অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বিটি উচ্চ ত্বরণের জন্য তৈরি হয়নি বলে খুব বেশি বেগে যাচ্ছিল না। কিন্তু ঘণ্টায় দশমাইল বেগে আসতে থাকা আধটন ওজন পৃথিবী বা স্পেস-যেকোনো জায়গাতেই বিপজ্জনক….
ডিসকভারির ভিতরে বোম্যান এত বেশি হতবাক হয়েছে যে প্রতিরোধ বেল্টের জন্যই সে সিট ছেড়ে উঠে পড়েনি।
‘কী হল, ফ্র্যাঙ্ক?’ সে শঙ্কিত মনে প্রশ্ন করে।
কোনো জবাব নেই।
সে আবার ডাকে। আবার। কোনো জবাব আসে না ফ্র্যাঙ্ক পোলের পক্ষ থেকে।
তারপর বাইরে, অবজার্ভেশন উইন্ডোর সামনে কিছু একটা ভেসে যায়। তার চোখে পড়ে ব্যাপারটা। অবাক চোখে সে দেখে স্পেস পোডটা সর্বশক্তিতে তারার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে।
‘হাল! কান্নার মতো চিৎকার বেরোয় তার গলা চিরে, কী হল, হাল? বিটি সর্বশক্তিতে কোথায় যাচ্ছে? ফুল টলে…’
কিন্তু কোনো জবাব আসে না। বিটি একইভাবে যেতে থাকে, যেদিকে যাচ্ছিল। আর তার পেছন পেছন সেফটি লাইনের শেষ মাথায় একটা স্পেসস্যুটও বেরিয়ে যায় একই গতিতে। বাকীটা বোঝার জন্য আর বোম্যানের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়ে না। কোনো সন্দেহ নেই এই স্যুটের ভিতরটা কোনো কারণে খুলে গেছে। স্যুটটা শূন্যতার চাপের সাথে মানিয়ে নিতে চাইছে নিজেকে।
এখনো বোকার মতো সে প্রলাপ বকে চলে, যেন তার কথাই মৃত্যুপুরীকে রুখে দেবে, ‘হ্যালো, ফ্র্যাঙ্ক… হ্যালো, ফ্র্যাঙ্ক… ক্যান ইউ রিড মি?… ক্যান ইউ রিড মি?… আমার কথা শুনতে পেলে হাত নাড়, …তোমার ট্রান্সমিটার ভেঙে গেছে হয়তো…হাত নাড়াও, ফ্র্যাঙ্ক, হাত নাড়াও!’
যেন তার কথায় সাড়া দেয়ার জন্যই পোল একটু ঢেউ খেলিয়ে যায়। এখন আর বোম্যানের মুখে কোনো কথা জোগায় না। সম্ভবত তার বন্ধু আর বেঁচে নেই, এখনো পোল আরো একবার নড়ে ওঠে, যেন ভিতরে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেছ[৪০]…
তাৎক্ষণিক অস্থিরতাটা দূরে মিলিয়ে যায় ঠাণ্ডা যুক্তির স্পর্শে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে পোড আর তার উপগ্রহ তারার জগতে হারিয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরে ডেভিড বোম্যান তার অপলক দৃষ্টি ফেলে রাখে কোটি কোটি মাইল বিস্তৃত তারকা জগতে।
একটা কথাই মাথায় বারবার আসছে ঘুরেফিরে।
শনির জগতে প্রথম যে মানুষ যাবে তার নাম ফ্র্যাঙ্ক পোল।
অধ্যায় ২৬. হালের সাথে কথোপকথন
ডিসকভারির বুকে আর কোনো পরিবর্তন আসেনি। সব সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে, সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স তার কাজ চালাচ্ছে মনোযোগের সাথে, হাইবারনেটররা স্বপ্নহীন নিদ্রায় কাতর; শুধু এতদূরে, বৃহস্পতির অর্বিটেরও বাইরের হাতেগোনা গ্রহাণুর সাথে আরেকটি যোগ দিয়েছে।
বোম্যানের মনে নেই কখন সে কন্ট্রোল ডেক ছেড়ে সেন্ট্রিফিউজে এল। এখন অবাক চোখে নিজেকে আবিষ্কার করে সে গ্যালিতে, হাতে আধ খাওয়া কফি। নেশানিদ্রা থেকে উঠে আসা মানুষের মতো সে আস্তে আস্তে চারপাশটাকে বুঝতে শুরু করে।
সামনে হালের অজস্র চোখের একটি তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ। সে মাতালের মতো লেন্সটার সামনে এগিয়ে যায়। তার চলাচলের মধ্যে নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেয়েছে শিপের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এক অতল মন; একদম হঠাৎ করেই হাল কথা বলে ওঠে, ফ্র্যাঙ্কের ব্যাপারটা খুব খারাপ হল, তাই না?
‘হ্যাঁ। অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বোম্যান জবাব দেয়, ‘তাই।’
‘দেখে মনে হয় তুমি একটু ভেঙে পড়েছ?’
‘তুমি কী আশা কর?’
কম্পিউটার জাগতিক হিসাবে সে যুগ যুগ সময় ধরে প্রশ্নটাকে বিশ্লেষণ করে। দীর্ঘ পাঁচ সেকেন্ড পরে জবাব আসে তার স্পিকার থেকে, ‘সে ছিল এক চমৎকার সফরসঙ্গী।’
হাতে এখনো কফির মগ দেখে বোম্যান একটা চুমুক দেয় পাত্রটায়। জবাব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। তার মন এখন এসবের অনেক উর্ধ্বে।
পোড কন্ট্রোলের গণ্ডগোলের জন্য কোনো অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে? নাকি হালের কোনো এক সত্তা কোনো ভুল করে ফেলেছিল? সে কোনো প্রশ্ন করার সাহস পায় না, কারণ এর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা অজানা।
এখনো তার বিশ্বাস হতে চায় না যে পোলকে নির্জলা খুন করা হয়েছে। হাল একাজ করতে পারে, যে কেউ পারে, কিন্তু বোম্যান এত বছর পর ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না।
তার জীবনে হয়তো ভয়ানক ঝুঁকি আছে। সে জানে এখন তাকে কিছু আদেশ করতে হবে, কিন্তু ঠিক জানে না কীভাবে এগুলো কাজে লাগানো যায়।
ক্রু মেম্বার যদি খুন করাই হয়ে থাকে তো বাকীদের হাইবারনেশন থেকে এই মুহূর্তে জাগিয়ে দিতে হবে। ভূগোলবিদ হোয়াইটহেডের সবার আগে জাগার কথা। কামিনস্কির পর জাগবে হান্টার। কিন্তু নিয়ন্ত্রণটা আছে হালের হাতে।
একটা ম্যানুয়াল কন্ট্রোলও আছে, ইচ্ছা করলে হাইবারনেকুলামকে একেবারে স্বয়ংক্রিয়-স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট হিসেবে কাজে লাগানো যায়। এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বোম্যান তাদের সবাইকে জাগানোর একটা সাংঘাতিক তাড়া অনুভব করছে।
হঠাৎ করেই সে বুঝতে পারে একজন মানব সাথী আর যথেষ্ট নয়। সামনের কঠিন সপ্তাগুলোয় সে যথাসম্ভব বেশি হাতের উপর তদারকী করতে চায়। মিশন অর্ধেক শেষ হওয়ার পর একজন মারা যাওয়ায় সাপ্লইটা তেমন সমস্যা করবে না।
‘হাল,’ সে যথাসম্ভব শান্ত, ধীর কণ্ঠে বলে চলে, সব ইউনিটের হাইবারনেশন কন্ট্রোল ম্যানুয়াল করে দাও।’
‘সবাইকে, ডেভ?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি কি মনে করিয়ে দিতে পারি যে মাত্র একটা রিপ্লেসমেন্টের কথা ছিল? আরো একশো বারোদিন বাকীদের বাইরে থাকার কথা নয়।’
