‘ওহ! বাঁচলাম, তোমরাতো জানোই, এই মিশনের সবচে বড় দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপানো হয়েছে।
‘অবশ্যই। এবার দয়া করে অ্যান্টেনার ম্যানুয়াল কন্ট্রোলটা আমার হাতে তুলে দাও।’
‘এইতো, …’
বোম্যান আসলে মোটেও আশা করে না যে এটা কাজ করবে। হাতে নাতে পৃথিবীকে তাক করা! কিন্তু কী আর করা। অ্যালাইনমেন্ট ডিসপ্লেতে আর পৃথিবীকে বের করা সম্ভব কিনা তা কে জানে! কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই পৃথিবী ফিরে আসে। তখন ডক্টর সিমনসন বলছিল, ‘…প্লিজ, আমাদের সাথে সাথে জানাবে, সার্কিট কে দিয়ে কিং এবং আর দিয়ে রব…’ এরপরই মহাকাশের অর্থহীন শব্দ এগিয়ে আসে।
আরো কয়েকবার চেষ্টা করে সে হাল ছেড়ে দেয়।
পোল হতাশ সুরে বলল, তাহলে এবার আমরা কী করব?
পোলের প্রশ্নটার সহজ উত্তর মেলা ভার। অনেক পথেই যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা যায়। যদি পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় তাহলে অ্যান্টেনাকে স্থির রেখে পুরো শিপকেই দিক ঠিক করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
তারা দুজনেই আশা করে যে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি আসবে না। তাদের হাতে এখনো একটা অক্ষত এ ই থার্টি ফাইভ ইউনিট আছে, হয়তো আরো একটা কাজে লাগানো সম্ভব, কারণ নষ্ট হওয়ার আগেই সেটাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। নতুন কোনো ইউনিট বসানো হলে সেটা সাথে সাথে জ্বলে যেতে পারে।
এমন সমস্যা প্রতি ঘরে ঘরেই দেখা দেয়; কেউ নষ্ট ফিউজকে বদলে দেয় না প্রথমেই। আগে নষ্ট হওয়ার কারণ খোঁজে।
অধ্যায় ২৫. শনিতে প্রথম পদধ্বনি
পোল এর আগেও পুরো কাজটা করেছে। কিন্তু প্রথমবার খোলা স্পেসে বেরুনোই আত্মহত্যার শামিল। আবার এ কাজে নামার মতো সাহস খুব কম অভিযাত্রীরই হয়। কিন্তু সে সাবধান, ভীতু নয়।
ভালমতো বিটিকে দেখে নিয়েছে পোল, সেটায় চব্বিশ ঘণ্টা খোলা স্পেসে থাকার সুবিধা পাওয়া যাবে। পোলের ত্রিশ মিনিটের একটু কম সময় লাগবে। এবার যথারীতি হালকে এয়ারলক খুলতে বলে সে অতল গহ্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আগেরবারের সাথে এবার একটা ছোট্ট পার্থক্য আছে। আগে বিগ ডিশটা ডিসকভারির ফেলে আসা অদৃশ্য পথে তাক করা ছিল, এবার এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ডিশটা নিজেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক অবস্থানে বসিয়ে নিয়েছে। এখন এটার দিক শিপের অক্ষরেখা বরাবর। সেদিকে শনির বিশাল দেহ আর সুন্দর বলয় ঘুরে চলেছে নিজের মতো। পোল ভেবে কুল পায় না আর কত সমস্যার মুখোমুখি হবে ডিসকভারি সেখানে যেতে যেতে!
পোল তেমন সূক্ষ্মভাবে তাকায়নি, তাকালে এমন একটা দৃশ্য দেখতে পেত যা আর কোনো খালি চোখের মানুষ কখনো দেখেনি। শনির গোলক তার চারপাশে ছোট্ট ছোট্ট ধূলিকণায় গড়ে ওঠা বিশাল বলয়-মালা নিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।
আগে পোল ভাবতো, সেই বলয়ের সাথে স্থায়ী একটা উপগ্রহ হিসাবে ডিসকভারি ঘুরছে-এ দৃশ্য দেখতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই
অর্জনও বৃথা যাবে যদি তারা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করতে না পারে।
আবারো বিশ ফুট দূর থেকে বিটিকে থামিয়ে রেখে সে হালের হাতে কন্ট্রোল ছেড়ে দেয়।
‘এবার বাইরে যাচ্ছি,’ ও বোম্যানের কাছে রিপোর্ট করে, সবকিছু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত।
‘আশা করি তোমার কথাই ঠিক। আমি ইউনিটটা দেখার জন্য পাগল হয়ে গেছি।’
‘বিশ মিনিটের মধ্যেই তুমি জিনিসটাকে টেস্ট বেঞ্চে পেয়ে যাবে। ওয়াদা রইল।’
অ্যান্টেনার দিকে অলসভাবে বেরিয়ে যাবার সময় কথা বন্ধ থাকল। এবার বোম্যান শিপের ভিতর বসে থেকে বিভিন্ন জেটের হালকা শব্দ আর হিসহিসানি শুনতে পায়।
‘মনে হয় প্রমিজ তুলে নিতে হবে। একটা নাট এত বেশি শক্ত যে…উফ…ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে…না, কাজ হবে।’
আরো কিছুক্ষণ নিরবতার পর পোল হালকে অনুরোধ করে।
‘হাল, পোড লাইটটা বিশ ডিগ্রী বাঁয়ে ঘোরাও। এইতো। ধন্যবাদ।’
বোম্যানের সচেতনতার কোন গহীন থেকে সতর্কতার একটা ক্ষীণ শব্দ উঠে আসছে। কিছু একটা উল্টোপাল্টা ঘাপলা আছে কোথাও। তার অভ্যস্ত অবচেতন মনে ধরা পড়লেও অনভ্যস্ত চোখে ধরা পড়ছে না। কারণটা বের করার আগে কয়েক সেকেন্ড ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হল।
আচ্ছা! হাল আদেশ পালন করেছে ঠিকই, কিন্তু কোনো জবাব দেয়নি। সে মানবীয় কম্পিউটার হলেও কম্পিউটারই। তাকে প্রোগ্রাম করা হয়েছে জবাব দেয়ার মতো করে। কোনো কম্পিউটার তার নিজের প্রোগ্রামকে এড়িয়ে যেতে পারে না। পোলের কাজ শেষ হলে ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে…
ওদিকে অ্যান্টেনা মাউন্টিংয়ে পোল এতকিছু খেয়াল করার তালে নেই। সে গ্লাভ দিয়ে ঢাকনা তুলে ধরেছে, অন্য হাত আগেরবারের চেয়ে দ্রুত বের করে আনছে ইউনিটটাকে।
জিনিসটা আলগা হয়ে এলে সে সেটাকে স্নান সূর্যালোকে তুলে ধরে।
‘এইতো, পিচ্চি জানোয়ারের বাচ্চা, সে পুরো ইউনিভার্সকে সাধারণভাবে আর বোম্যানকে বিশেষভাবে বলছে, এটাকেও আমার কাছে একদম ঠিকঠাক মনে হচ্ছে।’
তারপর হঠাৎ করেই সে থেমে যায়। কারণ একটা অস্বাভাবিক নড়াচড়া চোখে পড়ে গেছে। এখানে কোনো রকম নড়াচড়া হওয়া অসম্ভব।
সম্ভবত বিটি ভেসে ভেসে একটু এগিয়ে এসেছে, সে কি পোডটাকে ঠিকমতো আটকে দেয়নি? হতেও পারে। তারপর সে জীবনের সবচে আশ্চর্য দৃশ্যটা দেখে, বিটি তার সর্বশক্তি দিয়ে পোলের দিকে এগিয়ে আসছে।
দৃশ্যটা এতই অবিশ্বাস্য যে সেটা তার সাধারণ নড়াচড়ার ক্ষমতাকে একেবারে থামিয়ে দিয়েছে। সে আসতে থাকা দৈত্যকে এড়ানোর কোনো চেষ্টাই করল না, বরং হালের কাছে একটা মেসেজ পাঠালো, ‘হাল, ফুল ব্রেকিং…’
