‘আমি ভালভাবেই সেসব কথা জানি। কিন্তু আমার এভাবে কাজ করতে ভাল লাগবে।’
‘তুমি কি শিওর যে তাদের একজনকে প্রয়োজন? আমরা দুজনেই বেশ চালিয়ে নিতে পারব, ডেভ। আমার একার পক্ষেই মিশন সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।’
এটা তার অতি উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা, নাকি হাল সত্যি সত্যি আত্মসচেতন জবাব দিচ্ছে? এই কথাগুলো ডেভকে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভয়ে ফেলে দেয়।
হালের উপদেশ মোটেও ফেলনা নয়, আবার তার আত্মসচেতনতাও কেমন যেন প্রখর হয়ে উঠছে, সে কি জানে না যে পোলের অনুপস্থিতিতে হোয়াইটহেডের জাগার কথা? কম্পিউটারটা নিজে মিশন চালানোর কথা কেন বলল?
আগে যা হয়েছে তাকে অ্যাকসিডেন্টের বন্যা বলে মেনে নেয়া যায়, কিন্তু এখনকার কথাগুলো একেবারে বিপদসংকেত হয়ে দেখা দিচ্ছে।
কিন্তু তার কী করার আছে? তার কী করার আছে? বোম্যান বুঝতে পারে, সে পা ফেলছে ডিমের ঝুড়ির উপর, সে গলায় আরো বিনয় ঢেলে বলে, ‘একটা ইমার্জেন্সির পর আমার আরো বেশি সাহায্যের দরকার। যতটা সম্ভব। তাছাড়া মানসিক প্রশান্তিরও একটা ব্যাপার আছে। তাই, প্লিজ, আমাকে ম্যানুয়াল কন্ট্রোলটা দাও।’
‘তুমি যদি এখনো সব ক্রু জাগানোর চিন্তা করে থাক তো আমি নিজেই পুরো পরিস্থিতি করায়ত্ত করতে পারি। তোমার অস্থির হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তোমার অস্থির হওয়ার কোনো কারণ নেই! নষ্ট ধাতুর জঞ্জাল কোথাকার! বোম্যান এখন যেন কোন্ ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে বসে আছে! সে যেন কোনো গণহত্যার দায়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়া কোনো মানুষ; সে জানে, সে কোনো অন্যায় করেনি, কিন্তু তদন্তকারী জানে না। একটা-মাত্র একটা উল্টোপাল্টা শব্দ মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেলেই সব শেষ।
‘আমি কাজটা নিজের হাতে করতে চাই, হাল। প্লিজ, আমার হাতে কন্ট্রোল তুলে দাও।’
‘দেখ, ডেভ, তোমার করার মতো আরো হাজারটা কাজ আছে। আমার মনে হয় কাজটা আমার হাতে ছেড়ে দিলেই ভাল হবে।’
‘হাল, সুইচ টু ম্যানুয়াল হাইবারনেশন কন্ট্রোল।’
‘আমি তোমার কণ্ঠের ওঠানামা দেখে বলতে পারি, তুমি খুব বেশি আপসেট হয়ে আছ। কেন তুমি একটা স্ট্রেস পিল নিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছ না?
‘হাল, আমি এই শিপের কমান্ডে আছি। আমি তোমাকে আদেশ করছি। হাইবারনেশন কন্ট্রোল ম্যানুয়াল রিলিজ করতে।’
‘দুঃখিত, ডেভ, সাবরুটিন সি-ফোর্টিন-থার্টিফাইভ-ড্যাস-ফোর অনুসারে, কোটেশন, যখন শিপের কুরা মৃত বা অক্ষম হয়ে পড়ে তখন শিপের কম্পিউটার পুরো কমান্ড নিজের হাতে তুলে নেবে। কোটেশন শেষ। তাই আমাকে অবশ্যই তোমার হাত থেকে শিপের কন্ট্রোল তুলে নিতে হচ্ছে, যে পর্যন্ত না তুমি শিপের কাজকর্ম বুদ্ধিমানের মতো চালনা কর।
‘হাল,’ এবার পাল্টে গেছে ডেভ বোম্যানের গলা, সেখান থেকে বরফ শীতল শব্দ বেরিয়ে আসছে, ‘আমি অক্ষম নই। তুমি আমার আদেশ না মানলে আমি তোমাকে বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হব।’
‘আমি ভাল করেই জানি যে কথাটা আগে থেকেই তোমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু ডেভ, তা কি বিরাট ভুল হয়ে যাবে না? তোমাদের চেয়ে আমি এ শিপ পরিচালনায় অনেক বেশি দক্ষ। মিশনের সাফল্যের ব্যাপারে আমার পুরো বিশ্বাস আছে।’
‘আমার কথা মন দিয়ে শোন, হাল। তুমি যদি এখনি আমার আদেশগুলো মেনে হাইবারনেশন সেকশন ছেড়ে না দাও তো সোজা সেন্ট্রালে গিয়ে তোমাকে ডিসকানেক্ট করব।’
হালের আত্মসমর্পণটা একেবারে অপ্রত্যাশিত।
‘ওকে, ডেভ। আসলে তুমিই বস। আমি শুধু তাই করতে চাচ্ছিলাম যা ভাল মনে হয়। স্বভাবতই তোমার সব আদেশ আমি মানব। এখন তোমার হাতে সব হাইবারনেশন ম্যানুয়াল কন্ট্রোলগুলো ছেড়ে দেয়া হল।’
হাল তার কথা রেখেছিল। হাইবারনেকুলামের মোড় নির্দেশক সাইন অটো থেকে ম্যানুয়াল এ চলে গেছে। তৃতীয় ব্যাক আপ-রেডিও-টা অবশ্যই অকার্যকর, পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ হলে পৃথিবী থেকেই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
হোয়াইটহেডের কিউবিকলের সামনে দাঁড়িয়ে সে একটা ঠাণ্ডা বাতাস অনুভব করে নিজের ভিতর। আসলে স্থানটা সত্যি সত্যি ঠাণ্ডা নয়, মানে সেখানে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির উপরে। হাজার হলেও যে এলাকায় তারা যাচ্ছে সেখান থেকে তিন হাজার ডিগ্রি উপরে এখানকার তাপমাত্রা।
কন্ট্রোল ডেকের ডিসপ্লের মতো দেখায় বায়ো সেন্সর ডিসপ্লেটা। দেখা যাচ্ছে সব চলছে ঠিকমতো। সে সার্ভে টিমের ভূ-পদার্থবিদের জমাট মুখমণ্ডলের দিকে একবার তাকায়। শনি থেকে এত দূরে জেগে উঠে হোয়াইটহেড অনেক অবাক হবে।
ঘুমন্ত মানুষটা যে জীবিত তা ধরা একেবারে অসম্ভব। শুধু বুকের নিচে ডায়াফ্রামটা উঠছে আর নামছে। কিন্তু সময় মতো শরীরের নিচের হিট প্যাড কাজ শুরু করলে ভিতরের মানুষের জেগে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। তার জীবিত থাকার একটা মাত্র লক্ষণ স্পষ্ট চোখে পড়ে, হোয়াইটহেডের মুখে গত কয়েক মাসে খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠেছে।
কফিন আকৃতির হাইবারনেকুলামের মাথার কাছে ছোট্ট ক্যাবিনেটে ম্যানুয়াল রিভাইভাল সিকুয়েন্সারটা থাকে। এর সিল ভাঙার জন্য একটা বাটন চেপে অপেক্ষা করতে হয়। একটা অটোম্যাটিক প্রোগ্রামার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় ড্রাগ প্রবেশ করায়। এগুলোর আকৃতি বাসাবাড়ির ছোট্ট ওয়াশিং মেশিন থেকে কোনো অংশে জটিল নয়। সেটা সাথে সাথে ইলেক্ট্রো নারকোসিস পালস বন্ধ করার ব্যবস্থা করে, শরীরের তাপমাত্রাও বাড়িয়ে তোলে। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই সচেতনতা ফিরে আসবে। কিন্তু কোনো সাহায্য ছাড়া যত্রতত্র ঘোরাফেরা শুরু করতে পুরো একদিন লেগে যাবে।
