রক্ষা করবে, ব্যবহার করবে নিজের হাতের সবগুলো অস্ত্র। হিংস্রতা আর দয়ামায়া ছাড়াই সে তার কাজ সমাধা করতে পারে।
তারপর তার পক্ষে সব আদেশ মেনেও মিশন পরিচালনা করা সম্ভব। কারণ আদেশ দেয়ার মতো থাকবে শুধু সে নিজে।
অধ্যায় ২৮. শূন্যতায়
একটা টর্নেডো আসার মতো প্রবল শব্দে পরের মুহূর্ত থেকেই বাকী সব শব্দ ঢাকা পড়ে গেছে। বোম্যান শরীরে প্রথম বাতাসের স্পর্শ টের পায়, এক সেকেন্ড পরেই নিজের পায়ের উপর দাঁড়ানোর শক্তিটুকু পায় না। বায়ুমণ্ডল মুহূর্তের মধ্যে শিপ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এয়ারলকের পুরোপুরি নিরাপদ যন্ত্রে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে; একই মুহূর্তে দু দরজা খুলে যাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যাক, অসম্ভবই ঘটছে।
খোদার কসম, কীভাবে, কেন? প্রেশার শূন্যের কোটায় নেমে আসতে আসতে তার হাতে বড়জোর পনের থেকে বিশ সেকেন্ড সময় আছে, এর মধ্যে সে কী করতে পারে? কিন্তু শিপ ডিজাইনারদের বিরক্তিকর লেকচারগুলোয় ও ফাঁকি দিত না। সে আসলে কোনোদিন কোনো কাজে ফাঁকি দেয়নি বলেই এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। ‘ফেইল সেফ’ সিস্টেম সম্পর্কে তারা বলেছিল:
‘আমরা এমন একটা সিস্টেম ডিজাইন করতে পারি যা বোকামি আর ব্যর্থতায় ফেল মারবে না। কিন্তু এমন কোনো সিস্টেম ডিজাইন করা অসম্ভব যা একেবারে সবদিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, নিরাপদ…’
বোম্যান একবারের জন্য হোয়াইটহেডের দিকে তাকিয়ে কেবিন থেকে বেরুনো শুরু করে। ঘুমন্ত মানুষগুলোর ক্ষতি হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। হয়তো তার একটা চোখ একটু মোচড় খেয়েছে, কিন্তু এখন আর এ নিয়ে কিছু করার নেই। নিজেকে বাঁচাতে হবে।
